সুনীতের চোখজোড়া প্রিয়নাথ দেখতে পেলেন না কারণ, সাদা কাপড়ের পটি দিয়ে ওর চোখ ঢাকা।
প্রিয়নাথ বেশ অবাক হয়ে বিনোদনারায়ণের দিকে তাকালেন। বিনোদনারায়ণ ইশারায় ওঁকে অপেক্ষা করতে বললেন।
সুনীতের খাটের কাছে টুলে একজন বয়স্কা মহিলা বসে ছিলেন। রোগা ময়লা চেহারা, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, চোখে চশমা, পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি। দেখে আয়া বলে মনে হয়।
বিনোদনারায়ণ তাঁকে বললেন, মাসি, আপনি একটু নীচে গিয়ে বসুন। ডাক্তারবাবু কলকাতা থেকে এসেছেন–ছোড়দাকে দেখবেন।
ভদ্রমহিলা উঠে চলে যাচ্ছিলেন, বিনোদনারায়ণ জিগ্যেস করলেন, ওকে ঘুমের ওষুধটা খাইয়ে দিয়েছেন?
ছোট্ট করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে মহিলা ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই প্রিয়নাথ জিগ্যেস করলেন, সুনীতের চোখ বাঁধা কেন?
উত্তর দিল সুনীত, অন্ধকারে ঘুমোতে আমার ভয় করে। তাই ঘরের আলো জ্বেলে রেখে চোখ বেঁধে ঘুমোতে চেষ্টা করি।
চোখ ফিরিয়ে সুনীতের দিকে তাকিয়েছিলেন প্রিয়নাথ। ও গায়ের লেপ সরিয়ে বিছানায় উঠে বসেছে। বাঁ-হাতে টান মেরে সরিয়ে দিয়েছে চোখের পটি।
ওর নিষ্পাপ সুন্দর চোখজোড়া প্রিয়নাথকে মুগ্ধ করল।
বিনোদনারায়ণ ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। তারপর ছোট ভাইকে লক্ষ করে বললেন, লেপটা গায়ে দে–ঠান্ডা লেগে যাবে।
বসা অবস্থাতেই সুনীত লেপটা গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর কৌতূহলী গলায় ভূতনাথকে প্রশ্ন করল, আপনি কীসের ডাক্তারবডির, না মাইন্ডের?
ওর প্রশ্নের ধরনে প্রিয়নাথ বেশ মজা পেলেন। বিনোদনারায়ণ একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটায় না বসে আয়া-মাসির ছেড়ে যাওয়া টুলটায় গিয়ে বসলেন প্রিয়নাথ। তারপর চোখের চশমাটা সামান্য নেড়েচেড়ে মজার সুরে পালটা প্রশ্ন করলেন, তোমার অসুখটা কীসের বডির, না মাইন্ডের? তুমি করে বললাম–কিছু মাইন্ড কোরো না।
বিনোদনারায়ণ সুনীতের পায়ের দিকটায় খাটের এক কোণে বসে পড়লেন। বললেন, সুনীত, ইনি হলেন প্রিয়নাথ জোয়ারদার। অনেক রিকোয়েস্ট করে কলকাতা থেকে ওঁকে ধরে এনেছি। আমাদের বাড়িতে কদিন থাকবেন…তোকে হেল্প করার চেষ্টা করবেন। তোর সব কথা তুই ওঁকে খুলে বলতে পারিস।
সুনীত বারদুয়েক কাশল। লেপটা আরও ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল। তারপর মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।
বিনোদনারায়ণের সঙ্গে প্রিয়নাথের চোখাচোখি হল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রিয়নাথ আগের প্রশ্নটাই আবার করলেন? তোমার অসুখটা কীসের–বডির, না মাইন্ডের?
আচমকা মুখ তুলে তাকাল সুনীত। বলল, বডিরও না, মাইন্ডেরও না। অন্য কিছু…।
বিনোদনারায়ণকে অবাক করে দিয়ে সিরিয়াস গলায় ভূতনাথ বললেন, আমি সেই অন্য কিছুর ডাক্তার।
পলকে ঘরের আবহাওয়া যেন পালটে গেল। বিনোদনারায়ণ উশখুশ করতে লাগলেন। সুনীত কেমন চোরাচাউনিতে ভূতনাথকে দেখতে লাগল।
প্রিয়নাথ অফিসের ওপরওয়ালার সুরে বললেন, শোনো, সুনীত,–তোমার কী হয়েছে আমি বলছি। তুমি ভীষণ ভয় পেয়েছ। কেমন করে তা জানি না। তবে সেই ভয় তোমাকে ধীরে-ধীরে শেষ করে দিচ্ছে। তুমি যদি আমাকে সব খুলে বলল, তা হলে আমি তোমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করব। তোমার জন্যে দুশ্চিন্তা করে করে তোমার বড়দা-মেজদাও তো শেষ হয়ে যাচ্ছেন।
সুনীত হঠাৎ কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, কী করে বলব! সে কথা তো কাউকে বলা বারণ। কাউকে বলামাত্রই সর্বনাশ নেমে আসবে। একটু থেমে তারপর ও .তবে যদি কেউ নিজে গিয়ে দেখে আসে তা হলে আলাদা কথা…।
প্রিয়নাথ বিনোদনারায়ণের দিকে তাকালেন। বিনোদনারায়ণ ইতস্তত করে বললেন, সুনীতের ফটোগ্রাফির শখ আছে। মাঝে-মাঝেই ও ফটো তোলার ঝেকে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ত। মাসদুয়েক আগে ও সমস্তিপুরের দিকে গিয়েছিল। সঙ্গে ওর এক বন্ধু–পরেশ ছিল। কিন্তু রওনা হওয়ার পাঁচদিন পর পরেশ বাড়ি ফিরে আসে। কারণ, বাড়িতে এস. টি. ডি করে জানতে পেরেছিল ওর বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সুনীত ফিরে আসে তার ছদিন পরে। তারপর থেকেই ওর এই অসুখ। আমি ওকে বহুবার জিগ্যেস করেছি, কিন্তু ও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেনি–অথবা, বলতে চায়নি। শুধু নেহা আর সদরিয়া–এই দুটো শব্দ ওর ঘুম থেকে বারবার শুনতে পেয়েছি তার বেশি কিছু নয়।
বিনোদবাবু থামলেন।
সুনীত তখনও মাথা নীচু করে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল দেখে বিনোদনারায়ণ উঠে ছোট ভাইয়ের কাছে গেলেন। পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করতে চাইলেন।
প্রিয়নাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই সুনীত মুখ তুলে তাকাল বড়দার দিকে। করুণ গলায় বলল, সেই ফটোটার কথা বললে না!
ওহ-হ্যাঁ। ওর তুলে আনা দুরিল ফটোগ্রাফের মধ্যে আটটি ছবি ব্ল্যাঙ্ক। মানে, ডেভেলাপ করে কিছু পাওয়া যায়নি। তবে একটা ফটো উঠেছে ভারি অদ্ভুত। সেটা আপনাকে দেখাচ্ছি…। বলে বিনোদনারায়ণ ঘরের একটা তাকের দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেদিকে তাকালেন প্রিয়নাথ।
সুনীতের ঘরটা বেশ আধুনিক ধাঁচে শৌখিনভাবে সাজানো। দেওয়ালে সুন্দর তাক তৈরি করে টেপ রেকর্ডার, ক্যামেরা, বই সুচারুভাবে রাখা। দুটো বইয়ের ফাঁক থেকে একটা খাম বের করে নিলেন বিনোদনারায়ণ। তারপর প্রিয়নাথের কাছে এগিয়ে এসে খামটা প্রিয়নাথের হাতে দিলেন।
