ওর কাণ্ডকারখানা দেখে বাবা মাঝে-মাঝে আমাকে বলত, একটা ডোমেস্টিক কম্প্যানিয়ান রোবটের কাছ থেকে এত সার্ভিস পাব ভাবিনি।
আমি কোনও জবাব দিতাম না। তবে ভোলার সঙ্গে রোবট, সার্ভিস, এই শব্দগুলো জুড়ে কথা বলাটা আমার ভালো লাগত না।
একদিন আমরা তিনজনে ইভনিং শো-তে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম আমি, বাবা, আর ভোলা। ছবিটার নাম দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক। ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে আর নাচ-গান নিয়ে দারুণ জমাটি ছবি। হল থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎই শুনলাম ভোলা গুনগুন করে গান গাইছে : ডো আ ডিয়ার, আ ফিমেল ডিয়ার/রে আ রে অফ গোল্ডেন সান/ মি আ নেম আই কল মাইসেলফ…।
আমি জিগ্যেস করলাম, ভোলা, ছবি কেমন লাগল?
ভোলা বলল, দারুণ! যদিও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
বাবা হেসে বলল, যাক, ভোলা অন্তত সত্যি কথাটা বলেছে!
আমি বললাম, রোবটরা মিথ্যে কথা বলে না, বাবা।
ফেরার পথে হঠাৎই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তখনও আমরা একটা খালি ট্যাক্সি জোগাড় করতে পারিনি। ছাতা সঙ্গে না থাকায় ফুটপাথের ধার ঘেঁষে একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কোনওরকমে মাথা বাঁচাতে চেষ্টা করছি।
হঠাৎই একটা বিশাল অফিসবাড়ির আড়ালের এক অন্ধকার কোণ থেকে তিনটে ছায়া এগিয়ে এল আমাদের দিকে। মাথায় কঁকড়া চুল। পরনে টি-শার্ট আর চোঙা প্যান্ট।
খুব কাছাকাছি এসে একটা ছেলে বাবাকে লক্ষ্য করে বলল, দাদা, ফুলকি হবে, ফুলকি?
বাবা থতোমতো খেয়ে বলল, ফু-ফুলকি…মানে?
তখন পাশ থেকে তার এক সঙ্গী কড়া মেজাজে মন্তব্য করল, আরে ফুলকি মানে আগুন– সালা ন্যাকাষষ্ঠী! একটা সিগারেট কোথা থেকে বের করে ঠোঁটে রাখল সে।
এইবার বাকি দুজন বাবার দু-পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, মালকড়ি যা আছে ঝটপট দিয়ে দে।
তিননম্বর ছেলেটা একটা ক্ষুর বের করে বাবার গলার পাশটায় চেপে ধরল।
আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছিল। কিন্তু শত চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের করতে পারছিলাম না। তা ছাড়া, কাছাকাছি এমন কাউকে চোখেও পড়ল না যে আমাদের বিপদে এগিয়ে আসবে।
হঠাৎই ভোলা দিব্যি স্বাভাবিক গলায় আমায় বলল, ভয় পেয়ো না, ভাইটি। দেখছি কী করা যায়। তারপর ছেলেগুলোকে লক্ষ্য করে ঠান্ডা এবং শান্ত গলায় বলল, বাবাকে ছেড়ে দাও।
তা হলে তোমাদেরও আমি ছেড়ে দেব।
বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ছেলে তিনটে খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল।
একজন পেটে হাত চেপে হাসতেহাসতে খানিকটা কুঁজো হয়ে গেল। তারপর কোনওরকমে হাসির দমক কমিয়ে বলল, লে, চারফুটিয়া কী বলছে শোন। তারপর বাচ্চাদের আধো-আধো উচ্চারণে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল, ওলে বাবা! বিলাট মাছতান এচে গ্যাচে! পালা, পালা, ছিগিল পালা!
কথা বলতে বলতে ছেলেটা ভোলাকে লক্ষ্য করে লাথি চালিয়েছে। ভোলা কিন্তু নড়ল না– চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। লোহার সঙ্গে মানুষের পায়ের সংঘর্ষ হল। আর সঙ্গে-সঙ্গে বিকট চিৎকার করে ছেলেটা বসে পড়ল রাস্তায়। ডান পা-টা চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল, আর কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে লাগল।
ক্ষুর হাতে ছেলেটা ভোলার মুখ লক্ষ করে অস্ত্রটা চালাল। ভোলা বাঁ-হাতে ওর ডানহাতটা খপ করে ধরে ফেলল। এবং ডানহাতে একটা মামুলি থাপ্পড় বসিয়ে দিল ছেলেটার গালে।
থাপ্পড়ের শব্দ কিংবা ফলাফল কোনওটাই মামুলি হল না।
ছেলেটার মুণ্ডুটা প্রায় নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গেল। গাল ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। চোয়ালের হাড়ও সরে গেল বোধহয়। ও ছিটকে পড়ল রাস্তায়।
তিন নম্বর ছেলেটা ভীষণ বুদ্ধিমান। তাই ও চোখের পলকে বৃষ্টিভেজা রাস্তা ধরে ছুট লাগাল।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো ঘটনা আমাকে আর বাবাকে একরকম হতবুদ্ধি করে দিয়েছিল। আমরা যেন আবার সিনেমা দেখছিলামযার নায়ক চারফুট উচ্চতার একটি নিরীহ গেরস্থালি রোবট।
আমাদের মাথা কাজ করছিল না। বুঝতে পারছিলাম না, থানায় যাব, নাকি অকুস্থল থেকে সরে পড়ব।
সমস্যাটার সমাধান করে দিল ভোলা।
একটা চলন্ত ট্যাক্সিকে চট করে হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলে দুটোকে দেখিয়ে বলল, এইমাত্র চারটে গুন্ডা এই ছেলে দুটোকে মারধোর করে পালিয়ে গেল। এক্ষুনি হয়তো গণ্ডগোল শুরু হয়ে যাবে। আমাদের একটু হেল্প করুন–শিগগির এখান থেকে নিয়ে চলুন, ভালো বকশিশ দেব।
বাড়িতে ফিরে ধাতস্থ হতে আমাদের বেশ কিছুটা সময় লাগল। তারপর বাবা ভোলাকে বলল, অতটা বাড়াবাড়ি করা তোমার ঠিক হয়নি। যদি এরপর পুলিশের ঝামেলা হয়?
আমি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। ভোলা মারাত্মক বিপদে আমাদের বাঁচাল, আর বাবা বলছে বাড়াবাড়ি!
ভোলা গায়ের জামাটা ঠিকঠাক করতে করতে বলল, ঝামেলা কিছু হবে না, বাবা। দেখবে, ওই ছেলেগুলোর নিশ্চয়ই পুলিশের খাতায় নাম আছে।
বাবা যা-ই বলুক, আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল, ভোলার কাছে আমাদের ঋণ থেকে গেল। বাবাকে এসব কথা কিছু বলিনি। কারণ, বললেই বাবা হয়তো বলে বসবে, রোবটের কাছে আবার ঋণ কীসের! যতসব আজগুবি ভাবনা!
এর কয়েকমাস পর বাবা বাড়িতে একটা কম্পিউটার কিনে নিয়ে এল। তারপর থেকেই বাবা ওই যন্ত্রটা নিয়ে মশগুল হয়ে গেল। সময় পেলেই শুধু কম্পিউটারের কি-বোর্ড নিয়ে মেতে ওঠে। আর আমাকেও একটু-আধটু শিখিয়ে দেয়।
