তাই? ঘাড় বেঁকিয়ে সুন্দর করে তাকাল মেয়েটা। কপাল থেকে চুলের গুচ্ছ সরিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
নিমতলা ঘাটে আপনার কী দরকার?
মাঝে-মাঝে ওখানে যাই–মন ভালো করার জন্যে। অন্ধকারে, নির্জন জায়গায় একা-একা থাকতে আমার বেশ লাগে।
মাঝে-মাঝে ওখানে যান..অথচ আমাকে জিগ্যেস করলেন…। মালিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। চোখে ফুটল সন্দেহের ছায়া।
খিলখিল করে হাসল মেয়েটি। হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কী!
না, না, ভয় পাবেন না। আমার অ্যামনেজিয়া গোছের অসুখ আছে। হঠাৎ-হঠাৎ সব ভুলে যাই….আবার হঠাৎ-হঠাৎ সব মনে পড়ে যায়।
আমি চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করলাম, মিথ্যে কথা! এটা ওর ছল, মালিক। এখনও সময় আছে– ফিরে চলো।
মালিক আমাকে ধমক দিল ও চুপ কর! চুপ কর বলছি! স্টপ বার্কিং, পম।
জানেন, রাস্তা হঠাৎ ভুলে গেলে পর কাউকে জিগ্যেস করতেও ভয় লাগে। আজকালকার লোকগুলো যা গায়ে পড়া। হাসল রূপসি। তারপর গলা নামিয়ে বলল, অবশ্য আপনি সেরকম নন।
এ-কথায় মালিক তো আটখানা।
হঠাৎই একঝলক ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা ছুটে এল। মালিক শিউরে উঠল। হাতে-হাত ঘষে ম্যাগাজিনটা বুকের কাছে আঁকড়ে বলল, কী শীত! উঃজ্যাকেটটা পরে এলে হত। তারপর, এতক্ষণ পর, যেন এইমাত্র খেয়াল করেছে এমনভাবে বলল, আপনার শীত করছে না?
মেয়েটা হাসল। উড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল টেনে ধরে বলল, শীতে আমার কিছু হয় না। আমি শীত ভালোবাসি। আপনি?
আমিও–আমিও শীত ভালোবাসি। শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমার বোকা-হাঁদা মালিকটা বলল।
দূরে কয়েকটা দোকানের আলো দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার ধারে কতকগুলো বড়-বড় লরি চুপচাপ দাঁড়িয়ে। বাঁ-দিকে পুরোনো আমলের বিশাল মাপের সব গোডাউন। তার গা-ঘেঁষে কয়েকটা ঝুপড়ি–সেখানে কেরোসিনের আলো জ্বলছে।
আপনি কি রাতে বেড়াতে বেরোন? মালিক ওকে জিগ্যেস করল, আসলে জায়গাটা তো ভালো নয়–একেবারে কঁকা-ফাঁকা…।
একা-একা থাকার এটাই সমস্যা। তা ছাড়া বিকেল-বিকেল বেরোলে রাস্তায় লোকজন বড় বিরক্ত করে।
চলুন, তা হলে আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি…।
মালিকের হ্যাংলা-উৎসাহ কুকুরকেও হার মানাল।
কিন্তু দেখলাম, যা ভেবেছি তাই। মালিকের প্রস্তাবে মেয়েটা একেবারে আঁতকে উঠল, না, না, বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। কে কী বলবে তার ঠিক আছে!
ওর বাড়ি হল জলের তলায়, মালিক। ও বহু বছর ধরে সেখানে থেকে-থেকে পচে গলে শেষ হয়ে গেছে। ওর গা থেকে তুমি পচা গন্ধ পাচ্ছ না? অবশ্য কী করে পাবে! তোমার তো আর আমাদের মতো ঘ্রাণশক্তি নেই!
মেয়েটা আবার বলল, এই ঠান্ডায় আপনার সঙ্গে বসে এক কাপ চা কিংবা কফি খেলে বেশ হত। আপনি আমাকে হেল্প করলেন। মানে…অথচ…এদিকে সেরকম দোকান বা রেস্টুরেন্ট নেই…।
আমার বাড়িতে গেলে আমি কিন্তু আপনাকে কফি খাওয়াতে পারি। হেসে বলল মালিক, তা ছাড়া আমি ভালোই রান্না করতে পারি। যদি বলেন…।
তাকিয়ে দেখি মালিকের প্রস্তাবে মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠল। ও জিভ বুলিয়ে নিল ঠোঁটের ওপর। বলল, সত্যি, এটা তো ভেবে দেখিনি! চলুন, এই ঠান্ডায় কফি দারুণ জমবে! কত দূরে আপনার বাড়ি?
এই তো কাছেই। ননী ঘোষ লেন। শোভাবাজার ঘাট থেকে ডানদিকে হেঁটে সাত কি আট মিনিট।
চলুন, আপনার সঙ্গে হাঁটতে আমার ভালোই লাগবে।
সর্বনাশ করেছে! কী হবে এবার?
নিমতলা ঘাটে আপনি যাবেন না? মালিক জিগ্যেস করল।
নাঃ, আজ আর যাব না। সেখানে যাওয়ার চেয়ে আপনার কম্প্যানি অনেক বেটার, অনেক অ্যাট্রাকটিভ।
ব্যস! আমরা উলটো দিকে ঘুরলাম। হাঁটতে শুরু করলাম শোভাবাজার ঘাটের দিকে।
আমি তো চিন্তায়-চিন্তায় পাগল হয়ে গেলাম। কী করি এখন? কী করে এই পিশাচীর হাত থেকে বাঁচাই আমার হ্যাংলা মালিককে?
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, থামো, মালিক থামো! এই রক্তপিশাচকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যেয়ো না–তোমার সর্বনাশ হবে।
আপনার কুকুরটা খেপে গেছে। বড্ড ঘেউঘেউ করছে।
আমার চেন ধরে টান মারল মালিক। বলল, পম, স্টপ বার্কিং। তারপর মেয়েটার দিকে। ফিরে বলল, আপনার কোনও চিন্তা নেই। বাড়িতে ঢুকে পমকে সিঁড়ির নীচের ঘরে বন্ধ করে রাখব। তারপর শুধু আপনি, আমি, আর কফি। কথা বলতে বলতে মালিক চোখ দিয়ে মেয়েটাকে চেটে নিল।
নাঃ, আর চুপ করে থাকা যায় না। আমি এক হ্যাঁচকা টানে মালিকের হাত থেকে চেন ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর বিদ্যুঝলকের মতো মালিককে পাশ কাটিয়ে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লাম মেয়েটার ওপরে।
কিন্তু কী আশ্চর্য! হাওয়া, শুধু হাওয়া!
শাড়িটায় নাক ঠেকতেই বিশ্রী কটু গন্ধ পেলাম। বাতাসে দুলে উঠল শাড়িটা। আর কী ঠান্ডা, কী ঠান্ডা! যেন এভারেস্টের চুড়োয় নাক ঘষছি।
আমাদের অবাক করে শাড়িটায় আমার বডি জড়িয়ে গেল। আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায়। আর মেয়েটির পোশাক–শাড়ি, ব্লাউজ সবখসে পড়ল মাটিতে। তবে মেয়েটা কোথাও নেই– পুরোপুরি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
গঙ্গার দিক থেকে বাতাস ছুটে এল। কালো জল খলখল করে হেসে উঠল। আকাশে উড়ে যাওয়া একটা ধূসর পাচা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল হঠাৎই।
মালিক থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছিল। ম্যাগাজিনটা হাত থেকে খসে পড়ে গিয়েছিল। এবার মৃগী রুগির মতো হাত-পা ঠকঠক করে বসে পড়ল রাস্তায়। কঁদো-কঁদো স্বরে ডেকে উঠল, পম! পম! তুই আমাকে বাঁচালি!
