নীতিন? আজ সকালে চাদরের নীচে বুঝি উনিই ছিলেন?
মিসেস মিত্র সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন।
হ্যাঁ। নীতিন–আমার হাজব্যান্ড। সে একটা বেহেড মাতাল, লম্পট, কাপুরুষ। শয়তান হাসি ফুটে উঠল ওঁর ঠোঁটে। তিনি মৃদু স্বরে বললেন, সে যাক, নীতিন তো আর নেই।
নেই? কোথায় গেছেন?
যেখানে গেলে আর ফেরা যায় না। মানে, নেক্সট ইয়ারে এই সময়ে ওর আত্মা ইহলোকের মায়া থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবে, এবং একইসঙ্গে ওর কবরের ওপর গড়ে উঠবে হাই-ফাই এক লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট। সামনের সপ্তাহেই তার ফাউন্ডেশান স্টোন বসানো হবে।
টের পেলাম, আমার হাতের তালু দরদর করে ঘামছে। কিন্তু মরে গেলেও এই মহিলার কাছে আমি প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে অনুনয়-বিনয় করতে পারব না।
তা হলে আমি ও নীতিনবাবু একইসঙ্গে একই কবরে জায়গা পাচ্ছি?–প্রচণ্ড চেষ্টায় গলার স্বর সমান রাখলাম! কিন্তু হঠাৎ এরকমভাবে আমি উধাও হয়ে গেলে ইনস্পেক্টর চৌধুরী কি সন্দেহ করবেন না? বিশেষ করে আজকের ঘটনার পর?
যত প্রাণ চায় সন্দেহ করুক। চৌধুরী কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না। তা হলে আমরা রওনা হই, মিস্টার সান্যাল?
রওনা হব কিনা ভাবছি, এমন সময় দরজার প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ শোনা গেল। বাইরে যে-ই থাকুক না কেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই তার ভীষণ জরুরি দরকার।
মিসেস মিত্র কোণঠাসা বেড়ালের মতো চকিতে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। কিছুটা যেন অস্থির হয়ে উঠলেন। একবার ভাবলাম, ওঁর হাতের রিভলভারের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ি, কিন্তু আমাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক। চঞ্চল চোখে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে তিনি রিভলভারটা লুকিয়ে ফেললেন শালের আড়ালে। কিন্তু তখনও ওটা তাক করে রইল আমার দিকে।
কিছুটা ভয়ের গলায় মিসেস মিত্র আমাকে বললেন, যে এসেছে তাকে তাড়াতাড়ি তাড়ান। আর চালাকি করে পালানোর চেষ্টা করবেন না। আমি আপনার ঠিক পেছনেই থাকব। দরকার হলে একগুলিতে দুজনের লাশ ফেলে দেব।
দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলে পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করলাম। বাইরে যে দাঁড়িয়েছিল সে-ই বাকি কাজটা শেষ করল। ছিটকে খুলে গেল দরজা, এবং রকেটের গতিতে ঘরে ঢুকল চৌধুরী। এক প্রচণ্ড ধাক্কা মারল আমাকে। আমি বলতে গেলে উড়ে গিয়ে পড়লাম ঘরের অন্য প্রান্তে। দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। মিসেস মিত্র অবাক হয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন, রিভলভারটা তখনও শালের আড়ালে লুকোনো।
শালা, শুয়োরের বাচ্চা!–আমার মুখের কাছে এসে খেঁকিয়ে উঠল চৌধুরী, তোমাকে আজ তুলে নিয়ে গিয়ে যক্ষ্মা-ধোলাই দেব। আজ যখন বড়সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেছি তখন কী হয়েছে জানো? অপদার্থের মতো কাজ করেছি বলে তিনি আমাকে কথা দিয়ে এক থাপ্পড় মেরেছেন। এখন আমার সব প্রোমোশান সিল হয়ে যাবে, সান্যাল। শুধু তোমার জন্যে।
কথা শেষ হতেই সে আমার একটা হাত চেপে ধরল। এক হ্যাঁচকায় আমাকে তুলে নিয়ে প্রায় ছুঁড়ে দিল অন্য একটা দেওয়ালে। হাত-পা মুড়ে ছিটকে পড়লাম শোওয়ার ঘরের দরজার কাছে। যন্ত্রণা যত না টের পাচ্ছিলাম তার চেয়ে অবাক হচ্ছিলাম বেশি।
নিরপরাধ নাগরিকদের মিছিমিছি হয়রান করা। বড়সাহেব এই কথা বলে আমাকে হেভি ঝেড়েছেন। চৌধুরী বলল। তারপর ঘুরে তাকাল মিসেস মিত্রের দিকে। উনিও আমার মতোই হতভম্ব, বিস্মিত।
আমি কিন্তু চৌধুরীর প্রমোশনের জন্যে মোটেও চিন্তিত নই। বরং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করছি।
মিসেস মিত্রকে লক্ষ করে চৌধুরী বলল, ভালোই হয়েছে, আপনিও এখানে রয়েছেন, মিসেস মিত্র। নইলে আমাকেই দেখা করতে যেতে হত। আপনি এই লোকটার নামে মানহানির মামলা করুন। একে পথের ভিখিরি করে ছাড়ুন।
চৌধুরী পায়ে-পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এল। আমি তখন কোনওরকমে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি।
সে চিৎকার করে উঠল, না, শুধু মানহানির মামলায় আমার পেট ভরবে না। তোমাকে সাতজন্মের শিক্ষা দিয়ে তবে ছাড়ব।
পা তুলে সে আমার পিঠে রাখল, তারপর প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারল। তিরবেগে দরজা দিয়ে আমি ছিটকে গেলাম শোওয়ার ঘরে। মাথাটা ঠুকে গেল একটা বুকশেলফ-এর কোণে। এবং অবশেষে বিকট শব্দে আছাড় খেয়ে পড়লাম ফ্রিজের পাশে।
এবার ভয়ার্ত চোখে তাকালাম চৌধুরীর দিকে। শুধু রাগ হলে এ-ব্যবহারের মানে বুঝতাম, কিন্তু এ তো রাগ নয়, নৃশংস প্রতিশোধের জ্বালা।
কোটের ভেতর থেকে রিভলভার বের করে এনেছে চৌধুরী। এরা দুজন মিলে যদি আমার এগেইনস্টে যায় তা হলে আমার আর বাঁচার আশা নেই।
কিন্তু চৌধুরী শোওয়ার ঘরে ঢুকেই একপাশে আড়ালে সরে গেল। ইশারায় আমাকে বলল নীচু হয়ে লুকিয়ে থাকতে। তারপর মিসেস মিত্রকে লক্ষ করে চেঁচিয়ে বলল, রিভলভারটা ফেলে দিন, মিসেস মিত্র। মিস্টার সান্যালের আর কোনও ভয় নেই। আর আপনারও পালানোর পথ নেই। আই এম ইন চার্জ নাউ।
বিকট এক কানফাটানো শব্দে চৌধুরীর উত্তর এল। মিসেস মিত্রের রিভলভারের গুলি নিমেষে এসে বিঁধল শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে। কিছুটা সিমেন্ট-বালি খসে পড়ল মেঝেতে।
চৌধুরী সতর্ক ভঙ্গিতে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল। রিভলভার ধরা হাতের কবজিটা চেপে ধরল অন্য হাতে। তারপর অত্যন্ত যত্নে নিশানা ঠিক করে নিয়ে একবার গুলি ছুড়ল।
