আমি মালিকের কাছে গিয়ে ওর গায়ে গা ঘষলাম, বললাম, তোমাকে তো কখন থেকে সাবধান করছি! তুমি তো আমার কথা কানেই তুলছ না!
আমার ঘেউ-ঘেউ শুনে মালিক আমার গায়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগল। বারবার আমার নাম ধরে ডাকতে লাগল।
হঠাৎই চোখ ফিরিয়ে দেখি মেয়েটার পড়ে থাকা জামাকাপড়গুলোও আর নেই। সেগুলোও কোন জাদুমন্ত্রে কখন যেন উধাও হয়ে গেছে!
মালিক কাঁপতে কাঁপতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমার চেন ধরে টান মারল? চল, চল, বাড়ি চল–জলদি।
ভয় পাওয়া খরগোশের মতো আমরা দুজনে তরতর করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। রাস্তা তখন আরও নির্জন হয়ে গেছে। হালকা কুয়াশা কালো রাতকে ধীরে-ধীরে ঘোলাটে করে দিচ্ছে।
আমি দুঃখে মাথা নাড়ছিলাম। যদি আমার মালিকের আগেই একটা হিল্লে হয়ে যেত তা হলে আজকের প্রেতিনীর ফাঁদে মোটেই পা দিতে হত না। ব্যাপারটা আর-একটু এগোলে কী সর্বনাশ হত কে জানে!
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আমরা শোভাবাজার ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে সবে ডানদিকে বাঁক নিয়েছি, এমন সময়…এমন সময় একটি মেয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
লম্বা, স্মার্ট চেহারা, চোখে হালফ্যাশানের চশমা, কাঁধে ঝোলানো সাইডব্যাগ, হাতের মুঠোয় একটা রুমাল।
রাস্তার আলোয় মেয়েটির শাড়ির রং গাঢ় বলেই মনে হল। আর গায়ের শালটা সাদাটে।
ঠান্ডায় গায়ের শালটাকে প্রায় আঁকড়ে ধরেছে মেয়েটি। শীতে কষ্ট হলেও মুখে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে মালিককে জিগ্যেস করল, নন্দরাম সেন স্ট্রিট কীভাবে যাব একটু বলে দেবেন? স্ট্যান্ডে একটাও অটো পেলাম না। রাস্তাটা অন্ধকার-অন্ধকার…কী বলব..মানে একটু ভয়-ভয় করছে..।
আমি শুধু পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিলাম। তার সঙ্গে আর কোনও ভয়ের গন্ধ ছিল না। তাই মালিককে বললাম, লেডি ইন ডিসট্রেস। নাও, হেল্প করো। আমাদের সঙ্গে ওকে ডেকে নাও। আমরাও তো অনেকটা সেদিকেই যাব।
আমি কথা বলায়–মানে, ঘেউঘেউ করায়–মেয়েটা আমাকে খেয়াল করল, সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, কী সুন্দর পমিরেনিয়ান! দারুণ দেখতে।
নাও, নাও, শুরু করো তোমার কুকুর রচনা। কুইক।
মালিক পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ চকের মতো সাদা। দেখলাম, ওর ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোচ্ছে না। আর হাতের আঙুলগুলো অল্প-অল্প কাঁপছে।
বুঝলাম, মালিক ভয় পেয়েছে।
আমি চেঁচিয়ে মালিককে বললাম, তুমি ভুল করছ, মালিক। তুমি যা ভাবছ ও তা নয়। তোমার লাইফটাকে পালটে নেওয়ার এটা একটা সুযোগ।
আপনার কুকুরটা তো ভীষণ চেঁচাচ্ছে! একটু মজার সুরেই বলল মেয়েটা, কী নাম ওর?
মালিক সেকথার জবাব না দিয়ে আমার দিকে আঙুলের ইশারা করে বলল, জাম্প, পম, জাম্প!
মালিকের এই কথায় আমি থতমত খেয়ে গেলাম। লাফ দেব! কিন্তু কেন?
মালিককে সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করে বললাম, লাফ দেব কেন, মালিক? এই মেয়েটি তোমারই মতো রক্ত-মাংসের তৈরি–অন্য কিছু নয়। তুমি যা ভাবছ তা নয়।
মালিক শুনলে তো আমার কথা!
আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল মালিক। আঙুলের ইশারা করে মেয়েটিকে দেখিয়ে আমাকে শক্ত গলায় বলল, জাম্প আই সে! লাফ দে, হারামজাদা শিগগির!
সুতরাং কী আর করি! সামান্য কুকুর হয়ে কী করে মালিকের আদেশ অমান্য করি!
তাই দিলাম লাফ! একেবারে মেয়েটির গায়ে গিয়ে পড়লাম। ওর শরীরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম রাস্তায়।
আর সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েটি হাউমাউ করে একেবারে লাফিয়ে উঠল। কাঁদো কাঁদো গলায় পেঁচিয়ে মালিককে বলল, কী বাজে লোক আপনি। বিপদে পড়ে হেল্প চাইলাম আর আপনি কুকুর লেলিয়ে দিলেন! ছিটেফোঁটাও কি ভদ্রতা শেখেননি? দাঁড়ান, আপনার নামে আমি পুলিশে কমপ্লেন করব। আনকালচারড ব্রুট।
শেষ কথাটা মেয়েটি বোধহয় আমাদের দুজনকেই বলল। দেখলাম ওর চোখে জল এসে গেছে। শাড়িতে শালে আমার জল কাদা মাখা পায়ের নোংরা ছাপ। বারবার ও নিজের পোশাকের হাল দেখছে আর বলছে, দেখলেন, আমার শাড়ির কী অবস্থা করল শয়তান কুকুরটা! ইশ! শালটারও কী সর্বনাশ করল!
আমি মালিককে বললাম, তোমাকে বারবার বললাম, তাও তুমি শুনলে না। সেই কেলো করে ছাড়লে!
মালিক তখন মুখ নীচু করে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। সেই অবস্থায় ঘন-ঘন শ্বাস ফেলছে। আর মাথা নাড়ছে।
এদিকে মেয়েটির চেঁচামেচিতে এই শীতেও দেখি দূর থেকে দু-চারজন লোক এগিয়ে আসছে। ওরা যদি কাছে এসে পড়ে তা হলে পরিণাম নির্ঘাত গণধোলাই। আর আমার মালিকের যা খ্যাংরাকাঠি চেহারা–ওই পাবলিক পালিশ সইতে পারলে হয়।
সুতরাং মালিকের প্যান্ট কামড়ে ধরে হ্যাঁচকা টান মারলাম। বললাম, বাঁচতে চাও তো শিগগির পালিয়ে চলো।
মালিক আমার এই কথাটা বোধহয় পুরোপুরি বুঝতে পারল। কারণ, আর দেরি না করে ছুট লাগাল, সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমিও ছুটলাম।
ছুটতে ছুটতে একটা কথা ভেবে আমার হাসি পেল। ভূতের কাছ থেকে যত না জোরে আমরা ছুটে পালিয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি জোরে ছুটে পালাতে হচ্ছে মানুষের কাছ থেকে।
একেই বোধহয় বলে কপাল– কুকুরের কপাল।
ভোলাকে ভোলা যাবে না কিছুতেই
ভোলাকে কিছুতেই ভুলতে পারা যাবে না। তার মানে এমন নয় যে, আমি ওকে ভুলতে চেষ্টা করেছি। বরং এটাই আমি সাদাকালোয় জানাতে চাই, ওকে ভুলে যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। ও এমন সব কাণ্ড করেছিল যে, এই তিরিশ-বত্রিশ বছরেও ওর ছবিটা এতটুকু মলিন হয়ে যায়নি।
