প্রিয়নাথ কখনও ভয়ের এত কাছাকাছি আসেননি। তার শরীরের ভেতরটা কেমন করছিল। মাথা টলে যেতে চাইছিল বারবার।
কোরাস আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। সেই সঙ্গে গাঢ় নীল আলোর আভা, আর তার মাঝে উজ্জ্বল লাল বিন্দুর ঝাঁক যেন অলৌকিক এক সম্মোহন।
বহুদূর থেকে ভেসে এল নেহার গলা : গাঁয়ে মড়ক লেগেছিল, বাবুজি। তাতে তিনকাহানির সবাই খতম হয়ে গেল। সব কাহানি খতম হয়ে গেল। সে বহত সাল পহেলে কি বাত। তারপর থেকে আমরা…ওই গাছেই একজোট হয়ে থাকি। রোজ রাতে এসে এই গাছটা আমরা তৈরি করি। দিনের বেলা আমাদের কেউ দেখতে পায় না। আর, রাতে আমরা ইচ্ছেমতন কাউকে দেখা দিই, কাউকে দিই না। মেহমানদের সেবা করতে আমরা ভালোবাসি। তাই পরদেশিবাবুদের মদদ করি, দেখা দিই। আমরা যে রাতে এখানে এসে এমন করে থাকি সেকথা কাউকে বোলো না, বাবুজি। কিসিকো নহি বাতানা…।
সমবেত কণ্ঠস্বর নেহার কথার সুর মিলিয়ে ফিশফিশে গলায় বলে উঠল, কিসিকো নহি বাতানা…কিসিকো নহি বাতানা…।
সে কথায় অলৌকিক শব্দের ঝড় বয়ে গেল যেন।
আমি এবার ওখানে যাই, বাবুজি? আমার মাজি, পিতাজি, বড়ে ভাইয়া, সবাই ওখানে ডালপালা হয়ে আছে। আমি যাই? ফির কভি মিলেঙ্গে…ফির কভি মিলেঙ্গে…।
ফিশফিশে কোরাস আকাশ-বাতাস মাতিয়ে বলে উঠল, ফির কভি মিলেঙ্গে..ফির কভি মিলেঙ্গে…।
প্রিয়নাথ আতঙ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর দমবন্ধ হয়ে যেতে চাইছিল, কোনও ইন্দ্রিয়ই যেন আর কাজ করছিল না। সেই অবস্থায় তিনি যে কেমন করে ছুটতে শুরু করলেন কে জানে!
দিগভ্রান্ত অবস্থায় পাগলের মতো ছুটছিলেন। কখনও হোঁচট খেয়ে পড়ছিলেন। কখনও ধাক্কা খাচ্ছিলেন গাছের গুঁড়িতে। চশমা ছিটকে পড়ল কোথায়। হাতঘড়িটাও বোধহয় ভেঙে গেল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন সদরিয়ায়।
সমস্তিপুর থেকে ট্রেনে কলকাতায় ফেরার সময় প্রিয়নাথ ভাবছিলেন, এবার সুনীতনারায়ণকে সারিয়ে তোলার কাজ অনেক সহজ হবে।
ভূতের গন্ধ
প্রথমেই বলে রাখি, আমি কুকুর। আমার জীবন হল ঘেউঘেউ জীবন। মানে যতই কথা বলি না কেন সবই আমার মালিকের কাছে ঘেউঘেউ। কিছুতেই আমার কথা লোকটা বুঝতে চায়, শুনতেও চায় না। অথচ আমি মালিকের সব কথা শুনি বসতে বললে বসি, হাঁটতে বললে হাঁটি, লাফাতে বললে লাফাই। এমনকী ভোরবেলা মালিকের দোতলার বারান্দায় যখন ধপ করে খবরের কাগজ এসে পড়ে, তখন ছুট্টে গিয়ে সেটা মুখে করে নিয়ে এসে মালিককে দিই।
মালিক আমাকে আদর করে, যত্ন করে, রোজ ভালো-ভালো খেতেও দেয়। এসব না করে উপায় কী! মালিকের যে আর কেউ নেই! শুনেছি মালকিন একজন ছিল। সে কী একটা অসুখে বছর পাছ-ছয় আগে মারা গেছে। তখনও আমি এ-বাড়িতে আসিনি।
আমার মালিক একটু মেয়ে-ঘেঁষা। সাধু বাংলায় বলতে গেলে নারীজাতিকে শ্রদ্ধা করে। তবে শ্রদ্ধার পরিমাণটা বড্ড বেশি। ওর সঙ্গে রাস্তায় বেরোলেই এই শ্রদ্ধার প্রবলেমটা আমাকে ফেস করতে হয়।
কেন ফেস করতে হয় সেটা বলি।
ভোরবেলা গঙ্গার ধারে হাঁটতে কার না ভালো লাগে! আবার সন্ধেবেলাও সেই একই রুটিন। সেই বেড়ানোর সময় কোনও সুন্দরী লেডিজ দেখতে পেলেই হল! মালিক আমাকে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যাবে এবং আমাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে সেই মেয়েটিকে বলবে, দেখেছেন, আপনাকে দেখে পম কেমন লেজ নাড়ছে। আসলে এ হল একেবারে খাঁটি জাতের পমিরেনিয়ান। তাই ওর নাম রেখেছি পম। দেখুন, লোমগুলো কী সুন্দর–সফট আর ফ্লাফি। ওর সেন্স এত…।
এই চলল মালিকের কুকুর রচনা। কী যে বোরিং!
আমি চেঁচিয়ে বললাম, তুমি এত মেয়ে হ্যাংলা কেন? হ্যাংলামি ছেড়ে কাউকে একটা বিয়ে করে ফেললেই পারো!
আঃ, এত চেঁচানোর কী আছে, পম! আমাকে ধমক দিয়ে কোল থেকে নামিয়ে দিল মালিক। তারপর মেয়েটিকে বলল, আপনাকে ঘেউঘেউ করে হ্যালো বলছে। ওর যা বুদ্ধি না!
আমি আবার বললাম, একটু মানুষের মতো হও না! একটা বউ নিয়ে সুখে থাকো। আমাদের ডগ সোসাইটিতে বিয়ে করার সিস্টেম নেই–এর ওর কাছে গিয়ে ছোঁকছোঁক করার সিস্টেম। তোমার যদি সেটাই পছন্দ তো তাই করো। তার সঙ্গে আমাদের অন্য স্বভাবগুলোও রপ্ত করে নাও। আবর্জনা দেখলেই নাক ঠেকাও, অপোজিট সেক্স দেখলেই জিভ বের করে লালসার হাঁপানি শুরু করো, আর ল্যাম্পপোস্ট দেখলেই দৌড়ে গিয়ে এক ঠ্যাং তুলে কাত হয়ে ছোট বাইরে সেরে নাও।
কিন্তু আমার কথা শুনলে তো! মুগ্ধ ভেড়ার চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মালিক তখন বলছে, আপনাকে পমের দারুণ পছন্দ হয়েছে। আপনি কি রোজ এই সময়ে বেড়াতে আসেন?
তো এই চলতে থাকে। শেষে মেয়েটা যখন আচ্ছা, আসি বলে পট করে চলে যায় তখন মালিকের বুক ঠেলে বড় একটা নিশ্বাস বেরিয়ে আসে।
দেখলি পম, চলে গেল!
আমি কোনও জবাব দিলাম না। কারণ, ততক্ষণে গঙ্গার পাড়ের রেলিং-এর পাশে বাদামি রঙের একজন অপোজিট সেক্সকে আমি দেখতে পেয়েছি। লেজটা রিং-এর মতো বাঁকানো। কী সুন্দর নাক, মুখ, চোখ! আর বডিটা দারুণ সেক্সি।
আমি জিভ বের করে সেদিকে এগোতেই মালিক খেপে গিয়ে হাঁক পাড়ল, কী হচ্ছে, পম! কুত্তা কি আর সাধে বলে! ব্যাটা ভাদুরে কুকুর! মেয়েছেলে দেখলেই হল! আয়, এদিকে আয়…।
