ঠিক সেই মুহূর্তে লোডশেডিং হয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
কিন্তু তখনও সুচরিতার কানফাটানো আর্ত চিৎকার থামেনি।
মরা মানুষের হাত (নভেলেট)
প্রতিদিন সকালে লক্ষ লক্ষ মানুষ সুখের আশ্রয় ছেড়ে বাড়ি থেকে ঘুম-চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে পড়ে। তারপর রওনা হয় রেল স্টেশানের দিকে। ট্রেন এলেই লাফিয়ে উঠে পড়ে। গন্তব্য শহরের অফিস। সেই অফিসের ভিড়ে আমিও থাকি। ভোরবেলা ঘুমজড়ানো চোখে ঘরের আরাম ছেড়ে বাইরে বেরোতে ভালো লাগে না। কিন্তু উপায় নেই। ট্রেনে যাওয়া-আসার কষ্টের ব্যাপারে নতুন করে কিছু আর বলার নেই। গরমকালে যেমন গরম, শীতকালে তেমনই ঠান্ডা। অর্থাৎ, ট্রেন ভ্রমণের আমেজটুকু আর পাওয়া যায় না। তবে একইসঙ্গে কষ্টটাও অভ্যেস হয়ে গেছে।
গত দুমাস ধরে দেখছি ট্রেনগুলো কোন যাদুমন্ত্রবলে ঠিক-ঠিক সময়ে যাওয়া-আসা করছে। কিন্তু হঠাৎই, কিছুদিন আগে, শুরু হল ট্রেন ধর্মঘট। সুতরাং কলকাতায় যাতায়াতের ট্রেন উধাও হল।
ট্রেন বন্ধ থাকলে কলকাতা যাওয়ার একমাত্র উপায় হল গাড়ি অথবা ট্যাক্সি। তা হলে অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন! শত-শত লোক শত-শত গাড়ি, ট্যাক্সি অথবা টেম্পো ধরে রওনা হয়েছে শহরের দিকে। একইসঙ্গে একে অপরকে ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এবং রেজাল্ট ট্র্যাফিক জ্যাম। সেসময় মনে রাগ, বিরক্তি ইত্যাদি মিশ্র অনুভূতির যে কী অদ্ভুত খেলা চলে তা এরকম অবস্থায় যে না পড়েছে সে ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। সেই ট্র্যাফিক জ্যামের লম্বা সারিতে আমিও গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আর তখনই ঘটনার সূত্রপাত।
আমার বউ রুমা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে। ফলে ড্রাইভারকেও ছুটি দেওয়া আছে। সুতরাং আমি নিরুপায় হয়ে গাড়ি নিয়ে রওনা হয়েছি অফিসে। নইলে ট্রেন চললে পর পেট্রলের ক্রমে-বেড়েওঠা দামের কথা ভেবে গাড়ি নিয়ে সচরাচর অফিসে যাই না। এখন গাড়ি নিয়ে বেরিয়েও দেখছি বিপত্তি।
প্রথম কয়েকমাইল আমাদের সারিটা ধীরে-ধীরে বেশ এগোতে লাগল, কিন্তু একটা মোড় ঘুরতেই প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষলাম। আর-একটু হলেই সামনে দাঁড়ানো একটা সবুজ অ্যামবাসাডরের পেছনে ধাক্কা মারছিলাম। আমার সামনে পাশাপাশি তিন সার গাড়ি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে। যতদূর চোখ যায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি। মনে-মনে বেশ বুঝলাম, শহরে পৌঁছানো পর্যন্ত ওই সবুজ অ্যামবাসাডরের পশ্চাৎদেশ হয়তো সারাক্ষণই আমাকে দেখতে হবে। তবে সবুজ রং দেখাটা শুনেছি ভালো–চোখ তাজা থাকে।
অফিসে পৌঁছোতে কঘণ্টা দেরি হবে সে-ভাবনা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। এখন প্রশ্ন, এই গাড়ির জটলা থেকে মুক্তি পাব তো?
হঠাৎই পাশের এক গাড়ির আরোহী জানালেন, সামনে কোথায় নাকি একটা টেম্পো খারাপ হয়ে গেছে। চমৎকার! এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে এগোনো পেছোনো সবই বন্ধ। হয়তো গাড়ির সিটে বড়ি কাত করে ঘুমিয়েই পড়তাম, কিন্তু মাঝে-মাঝে সবুজ অ্যামবাসাডারটা কয়েকইঞ্চি করে এগোচ্ছে আর যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ায় আমি সেই মহার্ঘ ইঞ্চিগুলো দখল করছি।
তখনই খেয়াল পড়ল স্টেশান ওয়াগনটার দিকে। মেরুন রঙের গাড়িটা আমার ডানদিকেই অচল হয়ে দাঁড়িয়ে। আমার ডানহাতের কনুই খোলা জানালার কিনারায় রাখা, আর ঠিক জানলা ঘেঁষেই মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা। এত কাছে যে, ইচ্ছে করলে জামার হাতা দিয়ে ওটার গা পালিশ করে দেওয়া যায়।
আমরা পাশাপাশি রয়েছি। আমি মাঝে-মাঝে এমনিই তাকাচ্ছি গাড়িটার দিকে।
গাড়ি চালাচ্ছেন একজন অতি আধুনিক মহিলা। সাজগোজ উগ্র। ঠোঁটে লিপস্টিকের আগুন, চোখে কালো সানগ্লাস। একটা ছাই রঙের স্টোল শীতকে রুখতে অলস চেষ্টা করছে। মাঝে-মাঝে তিনি মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে দেখছেন, আবার নার্ভাসভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে তারপরেও আড়চোখে আমাকে দেখতে চেষ্টা করছেন।
যখন তার নজর আমার দিকে ব্যস্ত তখন তার সামনের গাড়িটা ফুটকয়েক এগিয়ে গেল। পেছনে দাঁড়ানো গাড়ির দল সম্মিলিতভাবে হর্ন দিয়ে উঠতেই তিনি চমকে উঠে এক প্রচণ্ড হ্যাঁচকায় গাড়িটা এগিয়ে নিলেন সামনে এবং সামনের গাড়িটা হঠাৎ থামতেই তিনিও সজোরে ব্রেক কষলেন। ভয়ংকর ঝাঁকুনি দিয়ে স্টেশান ওয়াগনটা থামল।
ওয়াগনটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার ফলে তার পেছনের জানলাটা আমার জানলার পাশে এসে থামল, এবং আমি ওয়াগনের ভেতরটা এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
ভেতরে চাদরে জড়ানো কী একটা যেন রয়েছে। ভদ্রমহিলা সজোরে ব্রেক কষার ফলে চাদরের একটা কোণ সামান্য সরে গেছে। সেই কোণ দিয়ে কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে বাইরে।
সেদিকে একপলক তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার ক্লান্ত মস্তিষ্ক আমাকে তখন প্রাণপণে বোঝাতে চাইছে যে, আমার চোখ ভুল দেখেনি। সুতরাং আবার তাকালাম ওয়াগনের ভেতরে। না, প্রথমবারে আমি ভুল দেখিনি।
জিনিসটা একটা হাত–মানুষের হাত যে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, ওয়াগনের জানালায় কাচ না থাকলে আমি হয়তো হাত বাড়িয়েই ওই হাতটা ছুঁতে পারতাম। হাতটার মাঝের দু-আঙুলে কালচে লাল কী যেন লেগে আছে–বোধহয় রক্ত। তা ছাড়া পুরোনো চাদরে জড়ানো জিনিসটার আকৃতি দেখে এই শীতে আমি ঘামতে শুরু করলাম। চাদরের নীচে অবশ্যই একটা বডি লুকোনো রয়েছে।
