কী করা যায় ভাবতে লাগলাম। আমার গাড়ির চারপাশে গাড়ির সমুদ্র। গাড়ির দরজা খুলব সে-উপায়ও নেই। তা ছাড়া, এই জগাখিচুড়ির মধ্যে গাড়ি ছেড়ে নামাও যাবে না।
হাত নেড়ে স্টেশান ওয়াগনের সানগ্লাস পরা ভদ্রমহিলার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করলাম– কিন্তু বৃথাই। তিনি সরাসরি সামনের দিকে তাকিয়ে। এ অবস্থায় মনে পড়ে যায় রাতে দেখা দুঃস্বপ্নের কথা : যে স্বপ্নে কেউ আপনাকে তাড়া করে আসছে অথচ আপনি কিছুই করতে পারছেন না। এমনকী দৌড়তেও পারছেন না। আপনার পা দুটো যেন কেউ বেঁধে রেখেছে।
অবশেষে হর্ন বাজাতে শুরু করলাম। এবং একইসঙ্গে আঙুল দিয়ে স্টেশান ওয়াগনের পেছনটা দেখাতে লাগলাম।
আমার সামনের সবুজ অ্যামবাসাডরের ড্রাইভার রাগী দৃষ্টিতে পেছন ফিরে আমাকে দেখল। ভাবলাম, সে হয়তো নেমে আমাকে দুটো কথা শোনাতে ছুটে আসবে। কিন্তু যেভাবে গাড়িগুলো সব গায়ে-গায়ে দাঁড়িয়ে আছে তাতে সে দরজা খুলে নামতে পারবে বলে মনে হয় না।
এমন সময় স্টেশান ওয়াগনের লাইনের গাড়িগুলো এগোতে শুরু করল। ওয়াগনটা আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। তার চলার ভঙ্গিতে সবসময়েই একটা ব্যস্ত ভাব। ওটার পেছনের গাড়িটা আমাকে আড়াল করার আগেই স্টেশান ওয়াগনের নম্বরটা দেখে নিলাম। পকেট থেকে পেন নিয়ে বাঁ-হাতের তালুতে নম্বরটা লিখে রাখলাম। তারপর চুপচাপ বসে রইলাম। শরীরে একটা অদ্ভুত ক্ষীণ কঁপুনি টের পেলাম।
হঠাৎ আমার পেছনের গাড়ির অধৈর্য হর্নের শব্দে খেয়াল হল আমার লাইনের গাড়িগুলো এগোতে শুরু করেছে।
আরও মাইলকয়েক নির্ভাবনায় এগিয়ে গেল গাড়ির সার। আমি ইতিউতি চেয়ে মেরুন স্টেশান ওয়াগনটাকে দেখতে চেষ্টা করছি, আর একইসঙ্গে সবুজ অ্যামবাসাডরের সঙ্গে আমার সংঘর্ষ কোনওরকমে এড়িয়ে চলেছি।
একসময় রাস্তার কিনারায় দাঁড়ানো একটা লালরঙের দোতলা বাড়ি আমি অন্যমনস্কভাবে পার হয়ে গেলাম। পার হতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে চোখে পড়ল থানা লেখা বোর্ডটা। তক্ষুনি ব্রেক কষে রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলাম। পেছনে ছুটে আসা একটা কালো ফিয়াট বিকট আর্তনাদে ডানদিকে গাড়ি কাটিয়ে অ্যাকসিডেন্ট বাঁচাল। ততক্ষণে আমি গাড়ি থেকে নেমে থানায় ঢুকে পড়েছি।
পুলিশের ইউনিফর্ম পরে একজন সার্জেন্ট একটা টেবিলে বসে কীসব লিখছিল, আমাকে ছুটে ঢুকতে দেখে চমকে মুখ তুলে তাকাল।
কী চাই?
আমি একটা খুনের রিপোর্ট লেখাতে চাই। কথাগুলো বলার সময় নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হল।
তাই নাকি?
সে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে একটা ছাপানো ফর্ম মতো কী যেন বের করে নিল। তারপর কলম বাগিয়ে ধরে বলল, কাউকে আপনি চাপা দিয়েছেন?
না–আমি নয়। মানে, আমার পাশের গাড়িতে ওই হাতটা দেখলাম। একটা স্টেশান ওয়াগন, মেরুন রঙের, একজন ভদ্রমহিলা।
একমিনিট। আগে স্থির হয়ে বসুন।
একটা চেয়ার দেখিয়ে দিল সে। তারপর নীচু গলায় প্রশ্ন করল, আপনার শরীর খারাপ হয়নি তো?
এ-প্রশ্নের জন্যে অফিসারটিকে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, আমার এলোমেলো কথায় যে কেউই এ-সন্দেহ করবে। তবুও মুখে বললাম, না, শরীর খারাপ হয়নি।
ঠিক আছে। এবার বলুন। কেউ কি উন্ডেড হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে?
না, তা নয়। মানে, ওই হাতটা হঠাৎ বেরিয়ে–।
ও, বুঝেছি। তা হলে এক কাজ করা যাক। আপনার নাম দিয়েই শুরু করি। কী নাম আপনার?
অফিসার বাধা দেওয়ায় ধৈর্যচ্যুতি হলেও শান্ত কণ্ঠে নিজের নাম বললাম, সান্যাল রুদ্রে সান্যাল।
ঠিকানা?
তাও বললাম।
তখন অফিসারটি লেখার কাজ সেরে মুখ তুলল।
ঠিক আছে, মিস্টার সান্যাল। এবার বলুন কী ব্যাপার? একেবারে প্রথম থেকে ধীরে-ধীরে সব গুছিয়ে বলুন।
অতএব প্রথম থেকে সব গুছিয়ে বললাম।
আমার কথা শেষ হলে সার্জেন্ট থুতনিতে হাত ঘষল। বলল, হুম। আমাদের দেওয়ার মতো সেরকম কোনও তথ্য আপনার হাতে নেই, মিস্টার সান্যাল। ঠিক বলছেন, আপনি একটা হাত দেখেছেন? আপনার ভুল হয়নি তো? মানে, আমি বলছি, ওয়াগনটার পেছনের জানলার কাচটা হয়তো ময়লা ছিল।
ময়লা থাক আর না-ই থাক, ওটা একটা হাতই ছিল। আমার ভুল হয়নি। আর, হাতটায় রক্তের দাগ আমার স্পষ্ট নজরে পড়েছে।
আমি বোধহয় একটু চেঁচিয়েই উত্তর দিয়ে ফেলেছিলাম। কারণ, সার্জেন্ট বলল, আস্তে, উত্তেজিত হবেন না।
সার্জেন্টের নাম অনুপম বক্সী। তার বুকে লাগানো প্লাস্টিকের চাকতি থেকেই নামটা জানতে পেরেছি। এখন ভাবতে গিয়ে দেখছি, সে তার নিজের কাজ ঠিকমতোই করেছে। তখন মনে হয়েছিল আমার সঙ্গে সময় নষ্ট না করে স্টেশান ওয়াগনের পেছনে তার দৌড়ানো উচিত ছিল। এবং সেকথা তাকে বলেছিলাম।
একবার বাইরে তাকিয়ে দেখুন, মিস্টার সান্যাল। রাস্তার গাড়ির ভিড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বলল, ধরে নিলাম আপনার ওই মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা এই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও আটকে আছে। কিন্তু হলে কী হবে? আমাদের গাড়ি তো আর উড়তে পারে না।
তা হলে যে করে হোক রাস্তাঘাট আটকানোর ব্যবস্থা করুন।
অসম্ভব। এখন রাস্তাঘাট আটকালে সারা শহর গাড়িতে ছেয়ে যাবে। দাঁড়ান, একমিনিট দাঁড়ান…।
এই বলে অনুপম বক্সী টেবিলে রাখা ফোনের রিসিভার তুলে নিয়ে একটা নম্বর ডায়াল করল। তারপর নীচু গলায় কার সঙ্গে যেন কথা বলতে লাগল।
