কী বলছেন? আঙুলের ছাপ মিলিয়েই আপনি আসল খুনির সন্ধান পেয়ে গেছেন? যাঃ, আপনি ঠাট্টা করছেন! বলছেন ঠাট্টা নয়! ঠিক আছে, বলুন, শুনি কে সেই মিস্টার এক্স।
ড্রাকুলার ড্রেসটা আমার সুটকেসে কেউ ঢুকিয়ে রেখেছিল…যাতে সন্দেহটা আমার ঘাড়ে পড়ে? আচ্ছা…তারপর? ও, ছোটকার ইলেকট্রিক তারের কেসটাও তাই! বাঃ, চমৎকার। বলুন, বলুন, আমি কান পেতে আছি।
কী, রাকেশ খুনিকে চেনে! ও-ই খুনের একমাত্র আই উইটনেস! খুনি রাকেশের খুব ক্লোজ? কী বলছেন আপনি! কাকিমা কখনও একাজ করতে পারে না। প্লিজ, আপনি কিন্তু লিমিটের বাইরে চলে যাচ্ছেন, ইনস্পেক্টর! কাকিমা কী টাইপের ওয়াইফ আপনি জানেন না! কাকা যতই ইয়ে হোক, কাকিমা সবসময় কাকাকে ভাবত–স্বামী নয়–স্বামীদেবতা। কাকিমার পক্ষে একাজ অসম্ভব! প্লিজ, স্টপ, ইনস্পেক্টর..ফর গড় সেক শাট ইয়োর মাউথ। কাকিমা…।
কী, আপনার কথা আমি ঠিকমতো বুঝতে পারিনি? কাকিমা নয়, রাকেশ। রাকেশ ওর বাবাকে খুন করেছে! কীসব আনসান বকছেন আপনি! এই মুহূর্তে বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে। জাস্ট… গেট..আউট!
আচ্ছা, রাকেশ কী করে খুন করবে বলুন তো! ওইটুকু ছেলে! সবে সতেরো ছুঁয়েছে। কাকার খাটে ওর আঙুলের ছাপ পেয়েছেন? সে তো থাকতেই পারে। কী বলছেন? ইলেকট্রিকের তারটার নানান জায়গায় ওরই আঙুলের ছাপ? ওর রাফ খাতায় আরও প্রমাণ পেয়েছেন? কী প্রমাণ? ও ডায়েরি লিখত! জানতাম না তো! কী লিখেছে সেখানে? মায়ের ওপরে বাবার টরচার ও আর সইতে পারছিল না? বাবাকে ও ভয় দেখিয়ে কিংবা শক দিয়ে খতম করবে? হতেই পারে না! ফুলের মতো ওইটুকু ছেলে! দেখি ওর সেই ডায়েরি…।
ও মাই গড! মা-কে এত ভালোবাসে ও! আমি বা ছোটকা যে কাজ করতে পারিনি তাই করে দেখাল রাকেশ! আমার ছোট ভাইয়ের ওইটুকু বুকে এত সাহস লুকিয়ে ছিল।
এ তুই কী করলি, রাকেশ! এ তুই কী করলি! রাকেশ রে…রাকেশ…! এই দাদাটাকে একবার বললি না তোর মনের কথা? তোর মা-কে তুই এত ভালোবাসিস! আমিও তো তোর মা-কে ভালোবাসি…তোকে ভালোবাসি। মনে-মনে তোর বাবাকে আমি দুশো সাঁইতিরিশবার খুন করেছি। হা, দুশো সাঁইতিরিশবার। মনে-মনে। আর তুই করেছিস মাত্র একবার–তবে মনে-মনে নয়, সত্যি সত্যি। কী করে পারলি রে তুই? আমাকে তুই ভালোবাসার টানে হারিয়ে দিলি?
ইনস্পেক্টর, প্লিজ, রাকেশকে আপনি ছেড়ে দিন। আপনার দুটি পায়ে পড়ি। ওর জীবন তো সবে শুরু। কত আলো, কত আকাশ ওর দেখার বাকি আছে। আর আমি? স্রেফ একজন বেকার যুবক, অন্যায় ভালোবাসা বুকের ভেতরে লুকিয়ে চোরের মতো বেঁচে আছি। বিশ্বাস করুন, রাকেশের জেল কিংবা সি-টাসি হলে কাকিমা নির্ঘাত সুইসাইড করবে। আর ও সুইসাইড করলে…। তারপর বাকি থাকব শুধু আমি…। কিন্তু যে-দুজনের কথা ভেবে আমার ছন্নছাড়া ছিন্নছেঁড়া জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করত, তারা দুজনেই যদি না থাকে তা হলে আমার আর বেঁচে থেকে লাভ কী! সে বেঁচে থাকার কোনও মানে আছে বলে আপনি মনে করেন, ইনস্পেক্টর?
আচ্ছা, একটা লাস্ট রিকোয়েস্ট করব আপনাকে? একটা কথা রাখবেন আমার ও আমাকে ফাঁসি দেবেন? কিংবা যাবজ্জীবন? প্লিজ, আপনার পায়ে ধরছি, ইনস্পেক্টর। হ্যাঁ, আমিই খুন করেছি কাকাকে। আমিই খুন করেছি। আমি-আমি-আমি! এবার অন্তত আমাকে আপনি অ্যারেস্ট করুন। প্লিজ, অ্যারেস্ট করুন আমাকে…।
আসুন, রাকেশের ওই দুরন্ত ভালোবাসার কাছে অন্তত একটিবারের জন্যে আমরা হেরে যাই…।
মনে ভয় আছে
কফির কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়ে বিনু বলে উঠল, তোদের আজ একটা অদ্ভুত গল্প শোনাব।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেয়ার দিকে তাকিয়ে মুখের একটা ভঙ্গি করলাম–যার অর্থ হল, তোমাকে বলেছিলাম না! এবার শোনো বিনুর গল্প!
বিনু আমার অনেকদিনের বন্ধু। কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা হয় এলোমেলোভাবে, কয়েক বছর পরপর। ও ফোন করে, নয়তো চিঠি দেয়, কিন্তু সবই একতরফা। কারণ ওর ঠিকানার কোনও ঠিক নেই। সুতরাং ইচ্ছে হলেও ওকে ফোন করার বা চিঠি দেওয়ার কোনও উপায় নেই।
এবারও হঠাৎই ওর চিঠি পেয়েছিলাম। খুব ছোট্ট চিঠিঃ
বিয়ে করেছি। বউ নিয়ে সাতদিনের জন্যে কলকাতা যাচ্ছি। ২৭ তারিখ কলকাতা ছাড়ব। ২৬ তারিখ, শনিবার, কেয়াকে নিয়ে চলে আয়। চায়ের নেমন্তন্ন রইল। আর খুব মজার গল্প শোনাব।
চিঠির শেষে ওর কলকাতার আস্তানার ঠিকানা এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছোতে হবে তার নির্দেশ।
বিনুর ব্যাপারটাই এইরকম। ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি। আর যত উদ্ভট বিষয় নিয়ে চর্চা। ওর সবকিছুই রহস্যময়।
বিনুর বউয়ের নাম সুচরিতা। রাজস্থানের কোথায় গিয়ে যেন আলাপ, তারপর দিল্লিতে বিয়ে। বিনুর ব্যাপারে যদি এরপর কাশ্মীরে গিয়ে বউভাত হয়ে থাকে, তা হলেও আমি অবাক হব না।
কেয়াকে বিনুর অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপারের কথা বলেছিলাম। বিনুকে ও আগে দেখেনি। আমার কাছে ওর কথা শুনেছে, আর দু-একবার ফোনে কথা বলেছে।
ওর নতুন বউয়ের জন্যে একটা শাড়ি কিনে অনেক অলিগলি পেরিয়ে অবশেষে বিনুর আস্তানার পৌঁছোলাম। জরাজীর্ণ তিনতলা বাড়ির ফ্ল্যাট। যদিও ফ্ল্যাট শব্দটা এই বাড়ির সঙ্গে মোটেই খাপ খায় না। এ-বাড়ির কথা ও আগে কখনও আমাকে বলেনি।
আমাকে দেখতে পেয়েই বিনু একেবারে জড়িয়ে ধরল। বউদের আলাপ করিয়ে দিল। বেশ খানিকক্ষণ ধরে হইহই করল সবাইকে নিয়ে। স্কুলজীবনের কয়েকটা সত্যি-মিথ্যে ঘটনা বলে সুচরিতা আর কেয়ার সামনে আমাকে সে হেনস্থা করল। তারপর চায়ের নেমন্তন্ন উপলক্ষ্যে সুচরিতা কফি, সিঙাড়া, কাজুবাদাম আর পাঁপড়ভাজা নিয়ে এসে সাজিয়ে দিল সামনে।
