কফির কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে বিনু যে কথাটা বলল তারই জের টেনে মন্তব্য করল, আমাদের প্রত্যেকের মনেই ভয় আছে।
সুচরিতা বেশ কথাটথা বলতে পারে। ওর মিষ্টি মুখের মধ্যে কোথায় যেন একটা সপ্রতিভ জেদি ভাব রয়েছে! ও সঙ্গে-সঙ্গে পালটা প্রশ্ন করল বিনুকে, কীসের ভয়?
বিনু নির্বিকারভাবে সিঙাড়ায় একটা কামড় দিয়ে বলল, মৃত্যুভয়। তারপর কফির কাপে শব্দ করে পরপর দুটো চুমুক দিয়ে আরও বলল, অনেক সময়, ধরো, আমরা জানি যে, আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না, তা সত্ত্বেও আমরা ভয় পাই। মানুষের মনের এ এক অদ্ভুত ব্যাপার।
আমি দিব্যি তৃপ্তি করে কাজুবাদাম খাচ্ছিলাম, বিনুর কথায় থেমে গেলাম। ও কী বলতে চাইছে? এ যেন অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো শোনাচ্ছে! তো হেসে সেই কথাটাই বললাম ওকে।
ও একটা হাত নাড়ল শূন্যে। বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, দাঁড়া, একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ছোটবেলায় আমরা একটা খেলা খেলতাম মনে আছে, প্রশ্ন-উত্তরের খেলা? একজন বন্ধু আর-একজনকে জিগ্যেস করত, আমার সঙ্গে জঙ্গলে যাবি? তখন দ্বিতীয়জন জানতে চাইত, কী করতে? উত্তরে প্রথমজন বলত, বাঘ মারতে। দ্বিতীয় বন্ধু তো রাজি, হ্যাঁ যাব। সেটা শুনে প্রথমজন সতর্ক করে দেওয়ার ভঙ্গিতে জিগ্যেস করত, ভয় পাবি না তো? দ্বিতীয়জন বুক ফুলিয়ে বলত, না। আর তক্ষুনি প্রথমজন দ্বিতীয়জনের চোখের সামনে আচমকা হাত নেড়ে ভয় দেখাত, এবং নির্ভীক সাহসী বন্ধুটির চোখের পাতা পড়ে যেত। তুই তো জানিস, ব্যাপারটা স্রেফ রিফ্লেক্স মানে, প্রতিবর্তী ক্রিয়া। সাহসী বন্ধুটি বেশ ভালো করেই জানে যে, বন্ধু কিছুতেই তার চোখে মারবে না কিন্তু সব জেনেশুনেও তার চোখের পাতা পড়ে যায় আত্মরক্ষার তাগিদে। এ ব্যাপারটাকে তুই কী বলবি?
প্রশ্নটা বিনু আমাকে লক্ষ্য করে করলেও উত্তর দিল কেয়া। বলল, বিনুদা, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে একেবারে অকারণে কি কেউ ভয় পায়?
বিনু পাঁপড়ভাজা আর কফি আরাম করে শেষ করল, তারপর বলল, আচ্ছা, ওই দরজাটার কথাই ধরা যাক।
আঙুল তুলে ঘরের পশ্চিমের দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে লাগানো একটা বন্ধ দরজার দিকে দেখিয়েছে বিনু। দেখেই বোঝা যায়, দরজাটা বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। যে-ই ওটা বন্ধ করে থাকুন না কেন, সে ওটা বরাবরের মতো বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। খিল-ছিটকিনি ছাড়াও আড়াআড়ি দুটো কাঠ পেরেক ঠুকে আটকে দেওয়া রয়েছে বন্ধ পাল্লার ওপরে। আর তার সামনে দুটো ট্রাঙ্ক আর সুটকেস ওপর-ওপর সাজানো।
বিনুর ঘরটা মাপে বেশ বড় এবং বেশ পুরোনো। দেওয়ালের হালকা নীল রঙের ওপরে ড্যাম্প আর সময়ের ছাপ পড়েছে। সিলিং-এ কাঠের কড়ি। সেখান থেকে ঝুলছে মান্ধাতার আমলের ডি. সি. পাখা। তা থেকে কিচকিচ আওয়াজ বেরোচ্ছে। ঘরের উত্তরের দেওয়ালে একটাই জানলা। সেটা দিয়ে প্রথম শীতের মোলায়েম ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়ছে ঘরে।
একটা টিউব লাইটের আলোয় ঘরটা তেমন স্পষ্ট ফুটে ওঠেনি। বিনু আর কেয়া বসেছিল বিছানার ওপরে। আমি টিভির সামনে একটা চেয়ারে, আর সুচরিতা অন্দরে যাওয়ার দরজার সামনে একটা মোড়ায় বসে।
বিনু বলল, এই বাড়িটা প্রায় সত্তর বছরের পুরোনো। ওই দরজাটার ওপাশে কী আছে। আমি জানি না। এখন মনে করো, রাতের অন্ধকারে ওই দরজায় যদি কেউ নক করে তখন আমার অবস্থাটা কী হবে! আমি ভয় পাব। অথচ আমাদের সদর দরজায় কেউ নক করলে আমরা দিব্যি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিই–মোটেই ভয় পাই না। তো বহুদিন ধরে বন্ধ ওই দরজাটার যদি রাতের অন্ধকারে ঠকঠক করে কেউ শব্দ করে তখন আমরা ভয় পাই কেন?
সুচরিতা বোগাস! বলে খালি কাপ-প্লেটগুলো গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল অন্দরের দিকে।
আমি কেয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, বুঝলে, এই হল বিনু।
আর কথাটা শেষ হতে না হতেই ওই বন্ধ দরজার ওপিঠে কেউ বেশ জোরে নক করল।
কেয়ার ঠোঁট চিরে অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল। ওর চোখ বড় হল। একবার আমার দিকে, একবার বিনুর দিকে, আর একবার দরজাটার দিকে দেখতে লাগল ও। বিনুও দেখলাম অবাক হয়ে বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি থেমে-থেমে বললাম, কী রে, কী ব্যাপার?
বিনু কিছু বলে ওঠার আগেই আবার ঠকঠক শব্দ। তারপর আরও জোরে আবার। বারবার। যেন কেউ পাগল হয়ে নক করে চলেছে দরজার ওপাশে।
বিনু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিড়বিড় করে বলল, দাঁড়া, দরজাটা খুলে দেখি–। তার পর এগোল সেই রহস্যময় দরজার দিকে।
কেয়া এবার তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল–ভয় পাওয়া চিৎকার।
আমি উঠে একলাফে চলে গেলাম কেয়ার পাশে। ওকে জড়িয়ে ধরলাম। বিনু ফিরে তাকাল আমাদের দিকে। নক করার শব্দ তখন থেমে গেছে।
আর ঠিক তখনই সুচরিতা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকল। অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে।
কেয়া হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বিনু ওকে লক্ষ্য করে হেসে বলল, সুচরিতা, তুমি ওদের দরজার সিক্রেটটা বলে দাও।
সুচরিতা কেয়ার কাছে এসে ওর দুধে হাত রেখে বলল, মিছিমিছি ভয় পেয়েছ, ভাই। ও-দরজাটার ওপাশে আমাদের বাথরুম। আমিই গিয়ে ওখানে নক করছিলাম–তোমাদের সঙ্গে মজা করার জন্যে। ও আমাকে আগে থাকতেই শিখিয়ে রেখেছিল।
