অনেকে ভাবতে পারেন, এ আর এমনকী! অনেক আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবকেই তো আমরা চিরদিন মনে রাখি! তা হলে ভোলাকে ভুলতে না পারার মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে!
আছে এই কারণেই যে, ভোলা মানুষ নয়–রোবট।
এইবার বলুন, আজকের এই কলকবজার যুগে একটা যন্ত্রের কথা এতবছর ধরে কেউ মনে রাখতে পারে–যদি না সেই যন্ত্রের মধ্যে অদ্ভুত কিছু থাকে।
আজ সেই ভোলার কথাই বলব।
খুব ছোটবেলায় আমার মা মারা গিয়েছিল। আমার বাবা যখন আমাকে নিয়ে বেজায় হিমশিম খাচ্ছে, তখনই এশিয়া রোবোটিক্স কোম্পানি থেকে ভোলাকে নিয়ে আসে। ভোলা ছিল ভি. এক্স থ্রি মডেলের ডোমেস্টিক কম্প্যানিয়ান রোবট, অর্থাৎ, গৃহস্থের উপযুক্ত সঙ্গী রোবট।
এসব কথা আমি বড় হয়ে বাবার কাছে শুনেছি।
ছোটবেলা থেকেই ভোলাকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়াটা আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। একবারের জন্যেও মনে হয়নি ও যন্ত্রদাস কিংবা রোবট।
ভোলার চেহারায় চোখে পড়ার মতো আলাদা কিছু ছিল না। ও যে আসলে কী, সেটা ওকে দেখে একটুও বোঝা যেত না। তবে চলাফেরা কথাবার্তায় ব্যাপারটা আঁচ করা যেত।
ভোলার মাথায় কদমছাঁট চুল। মুখটা গোল ধরনের। চোখজোড়া সবসময়েই ছানাবড়া যেন কোনও কিছু দেখে অবাক হয়ে গেছে। গায়ে রংচঙে হাফশার্ট, পায়ে ডোরাকাটা পাজামা। হাত পাগুলো সরু-সরু হলেও তেমন বেমানান নয়। আর উচ্চতা ছিল চার ফুট।
ভোলার সঙ্গে খেলাধুলো করে আমার দিব্যি সময় কাটত। খেলতে-খেলতে আমি একসময় হাঁফিয়ে পড়তাম, ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। ধপাস করে বসে পড়তাম মেঝেতে।
ভোলা কিন্তু মোটেই ক্লান্ত হত না, হাঁফাত না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছানাবড়া চোখে আমাকে দেখত। তারপর জিগ্যেস করত, কী হল, ভাইটি, আর খেলবে না?
আমি বলতাম, না, ভোলা, ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। তোমার লাগছে না?
না, গো–আমার টায়ার্ড হওয়ার জো নেই।
আমি অবাক হয়ে ভোলাকে দেখতাম। ভাবতাম, মানুষের চেয়ে যন্ত্রই ভালো ইচ্ছেমতন যতক্ষণ খুশি খেলতে পারে।
প্রথম-প্রথম ভোলাকে আমি ভোলাদা বলতাম। কিন্তু বাবা একদিন শুনতে পেয়ে আমাকে বারণ করল? কী বলছ, সন্তু! রোবট আবার দাদা কীসের! ওকে তুমি নাম ধরেই ডাকবে–যেমন আমি ডাকি।
ভোলা কিন্তু বরাবর আমাকে ভাইটি বলেই ডাকত।
আমরা দুজনে সমসময় একসঙ্গে থাকতাম। বাবা অফিসে বেরিয়ে গেলে ভোলার কাছে আমাকে নিশ্চিন্তে রেখে যেত।
আমার স্কুলে যাওয়ার সময় হলেই ভোলা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোত। বড় রাস্তা পার করে বাস ধরে আমাকে পৌঁছে দিত স্কুলে। তারপর সারাক্ষণ স্কুলের বাইরে একটা গাড়িবারান্দার নীচে বসে অপেক্ষা করত।
স্কুল ছুটি হলে আবার আমাকে আগলে নিয়ে আসত বাড়িতে।
ওকে নিয়ে সবচেয়ে ঝামেলা হত পরীক্ষার সময়। সবসময় কানের কাছে বলত, ভালো করে পড়ো, ভাইটি, ভালো করে পড়ো৷ বাবা যত না বলত তার চেয়ে অনেক বেশি বলত ভোলা। পড়তে-পড়তে যখন আমি ঘুমে ঢুলে পড়তাম তখন ভোলা আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকত : ভাইটি, লক্ষ্মী আমার, ঘুমিয়ো না। কাল যে পরীক্ষা।
আমি চোখ ডলে ঘুম তাড়িয়ে আবার পড়তে শুরু করতাম। কিন্তু খুব রাগ হত ভোলার ওপর। বলতাম, তোমার কি কখনও ঘুম পায় না!
ভোলা হাসত। হাসলে ওর ঠোঁটটা সামান্য চওড়া হত। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, ঘুম পেলে আমাদের চলে না, ভাইটি।
অনেকসময় এমন হয়েছে যে, ইতিহাস পড়তে-পড়তে ভীষণ বিরক্ত হয়ে চটাস শব্দে বই বন্ধ করে ফেলেছি ও দুর, কিচ্ছু মুখস্থ হতে চাইছে না! বারবার ভুলে যাচ্ছি।
ভোলা তখন বইটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়েছে : কই, আমায় বইটা দাও দেখি! কোন জায়গাটা বলো তো…।
ওকে পৃষ্ঠাগুলো দেখিয়ে দিয়ে বলেছি, শুধু সাল-তারিখ আর গুচ্ছের রাজা-বাদশার নাম! এসব কখনও সহজে মুখস্থ হয়!
ভোলা পৃষ্ঠাগুলোর দিকে দু-পলক তাকাল, তারপর বইটা বন্ধ করে বলল, নাও, তুমি এবার চোখ বুজে শুনে যাও। একমনে শুনবে কিন্তু…।
ব্যস! ভোলা গড়গড় করে পৃষ্ঠাগুলো মুখস্থ বলে যেত আমার কানের কাছে। আর আমি ওর তাকলাগানো ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। ওর মুখে শুনতে-শুনতে ইতিহাসের পড়া দিব্যি মুখস্থ হয়ে যেত।
আমি ভোলাকে বলতাম, আমার বদলে তুমি পরীক্ষা দিলে রেজাল্ট অনেক ভালো হত।
ভোলা প্রতিবাদ করে বলত, না, ভাইটি, আমি ফেল করতাম। কোথা থেকে কোন পর্যন্ত লিখতে হবে সেটাই তো আমি বুঝতে পারি না!
তা হলে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি পরীক্ষা দেব।
আমার এই অদ্ভুত বায়না শুনে ভোলা হেসে বলত, ভাইটি, এভাবে পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই।
আমি ওর কথাটা মন দিয়ে ভাবতাম। এতসব ও বোঝে কেমন করে!
আমার সঙ্গী হয়ে সময় কাটানো ছাড়াও কিছু-কিছু বাড়তি কাজ ভোলাকে করতে হত। যেমন, বাবার ফাইফরমাশ খাটা, দোকানে যাওয়া, টেলিফোন কিংবা ইলেকট্রিকের বিল জমা দিয়ে আসা– এইসব। কিন্তু এত কাজ করেও ভোলাকে কখনও বিরক্ত বা ক্লান্ত হতে দেখিনি। ওকে যদি জিগ্যেস করতাম, এত কাজ করতে করতে কখনও তোমার বিরক্ত লাগে না? তা হলে ও হয়তো হেসে বলত, বিরক্ত হলে আমাদের চলে না, ভাইটি।
আমার দেখাদেখি ভোলা বাবাকে বাবা বলেই ডাকত। বাবার অফিসের ব্যাগটা হাতে তুলে দিত, জুতো পালিশ করে দিত, বাবা কখন অফিস থেকে ফিরবে জিগ্যেস করত, সাবধানে যাতায়াত করার জন্যে পরামর্শ দিত।
