আপনার তদন্ত শেষ হয়েছে, মিস্টার ব্যোমকেশ বক্সী?–চৌধুরীর তিক্ত ব্যঙ্গ যেন কেটে বসল আমার শরীরে : এবারে আমরা যাব। তার আগে ওই কোণের একটা প্লাস্টারের মেয়েছেলের সঙ্গে আপনি একটু ফস্টিনস্টি করে নেবেন?
কিছুই বলার নেই আমার। একটা সামান্য ডামির জন্যে একজন ক্লান্ত ডিটেকটিভকে দিয়ে আমি কী অমানুষিক পরিশ্রম করিয়েছি। তা ছাড়া একজন নির্দোষ মহিলাকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করেছি। কেন যেন মনে হল, চৌধুরী আমাকে এত সহজে ছাড়বে না।
চৌধুরী আমার বাড়িতে ফিরে এল। আমাকে নামিয়ে দিয়ে ইঞ্জিন চালু রেখেই মুখ খুলল। মিসেস মিত্রের সামনে যেসব ভাষা চৌধুরী ব্যবহার করতে পারেনি তারই মহড়া দিল প্রায় দশমিনিট ধরে। আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব শুনলাম। ভাবলাম, আমাকে এসব বলে চৌধুরী অন্তত একটু হালকা হোক।
বাড়িতে ঢুকে কাজের লোককে বললাম কড়া করে এক কাপ কফি দিতে। তারপর শুয়ে পড়লাম বিছানায়। মনে-মনে নিজেকে হাজাররকম গালাগাল দিলাম। ভাগ্যিস রুমা বাড়িতে নেই। থাকলে ওর কাছে থেকেও একপ্রস্ত শুনতে হত।
সারাদিনের ক্লান্তির জন্যেই হোক, বা এতক্ষণের দুশ্চিন্তার জন্যেই হোক, মিনিটকয়েকের মধ্যেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার চোখ ও মন থেকে বাইরের পৃথিবী মুছে গেল।
*
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি মনে নেই, তবে ঘুম ভেঙে দেখি বাইরে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। অনেকে যেমন ঘুম ভাঙতেই লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে, আমি তেমনটা পারি না। ধীরে ধীরে অচেতন জগৎ থেকে আমি উঠে আসি চেতনার জগতে।
চোখ খুলে প্রথম তাকিয়েছি ঘরের জানলার দিকে। তখনই বুঝেছি সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়েছে। তারপর মনে পড়ল অনুপম বক্সীর কথা, এবং পরক্ষণেই ভেসে উঠল টাক মাথা অফিসার চৌধুরীর রুক্ষ মুখটা।
সমস্ত ব্যাপারটা ভুলতে আবার চোখ বুজলাম। চোখ বুজতেই আমার মন ভেসে গেল সারি সারি গাড়িতে টইটম্বুর সকালের রাস্তায়। আমি যেন আবার বসে আছি আমার গাড়িতে। সামনে সবুজ অ্যামবাসাডরটা। আর ডানদিকেই মিসেস মিত্রের মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা। আমি তাকিয়ে আছি স্টেশান ওয়াগনের পেছনে রাখা চাদর-ঢাকা অবয়বটার দিকে। হঠাৎই চাদর সরে গিয়ে বেরিয়ে এল হাতটা। কিন্তু না, মানুষের হাত নয়। একটা প্লাস্টারের হাত। মিসেস মিত্রের স্টুডিয়োর সেই হতচ্ছাড়া ডামি, রুকির হাত। তবে
তখনই আমার তন্দ্রার ভাবটুকু নিমেষে মিলিয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝলাম, চৌধুরী এবং আমি, দুজনেই বিরাট ভুল করেছি। মিসেস মিত্র চালাকিতে আমাদের টেক্কা দিয়েছেন। সকালের রাস্তার দৃশ্যটা স্পষ্ট আমার মনে ভাসছে। চাদরের নীচে কোনও মৃতদেহের বদলে আমি রুকিকে ভাবতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না। কারণ লাল রংটা ছিল রুকির ডানহাতে, আর যে-হাতটা আমি গাড়িতে দেখেছি, সেটা কোনও মানুষের বাঁ-হাত!
বিছানায় বসে থরথর করে কাঁপতে লাগলাম। আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি। চৌধুরীকে ফোন করে সব বলব? সে আমার কথা বিশ্বাস করবে তো? আর করলেও, এখন আমরা কী করব?
কী করব ভাবতে-ভাবতে আধঘণ্টা পার হয়ে গেল। এমন সময় হঠাৎই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে এল। অতিথি এসেছে আমার কাছে। যে-ই আসুক, সে নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ধরে কড়া নাড়ছে। কারণ, কড়া নাড়ার খটখট শব্দটা যে আমার মাথার ভেতর থেকে আসছে না সেটা বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে।
চৌধুরীকে ডাকব কি ডাকব না ভাবতে-ভাবতে দরজার কাছে গেলাম।
দরজা খুললাম।
দরজার দাঁড়িয়ে মিসেস মিত্র। গায়ে বিকেলের সেই কাশ্মীরি শাল। এবং একটা উলের মাফলার–যেটা তখন দেখিনি। সব মিলিয়ে তাঁর এই সাজ হাস্যকর। তবে তার হাতের মুঠোয় ধরা জিনিসটা মোটেও হাস্যকর নয়।
জিনিসটা একটা ০.৪৫ অটোমেটিক। তার নলের ফুটোটা সরাসরি আমার পেট লক্ষ্য করে তাকিয়ে আছে। এবং ফুটোর আকারটা আমার কাছে জলের পাইপের মতো বিশাল ঠেকল।
আমার প্রথম কথাগুলো যেমন এলোমেলো তেমনই অর্থহীন, তবে আমার সারাদিনের অবস্থার কথা ভাবলে সে-দোষ ক্ষমা করা যায়।
হাতের হিসেবটা আপনার ভুল হয়ে গেছে, তাই না মিসেস মিত্র?
হ্যাঁ। তাই ভাবছিলাম, এটা খেয়াল হতে আপনার কতটা সময় লাগবে। কথাটা বলেই বসবার ঘরে ঢুকে এলেন তিনি। দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি এঁটে দিলেন। তারপর বললেন, ইনস্পেক্টর চৌধুরী যখন দোকানে গিয়ে আমাকে আপনার কথা বললেন, তখন তাড়াহুড়ো করে ডামিটা আমাকে রেডি করতে হয়। আপনি কী দেখেছেন সেটা মিস্টার চৌধুরী আমাকে বলেছেন, কিন্তু কোন হাতটা যে চাদরের তলা দিয়ে বেরিয়ে ছিল তা বলেননি। সেটা আমারও ঠিক মনে পড়ল না। সুতরাং আন্দাজেই রুকির ডান হাতে রং লাগাতে হল। এবং আমার আন্দাজ ভুল হল। তবে মাত্র একঘণ্টা আগে সে-ভুলটা বুঝতে পারলাম। মনে পড়ল, চাদরের তলা থেকে যে-হাতটা বেরিয়ে ছিল সেটা বাঁ হাত।
আর আপনি ভাবলেন, আমার হয়তো সেটা খেয়াল পড়বে…।
মিসেস মিত্র হাসলেন। বললেন, রাস্তায় গাড়ির ভিড়ে আপনি আমার এত কাছে ছিলেন যে, এখন তোক পরে তোক এ-ব্যাপারটা আপনার মনে পড়তই। সুতরাং টেলিফোন-বই দেখে আপনার ঠিকানাটা বের করে চলে এলাম।
তা, এখন কী হবে?
আমরা একটু বেরোব, মিস্টার সান্যাল। প্রথমে আমরা আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করব। সে একজন বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরের হয়ে কংক্রিট মিক্সার চালায়। আমার কথা সে চোখ বুজে শোনে– অবশ্য ঠিকঠাক দাম দিলে তবেই। তারপর যেখানে যাবেন সেখানে গিয়ে নীতিনের সঙ্গে আপনার দেখা হবে।
