সুচরিতা কোনও জবাব দিল না। কিন্তু ওর চোখের নজর আর চোয়ালের রেখায় জেদের ছোঁয়া টের পেতে কষ্ট হল না আমার। এ ছাড়া একটা অদ্ভুত সতর্ক ভাবও লক্ষ করলাম। যেন বুঝতে চাইছে, বিনু ঠিক কোন পথ ধরে কোন লক্ষ্যে পৌঁছোতে চাইছে।
পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা উঁচিয়ে যখন আমরা লকারের ভিতরে নজর চালাই তখনও। ভিতর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাই না। কারণ, ঘরের আলোটা সবসময় তেরছাভাবে এসে পড়ে, আর লকারটাও সুড়ঙ্গের মতো গভীর। সুতরাং, কোনও জিনিস–মানে, গয়নাগাটি বা অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে আমরা হাত ঢুকিয়ে দিই ওই সুড়ঙ্গের অন্ধকার গহ্বরে। তারপর অন্ধকারেই হাতড়াতে থাকি।
একটু থেমে বিনু মাথার চুলে হাত বোলাল। সুচরিতাকে লক্ষ করে হেসে বলল, ডার্লিং, এইবার আসল মজা। ধরো তুমি প্রায় কাঁধ পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে দিয়ে অন্ধকারে লকারের ভিতরটা হাতড়াচ্ছ, এমন সময় একটা হাত খপ করে তোমার হাতটা চেপে ধরল। তুমি প্রথমেই একটা মানসিক ধাক্কা খাবে, তার পর ভয়ে চিৎকার করে উঠে তোমার হাতটা টেনে বের করে নিতে চেষ্টা করবে। তুমি বেশ টের পাচ্ছ, হাতটা ঠান্ডা, পিছল, আর তার শক্তিও অনেক। সুতরাং তোমাদের টানাটানি চলছে। তুমি হয়তো বেশ খানিকটা টেনে নিতে পারলে তোমার হাত। তারপর আতঙ্কে উঁকি মারলে লকারের ভিতরে। তখন তোমার হাত লকারের অন্ধকার জায়গা থেকে খানিকটা আলোর দিকে চলে এসেছে। ফলে লকারের ভিতরের হাতটাকে তুমি দেখতে পেলে। তোমার ফরসা হাত আঁকড়ে ধরে আছে আলকাতরার মতো কালো চকচকে একটা হাত। তার ওপরে ছাতা ধরার দাগ। তুমি একটা পুরোনো ভ্যাপসা গন্ধও পেলে নাকে। আর অবাক হয়ে দেখলে, সাপের মতো সাতটা আঙুল প্রাণপণে তোমার ফরসা হাতটা আঁকড়ে ধরেছে। আঙুলগুলো অল্প-অল্প নড়ছে। হাতের বাকি অংশটা মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে…। থামল বিনু। মুখে অদ্ভুত একটা শব্দ করে সুচরিতাকে বলল, এইরকম যদি হয়, তা হলে আমার ধারণা, তখন তুমি ভয়ে দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকবে। আর তার ওপর ঠিক তক্ষুনি যদি লোডশেডিং হয়ে যায়, তা হলে তো আর–।
বিনু, আজ আমরা উঠি। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঢের রসিকতা সহ্য করা গেছে।
দেখাদেখি কেয়াও উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিকঠাক করতে লাগল। ও বিনুর দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে হেসে বলল, চলি, বিনুদা। সুচরিতাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে একদিন আসবেন কিন্তু।
বিনু কেমন বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকাল আমাদের দিকে, বলল, তোমরা কি ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছ নাকি? সবে তো নটা বাজে।
সুচরিতা হঠাৎ কেমন শক্ত গলায় বলে উঠল, আপনারা যাবেন না, বসুন। আমি এখনই ওই আলমারিটা খুলে ওর লকারের ভিতরে হাত ঢোকাব। দেখি, আমি ভয় পাই কি না।
আমি আর কেয়া অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
বিনু সুচরিতাকে বলল, কী পাগলামো করছ, সুচরিতা! ওই লকারে তোমার হাত ঢোকানোর দরকার নেই। আলমারিটা পনেরো বছর ধরে বন্ধ আছে, বন্ধই থাক। পনেরো বছর ধরে আমরা কেউ ওটা খুলিনি। এখন ডিসটার্ব করার কী দরকার?
আমি অবাক হলাম। পনেরো বছর ধরে আলমারিটা খোলা হয়নি কেন? আর কাকেই বা ডিসটার্ব করার কথা বলছে বিনু?
সুচরিতা খিলখিল করে হাসল, বলল, পনেরো বছর ধরে আলমারিটা কেউ খোলেনি, আজ আমি খুলব বলে। তারপর চোয়াল শক্ত করে হনহন করে এগিয়ে গেল আলমারিটার কাছে। তার পাশেই দাঁড় করানো একটা টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চাবি বের করে নিয়ে ঘটাং শব্দ করে খুলে ফেলল স্টিলের আলমারির দরজা।
আলমারির ভিতর থেকে ধুলো উড়ল কি না বোঝা গেল না, তবে একটা বিশ্রী পুরোনো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে।
বিনু একটু জোরেই বলে উঠল, সুচরিতা, লকার খুলো না বলছি! প্লিজ, আমার কথাটা শোনো, সুচরিতা, প্লিজ…লকার খুলো না!
কিন্তু সুচরিতা কোনও কথাই শুনল না।
আলমারির একটা পাল্লা ওকে অনেকটা আড়াল করে দিয়েছে। টিউব লাইটের আলোও আড়াল হয়ে গেছে সেইসঙ্গে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুচরিতার নড়াচড়া দেখে আমরা বেশ আঁচ করতে পারছিলাম ও কী করছে।
আলমারির লকার খুলে তার ভিতরে প্রায় কাঁধ পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে পাল্লার পাশ থেকে আমাদের দিকে তাকাল সুচরিতা। হেসে বলল, এর ভিতরে কোনও কালো হাত নেই।
আমি আর কেয়া ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এটা নতুন কোনও খেলা কি না। বিনু কি আগে থেকেই বউয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে রেখে আমাকে আর কেয়াকে ভয় দেখাতে চাইছে?
কিন্তু আর কিছু ভেবে ওঠার আগেই সুচরিতা এক ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল। সে-চিৎকারে বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। এক ঝটকায় কেউ ওকে টেনে ধরল লকারের দিকে, কারণ ওর মুখটা বিশ্রী শব্দে আলমারির দরজার পাল্লায় বাড়ি খেয়ে চলে গেল আড়ালে। তারপর শুরু হল প্রাণান্তকর টানা-হ্যাঁচড়ার লড়াই।
বিনু তখনও নির্বিকারভাবে বসে আপনমনে বলে চলেছে, এত করে বারণ করলাম, তবুও তুমি শুনলে না। এত জেদ তোমার! সাহসের এত অহঙ্কার! তোমাকে বারবার করে বললাম, প্রত্যেক মানুষের মনেই ভয় আছে, কিন্তু তুমি আমার কথায় আমল দিলে না। এখন তো আর কিছু করার নেই….।
আমি আর কেয়া পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি। সারা শরীর ভয়ে কাঠ, নড়বার এতটুকু ক্ষমতা নেই। আর আলমারির কাছ থেকে সুচরিতা পাগলের মতো চিৎকার করে চলেছে। ওর মুখ বিকৃত, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, গাল কেটে রক্ত পড়ছে।
