বসবার ঘর থেকে এক ভয়ংকর তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার ভেসে এল। চৌধুরী লাফিয়ে বেরিয়ে গেল শোওয়ার ঘর থেকে। আমি একটু পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করলাম।
দেখলাম, মিসেস মিত্র মেঝেতে পড়ে আছেন। ওঁর পাশে পড়ে থাকা রিভলভারটা চৌধুরী কুড়িয়ে নিল। মিসেস মিত্রের শালের সামনেটা আঠালো লাল রঙে মাখামাখি। তিনি জীবিত কি মৃত সেটা বোঝার জন্যে ডাক্তারি পরীক্ষার দরকার।
চৌধুরী আমাকে বলল, ফোন করে অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিন। এখনও হয়তো উনি বেঁচে আছেন।
অবশেষে একসময় মিসেস মিত্রকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার আমাদের আশ্বাস দিলেন যে, ওঁর প্রাণের কোনও আশঙ্কা নেই, এবং শিগগিরই তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন।
মনে হল প্রায় কয়েকশো সাদা পোশাকের ডিটেকটিভ আসলে আট কি দশজন–আমার বাড়ি ছেয়ে ফেলেছে। সব গোলমাল মিটে যাওয়ার পর তাদের যা করণীয় তারা তাই করতে লাগল। তাদের কাজ শেষ হলে আমার বাড়ির যা অবস্থা হল তা আর বলার নয়। যেন বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা। আর চৌধুরী একটানা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা না ঘুমোনোর ফলে ঘরে চলাফেরা করছে জীবন্ত এবং মাতাল মমির মতো।
ঘর ফাঁকা হলেও সে বিড়বিড় করে বলল, আপনার সঙ্গে একটু গায়ের জোর দেখিয়েছি আর গালিগালাজ করেছি বলে কিছু মনে করবেন না, মিস্টার সান্যাল। কিন্তু এখানে আসতে গিয়ে বাইরে মিসেস মিত্রের মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা দেখে আমি চমকে উঠি। তখন উঁকি মারি বসবার ঘরের জানলা দিয়ে। ভেতরের নাটক, মিসেস মিত্রের রিভলভার, সবই আমার চোখে পড়ল। সুতরাং আপনাকে বাঁচাতে যে-বুদ্ধিটা মাথায় এসেছে সেটাই খাঁটিয়েছি।
না, না, ক্ষমা চাইতে হবে না। আমি বাধা দিয়ে বললাম, কিন্তু আপনি এখানে ফিরে এলেন। কেন? বিকেলবেলা তো আমি ভাবলাম, আপনি এ-মামলায় হাত ধুয়ে ইস্তফা দিলেন।
তাই করতাম। শুধু আমার বউয়ের জন্যে।–চৌধুরী জবাব দিল। আপনার বউ?
হ্যাঁ। বাড়ি ফিরে গিয়ে আপনার ওপর রাগে ঘুম এল না। সুতরাং বসে-বসে গোটা গল্পটা বউকে শোনালাম। আমার কাহিনি শেষ হলে ও শুধুই ঠোঁট ওলটাল। ডিটেকটিভের বউ হওয়ার ফলে ও জানে, এরকম হলে মনের অবস্থাটা কী হয়। কিন্তু হঠাৎই ও রেগে গিয়ে আমার দিকে তাকাল, বলল, তোমার কোটটা আবার দোকানে কাচতে দাও। কোটের হাতায় এসব কী লাগিয়ে এনেছ?
গৃহিণীরা যেরকম বলে থাকে সেরকম সুর ওর গলায়। আমার ক্লান্তির কথা, হতাশার কথা, ওর মনেও পড়ল না। কোটে দাগ লাগিয়েছি বলে খাপ্পা হয়ে উঠেছে আমার ওপরে।
ঠিক বুঝলাম না।
আমিও বুঝিনি…অন্তত তখন। তারপর কোটের হাতায় তাকিয়ে কী দেখলাম জানেন?
কী?
লাল রং।
তাতে কী?
সুতরাং, তখন আমি ভাবতে শুরু করলাম। লাল রংটা আমার কোটে একমাত্র যে-জায়গা থেকে লাগতে পারে তা হল রুকির হাত। মানে মিসেস মিত্রের ওই ডামি। আর তা যদি হয়, তা হলে তিনি নিশ্চয়ই দুদিন আগে ওটা রং করেননি। অথচ তিনি আমাদের তাই বলেছেন। প্রথমে যখন আমি একা ওঁর বাড়িতে যাই তখন আমাকে ওটা দেখানোর মাত্র মিনিটকয়েক আগে তিনি রুকির ডানহাতে ওই লাল রংটা লাগিয়ে দেন। স্পষ্ট মনে আছে, আমাকে দরজার দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি একবার ওই স্টুডিয়োতে ঢোকেন এবং আমি যাতে রুকির হাতে হাত না দিই সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেন। মনে হয়, ফেরার সময় হয়তো রুকির হাতে আমার কোটের হাতাটা ঘষে গিয়ে থাকবে।
একটু থেমে চৌধুরী আবার বলতে শুরু করল, সে যাই হোক, যদি রুকির হাত থেকেই ওই লাল রংটা এসে থাকে তা হলে এটা বুঝতে হবে মিসেস মিত্র ওই ডামিটা রং করে তৈরি রেখেছেন আমাকে বোকা বানানোর জন্যে–অর্থাৎ, তিনি আমাদের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন। সঙ্গে-সঙ্গে আমি গাড়ি নিয়ে ছুটে গেলাম ওঁর বাড়িতে, কিন্তু দেখলাম, তিনি বাড়িতে নেই। তখন ভাবলাম, আপনার কাছেই আসি, একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে যাই ব্যাপারটা নিয়ে। এসে দেখি বাইরে মিসেস মিত্রের স্টেশান ওয়াগনটা দাঁড়িয়ে। বাকিটা তো আপনি জানেন।
একটা চেয়ারে এলিয়ে পড়ল চৌধুরী। যেন এই কথাগুলো বলে তার অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার আরও একটা প্রশ্ন রয়েছে।
সুতরাং জিগ্যেস করলাম, ওঁর স্বামীর বডিটা কোথায়? তিনি বলছিলেন, কোথায় একটা বড় বাড়ি তৈরি হবে, সেই জমিতে নাকি পোঁতা আছে?
চৌধুরীর দু-চোখের পাতা যেন দু-দুটো ভারী পাথর। নিছক ইচ্ছেশক্তিতেই সে যেন চোখ খুলে রেখেছে।
এখন শুধু একটা প্রশ্ন নয়, অনেক প্রশ্ন… বিড়বিড় করে বলল চৌধুরী, কে মিসেস মিত্রকে সাহায্য করেছে? কীভাবে ওঁর স্বামীকে খুন করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর কাল থেকে খুঁজতে শুরু করব।
কিন্তু ডেডবডিটা খুঁজে পাবেন কী করে?
কোথায়-কোথায় নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে সেটা আমাদের খোঁজ করতে হবে। আমরা মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে খোঁজ নেব…।
সত্যি, এটা আমার মাথায় আসেনি। চৌধুরীকে মনে-মনে সাবাস দিলাম।
মিউনিসিপ্যালিটিতে খোঁজখবর নেওয়ার পর খুঁজে পাওয়া যাবে সেই বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরকে। তারপর জানতে পারব কে মিসেস মিত্রের বন্ধু যে ওঁর সব কথা চোখ বুজে শোনে এবং সেই কন্ট্রাক্টরের কংক্রিট মিক্সার চালাতে পারে। তারপর–।
চৌধুরীকে সেকথা বলতে গিয়ে দেখি সে চেয়ারে বসে-বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
