খামের ভেতর থেকে একটা ফটো টেনে বের করলেন প্রিয়নাথ।
ফটোর সবটাই ঘোর কালো এবং নীল মেশানো একটা অন্ধকার। তারই মাঝে সরষের মাপের অনেকগুলো লাল ফুটকি এলোমেলো ভাবে ছড়ানো।
এই সাদামাঠা ফটোগ্রাফের কী মানে থাকতে পারে প্রিয়নাথ ভেবে পেলেন না।
বিনোদনারায়ণ বললেন, এই ছবিটার মধ্যে যে কী আছে কে জানে! এটা দেখলেই সুনীত ভীষণ ভয় পেয়ে আপসেট হয়ে যায়। ও কোথাও গিয়ে কোনও কিছুর নটা ছবি তুলেছিল। তার মধ্যে আটটা ব্ল্যাঙ্ক, আর ন নম্বরটা এই..।
অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ফটোটা দেখার পর প্রিয়নাথ সুনীতকে জিগ্যেস করলেন, এসব ছবি তুমি কোথায় গিয়ে তুলেছিলে?
সুনীতের বোধহয় ঘুম পাচ্ছিল। ও ঝিম ধরা চোখে প্রিয়নাথকে জরিপ করছিল। বোধহয় দেখতে চাইছিল ফটোটা দেখার পর প্রিয়নাথের কীরকম প্রতিক্রিয়া হয়। সেরকম কোনও প্রতিক্রিয়া হল না দেখে একটু যেন হতাশই হল।
প্রিয়নাথের প্রশ্নে ও অস্পষ্ট গলায় বলল, সদরিয়া…নেহা…।
প্রিয়নাথ একটা সিগারেট ধরালেন। অন্যমনস্কভাবে কিছুক্ষণ সিগারেটে টান দিয়ে গেলেন।
বিনোদনারায়ণ চুপচাপ খাটের কোণে বসে পড়লেন, প্রিয়নাথকে লক্ষ করতে লাগলেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর প্রিয়নাথ মুখ খুললেন। গম্ভীর গলায় বললেন, সুনীত, তুমি বোধহয় বাঁচতে চাও না। নইলে সব কথা আমাকে অন্তত খুলে বলতে। আমি কথা দিচ্ছি–কেউ তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।
সুনীত করুণ গলায় বলল, ওরা কাউকে বলতে বারণ করেছে। কাউকে বলা যাবে না। কাউকে না। কেউ যদি নিজে দেখে আসে…।
আমি যাব! জোরালো গলায় বললেন প্রিয়নাথ, আমি নিজে গিয়ে দেখে আসব। ওদের কাউকে আমি ভয় পাই না।
আমি ভয় পাই…।
তুমি বলো কী করে সেখানে যেতে হয়।
জানি না। ঘুম-জড়ানো গলায় বলল সুনীত, সদরিয়া…নেহা…।
প্রিয়নাথ হাতের ফটোটা সুনীতের চোখের সামনে মেলে ধরলেন : বলো, কী আছে এই ছবিতে? বলো!
চোখের পলকে সুনীতের মুখ আতঙ্কে ভেঙেচুরে গেল। ও বিশাল হাঁ করে ঘণ্টাদেড়েক আগের সেই হিমেল চিৎকার শুরু করল।
প্রিয়নাথদের কানে তালা লেগে গেল। ঘরের জানলার শার্সি ঝনঝন করে কাঁপতে লাগল। এক ভয়ংকর অনুনাদ ঘরের আবহাওয়াকে পাগল করে দিল।
বিনোদনারায়ণ লাফিয়ে উঠে ছোট ভাইকে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন। ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।
প্রিয়নাথ টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু তার তীব্র চোখ সারাক্ষণ সুনীতকে লক্ষ করছিল।
আয়ামাসি ভেজানো দরজা ঠেলে তাড়াহুড়ো করে ঘরে এসে ঢুকলেন। তাঁর মুখে-চোখে উবেগ।
সুনীত হাঁফাচ্ছিল। ওর চোখ আধবোজা মতন হয়ে গেছে। বিনোদনারায়ণ ওকে ধীরে-ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। মাসিকে লক্ষ করে বললেন, মাসি, আপনি ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। আমরা যাচ্ছি।
প্রিয়নাথ আর বিনোদনারায়ণ সুনীতের ঘর ছেড়ে অলিন্দে বেরিয়ে এলেন। উজ্জ্বল আলো থেকে স্তিমিত আলোয় আসায় প্রিয়নাথের দেখতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল। তিনি বিনোদনারায়ণকে। বললেন, ফটোগ্রাফটা আমার কাছে থাক। কাল সকালে আমি সুনীতের সঙ্গে কথা বলব। আপনার কোনও আপত্তি নেই তো?
আপত্তি! মলিন আলোয় বিনোদনারায়ণের হাসিটা কেমন যেন দেখাল। নরম গলায় তিনি বললেন, সুনীতকে সুস্থ করে তোলার জন্যে কোনও কিছুতেই আমার আপত্তি নেই।
ওঁরা সিঁড়ি ঘুরে দোতলায় নেমে এসেছিলেন। তখনই কানে এল জড়ানো গলায় গান ও .কারণ সেবায় বারণ করো, জানতে পারি কারণটা কী…?
প্রমোদ। চাপা গলায় বললেন বিনোদবাবু, এসব নাকি ওর তন্ত্র সাধনার অঙ্গ। হুঁ!
প্রিয়নাথ কোনও কথা বললেন না।
রাত অনেক হল। চলুন, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নেওয়া যাক।
প্রিয়নাথকে একতলার খাওয়ার ঘরের দিকে নিয়ে চললেন বিনোদনারায়ণ।
জাফরির ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছিল। সেদিকে তাকিয়ে প্রিয়নাথ বুঝতে পারলেন, বাইরে অন্ধকার আর শীতের রেষারেষি শুরু হয়ে গেছে।
.
টিনের বাক্স লাগানো সাইকেল-ভ্যান নিয়ে যারা পাঁউরুটি আর বিস্কুট দোকানে-দোকানে জোগান দেয় তাদের কথা মনে পড়ল প্রিয়নাথের। পাঁউরুটি আর বিস্কুটের বদলে যদি বেশ কিছু কাচের মার্বেল সেই বাক্সে ভরে ভ্যানটাকে সদ্য-ধান কাটা কোনও চাষ-জমির ওপর দিয়ে চালানো হয়, তা হলে যেরকম ঝাঁকুনি ও শব্দ হবে তার সঙ্গে এই বাসটার চলার দারুণ মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন তিনি।
সমস্তিপুরে নেমে সরু লাইনের ট্রেনে চড়ে পাঁচ ঘণ্টা পথ চলার পর তিনি নেমেছিলেন কানিতাল স্টেশনে। সেখান থেকে বাস ধরেছেন–তবে বাসটাকে দোমড়ানো-তোবড়ানো ক্যানেস্তারা বলাই ভালো। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ছুটে চলা বাসের শব্দ আর ঝাঁকুনি প্রিয়নাথকে প্রায় কাহিল করে দিচ্ছিল। যদিও বাসের নাম উড়ান খটোলা।
আশার কথা একটাই। এই বাস তাকে সদরিয়া নিয়ে যাবে। তারপর…সেখানে নেমে..খুঁজে বের করতে হবে নেহাকে।
জানলার বাইরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এসে গেছে। স্তিমিত রোদে ছুটে চলা গম-ভুট্টা জওয়ারের খেত আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। সামান্য খোলা কাচের জানলার ফাঁক দিয়ে ছুটে আসা বাতাস ক্রমে আরও ঠান্ডা হচ্ছিল। প্রিয়নাথ জ্যাকেটের চেন গলা পর্যন্ত টেনে দিলেন, মাফলারটাকে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলেন।
ভিড়ে ঠাসা বাসের ভেতরে অনেক যাত্রীই বিড়ির নেশায় ব্যস্ত। বোধহয় নো স্মোকিং কথার নো-টা বাসের দেওয়াল থেকে মুছে গেছে বলে।
