চমৎকার। নিজের বেলায় দোষ নেই। যত দোষ আমার বেলায়। অথচ এটাই আমাদের জাতীয় ধর্ম! এটাই আমাদের লাইফ স্টাইল।
তো একদিন সন্ধেবেলা আমরা দুজনে গঙ্গার ধারটায় বেড়াচ্ছি। মালিকের এক হাতে একটা রঙিন ম্যাগাজিন–একটু আগেই একটা বুকস্টল থেকে কিনেছে। আর অন্য হাতে আমার গলায় বাঁধার শেকলটা। আমার গলায় বেল্ট আছে বটে, কিন্তু শেকল ছাড়া পেয়ে আমি এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করতে করতে মালিকের সঙ্গে-সঙ্গে এগোচ্ছি। বাঁশি বাজিয়ে চক্ররেলের লাইনে একটা ট্রেন চলে গেল। রেল লাইনের ওপাশ থেকে কী সুন্দর জঞ্জালের গন্ধ পাচ্ছি। আমি আনচান করতে লাগলাম। গাওয়া ঘিয়ে ভাজা গরম লুচির গন্ধে মালিককে এরকম আনচান করতে দেখেছি।
রেল লাইনের দিকটা যেমন নোংরা তেমন অন্ধকার। আর শীতকাল বলে পথে লোকজনও বেশি নেই। গঙ্গার দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। গঙ্গার গভীর জল টলটল করছে। তাতে ভাঙা ভাঙা চাঁদের ছায়া। দূরের জল এমনিতেই ভালো করে দেখা যায় না। তার ওপরে এখন আবার দুধের সরের মতো কুয়াশা।
মালিক উদাস হয়ে রেলিং-এ ভর দিয়ে গঙ্গার দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিল। আর মাঝে মাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। হঠাৎই বলল, জীবনটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল রে, পম।
আমি তখন এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছিলাম–কোনও লেডিজ কুকুর খুঁজছিলাম। নাঃ, একটাও চোখে পড়ছে না। তাই হতাশ হয়ে বললাম, হ্যাঁ, মালিক, জীবনটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল।
মালিক পম, কাম, কাম– বলে আমাকে কাছে ডাকল। তারপর নীচু হয়ে আমার মাথা চাপড়ে দিল : তোর ডাক শুনেই বুঝতে পারছি তুই আমার মনের কথাটা ধরতে পেরেছিস। তোর…।
হঠাৎই মালিক যেন চমকে উঠল। চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাকাল নির্জন পথের দিকে।
আমি চোখ বুজে আদর খাচ্ছিলাম। মালিকের আদর বন্ধ হতেই চোখ খুলে তাকিয়েছি। তারপর মালিকের নজর ফলো করে দেখি…ও, এই ব্যাপার!
পারফিউমের গন্ধটা আগেই পেয়েছিলাম, এবার চুড়ির রিনরিন শুনতে পেলাম।
হালকা রঙের শাড়ি পরে ছিপছিপে ফরসা বিউটিফুল একজন লেডিজ পথ ধরে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। আশ্চর্য, এই শীতেও ওর গায়ে সোয়েটার বা শাল-টাল কিছু নেই।
ব্যস! মালিক আমাকে চাপা গলায় বলল, পম, কাছে-কাছে থাকিস। যার মানে হল, আবার সেই কুকুর রচনা।
একটু আগেই যে-লোকটা উদাস কবি কবি ভাব নিয়ে মনমরা ছিল, সে এখন একপায়ে খাড়া তেজি ঘোড়া।
মেয়েটি আমাদের কাছে এগিয়ে আসতেই আমি অন্যরকম একটা গন্ধ পেলাম।
আরে, এ কে? এ কী? এ তো মানুষ নয়! ওইজন্যেই গায়ে শীতের পোশাক নেই!
নিমতলা ঘাটটা কোনদিকে একটু বলতে পারবেন?
কী সুন্দর দেখতে! কী মিষ্টি গলার স্বর! ল্যাম্পপোস্টের ঘষা আলোয় মেয়েটিকে সুপারন্যাচারাল মনে হচ্ছে।
আমি গন্ধ পেয়েই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই চিৎকার করে বললাম, মালিক, চলে এসো। ওর বডির ভেতরে অসংখ্য সাপ, কেন্নো আর কাঁকড়াবিছে কিলবিল করছে। ওর বুকের ভেতরটা বরফ দিয়ে ঠাসা। গঙ্গার জলের তলা থেকে এই ভয়ংকর প্রেতিনী উঠে এসেছে। ও তোমার মতো একজন টগবগে শিকার খুঁজছে–যার রক্ত দিয়ে তেষ্টা মেটাবে। চলে এসো, মালিক–চলে এসো।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! মালিক গদগদ হয়ে মেয়েটিকে বলল, নিমতলা ঘাট? ওই তো সামনে…পাঁচমিনিট হাঁটলেই…। দেখেছেন, পম আপনাকে হ্যালো বলছে। ও আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছে।
হুঁ! নিজে পছন্দ করে আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছে!
না, না! প্রায় আঁতকে উঠে সরে গেল মেয়েটি? ওকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখুন। কুকুর আমি খুব ভয় পাই।
এই তো, চেন লাগিয়ে দিচ্ছি– চাকরের মতো মেয়েটির কথা শুনল মালিক।
আমি মেয়েটির চোখে তাকালাম। ওর চোখের তারায় নীল আলো ধকধক করে জ্বলছে। ও বুঝতে পেরেছে, আমি ওকে চিনে ফেলেছি।
মালিক মেয়েটিকে বলল, এই ঠান্ডার মধ্যে এই নির্জন রাস্তায় আপনি একা-একা…মানে…।
হাসল মেয়েটি। হাসির সঙ্গে-সঙ্গে ওর ফঁপা শরীর থেকে ঠান্ডা জমাট বাতাসের হলকা বেরিয়ে এল। বলল, আমি তো একাই–দোকা আর কোথায় পাব!
জানেন, আমিও ভীষণ একা। মালিক কাতর গলায় বলল, কী সাংঘাতিক একা আপনি ভাবতে পারবেন না।
মালিক, ওর কথাটা ভালো করে বোঝো। ওরা সবসময় একা-একা ঘোরে মরণফঁদ পাতে–তোমাদের মতো বোকা হাঁদা ল্যাবাকান্তদের জন্যে। মালিক, প্লিজ, বাড়ি চলো।
কিন্তু মালিক আমার কথা শুনবে কি! হাঁ করে মেয়েটাকে গিলছে।
বাব্বা! আপনার কুকুরটা কী ঘেউঘেউ করছে! আপনি ওকে আড়াল করে রাখুন।
ব্যস, অমনি আমাদের মাঝে পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে গেল। তারপর মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে নিমতলা ঘাটের দিকে এগোল।
মালিকের দুপাশে আমরা দুজন। তবুও চলার সময় এগিয়ে-পিছিয়ে আমি মেয়েটাকে দেখছিলাম। ঠিকই বলেছে মেয়েটা। নিমতলা ঘাটই ওর আসল ঠিকানা। ওর শিরায়-শিরায় রক্তের ছিটেফোঁটাও নেই–আছে ঠান্ডা শুকনো বাতাস। আর হাড়ের বদলে রয়েছে গঙ্গার পলিমাটি, শ্যাওলা আর মরা গাছের ডালপালা।
আমার নাকে পচা শ্যাওলার গন্ধ আসছিল। তার সঙ্গে পারফিউমের গন্ধ। হঠাৎই বুঝলাম, পারফিউমের গন্ধটা অগুরু সেন্টের। ওঃ, মালিক যে কেন বুঝতে পারছে না মেয়েটা আর বেঁচে নেই!
জানেন, এই কুকুরটা আমার একমাত্র সঙ্গী। ফাঁকা বাড়িতে আমি একা-একা থাকি। বুকটা একেবারে খাঁ-খাঁ করে।
