আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেছি। কেয়ার চিৎকারে দোতলা তিনতলা থেকে কেউ যে নেমে আসেনি এই রক্ষে। তবে মনে পড়ল, বাড়িতে ঢোকার সময়ে দোতলা বা তিনতলার জানলায় আলো জ্বলতে দেখিনি।
কেয়া রুমালে চোখ মুছছিল, মুখ মুছছিল। বিনুর এই রসিকতা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। সুচরিতা হাসি-ঠাট্টা করে ব্যাপারটা হালকা করতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা পুরোপুরি সহজ হতে পারছিলাম না। কোথায় যেন তাল কেটে গেল।
বিনু বিছানায় গিয়ে বসল আবার। বেডকভারে কয়েকবার আঁচড় কেটে বলল, এইজন্যেই আমি বলেছিলাম, আমাদের সবার মনেই ভয় আছে। সেটা যে সবসময় ঠিক মৃত্যুভয় তা নয়– তবে ভয়।
সুচরিতা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল, না মশাই, সবাই এত সহজে ভয় পায় না। দরজার আওয়াজ করাতে কেয়া হয়তো ভয় পেয়েছে, কিন্তু তোমার বন্ধু অত কাবু হয়নি। আর আমার কথা তো বাদই দাও। আমার বাবা জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভূমিতে সার্ভের কাজ করতেন। আমি ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া নানা খানাখন্দে, পোড়ো জায়গায় রাতবিরেতে ঘুরে বেড়িয়েছি। ভূত-টুতে কোনও আস্থা নেই আমার।
বিনু সুচরিতাকে দেখল একবার। তারপর আমাকে লক্ষ করে বলল, সুচরিতাকে এই সহজ ব্যাপারটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে, ভূত নেই, কিন্তু ভয় আছে। সুস্থ মানুষ তো বটেই–এমনকী পাগল পর্যন্ত ভয় পায়। আচ্ছা বলো তো, বিছানার ওপাশটায় ওটা কী?
আমি বিছানার খুব কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু বিনু বলার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাপারটা খেয়াল করিনি।
বিছানার কালো আর গোলাপি ফুলকাটা একটা চাদর ঢাকা ছিল। লক্ষ করলাম, বালিশের কাছটায় চাদরের নীচে লম্বা দড়ির মতো কী একটা এঁকেবেঁকে পড়ে আছে। তার ওপরে চাদর থাকা সত্ত্বেও জিনিসটা সড়সড় করে অল্প-অল্প এগোচ্ছে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার মুখ দিয়ে আতঙ্কের চিৎকার বেরিয়ে এল, সাপ সাপ!
ততক্ষণে সুচরিতা আর কেয়াও বস্তুটি দেখতে পেয়েছে। কেয়া হোঁচট খাওয়া এক আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু সুচরিতা শক্ত ধাতের মেয়ে। ও দরজার পাশে দাঁড় করানো কাঠের খিলটা তুলে নিয়ে সপাটে বসিয়ে দিল চলমান সরীসৃপটির ওপরে। ওই সঙ্কটের মধ্যেও লক্ষ করলাম, সুচরিতার চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া।
কিন্তু সরীসৃপটি তখনও দিব্যি নড়ছে চাদরের তলায়। সুচরিতার প্রথম আঘাত তাকে বিন্দুমাত্রও কাবু করতে পারেনি। সুচরিতা উত্তেজিত হয়ে দ্বিতীয়বার আঘাত করল। কিন্তু তাতেও লাভ হল ন।
এইরকম একটা বিপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি যখন কিছু একটা করার কথা ভাবছিা, ঠিক তখনই বিনু হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর একটানে বেডকভারটা সরিয়ে দিল একপাশে।
সবুজ রঙের একটা মোটা নাইলনের দড়ি এঁকেবেঁকে পড়ে আছে বিছানায়। তার একপ্রান্ত থেকে একটা সরু সুতো চলে গেছে বিনুর কাছে। ওটায় টান মেরেই বিনু রজ্জুতে সর্পভ্রমের ব্যবস্থা করেছিল। সবটাই বিনুর চালাকি আর হাতের কাজ।
সুচরিতার মুখ দেখে বোঝা গেল, এই সাপের ভয় দেখানোর ব্যাপারটা ওর আগে থেকে জানা ছিল না। ও কিছুক্ষণ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিনু তখনও হাসছে। কোনওরকমে হাসি থামিয়ে ও বলল, ঝাসির রানি, এবার কাষ্ঠদণ্ডটিকে যথাস্থানে রেখে দাও।
সুচরিতা কেমন বোকার মতো দাঁড়িয়েছিল। বিনুর কথায় ও যেন সংবিৎ ফিরে পেল। খিলটা রেখে দিয়ে এল দরজার পাশে।
আমার বেশ রাগ হচ্ছিল বিনুর ওপর। ওর নতুন বিয়ে করা বউয়ের সামনে এ-ধরনের বদ-রসিকতা না করলেই কি চলছিল না!
বিনু সুচরিতাকে উদ্দেশ করে বলল, ডার্লিং, এইবার তো মানবে যে, আমার বন্ধুটি সাপের ভয়ে কাবু হয়েছে। তুমিও কিন্তু বেশ ভয় পেয়েছিলে। যদি তুমি আগে থেকে দড়ি আর সুতোর ব্যাপারটা জানতে তা হলে মোটেই ভয় পেতে না। এটাই হচ্ছে ভয় পাওয়ার মজা। একই ঘটনায় কেউ ভয় পায়, আবার কেউ পায় না। তা ছাড়া ভয় পাওয়ার মধ্যে কেমন বেশ একটা থ্রিল আছে। এই যেমন ধরো, বড় নাগরদোলা, কিংবা নিক্কো পার্কের ওয়াটার শুট বা রোলার কোস্টার। এসব খেলাতে ভয় করলেও আমরা চড়ে মজা পাই। কেন জানো? কারণ, আগে থেকেই আমাদের জানা আছে, ভয়টা মিথ্যে সত্যিকারের কোনও বিপদ আমাদের হবে না। এটাই হচ্ছে ভয় পাওয়ার মজা…।
কেয়া আমার হাতে ছোট্ট করে চিমটি কাটছিল? অর্থাৎ, এবার মানে-মানে বাড়ি চলো। আমারও কেমন অস্বস্তি লাগছিল। সুতরাং বিনুকে বলে উঠতে যাব, তখনই সুচরিতা পাথরের মতো গলায় বলে উঠল, আমি কিন্তু ভয় পাইনি।
বিনু হাসল আবার। বলল, তোমারও মনে ভয় আছে, সুচরিতা–সে তুমি স্বীকার করো আর না-ই করো। যেমন ধরো, ওই আলমারির লকারটা–ওটার কথা তোমাকে একটু বলি…।
ওঃ, বিনুর রসিকতা কি আর শেষ হবে না! ও তখন আঙুল তুলে দেখিয়েছে ঘরের এক কোণে দাঁড় করানো একটা সাড়ে ছফুট স্টিলের আলমারির দিকে। আলমারিটা একটু পুরোনো, রং ময়লা হয়ে গেছে। এ ছাড়া ওটার আর কোনও বিশেষত্ব নেই।
বিনু আমাদের মুখের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নেশা ধরানো গলায় নাটকীয়ভাবে বলে চলল, ঘটাং করে শব্দ করে স্টিলের আলমারির দরজা খুলি আমরা, তারপর ছোট মাপের একটা চাবি দিয়ে লকার খুলি। সাধারণত আমাদের যা হাইট তাতে লকারের ভিতর পর্যন্ত সরাসরি নজর যায় না–পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে দেখতে হয়। কী সুচরিতা, এরকম করেই তো লকার ব্যবহার করো তুমি?
