খানিক ইতস্তত করে অস্বস্তি কাটিয়ে প্রিয়নাথ একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর সুনীতনারায়ণের সমস্যার দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলেন।
হঠাৎই তার মাথার ভেতরে সুনীত হাড় কাঁপানো ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল।
আর প্রিয়নাথের সাতদিন আগের কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল বসিরহাটের কথা। ঘোরালো প্যাঁচালো অলিন্দ আর সিঁড়িতে জট পাকানো প্রকাণ্ড বাড়িটার কথা।
সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর প্রিয়নাথের চোখে ঘুম আসেনি।
দোতলায় একটা ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। বিছানায় বসে নোটবই আর পেন নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নানান মন্তব্য লিখেছেন প্রিয়নাথ। সুনীতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, বিনোদনারায়ণের কাছ থেকে শোনা কিছু জরুরি কথা, আর নিজের মতামত। সেইসঙ্গে লিখে নিয়েছেন, এরপর কী কী কাজ করতে হবে।
লেখা-টেখার কাজ শেষ হলে পর প্রিয়নাথ ঘর অন্ধকার করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। ঘরের সব জানলা-দরজা বন্ধ করে শুলে তার কেমন যেন দম আটকে আসে। তাই পায়ের দিকের একটা জানলার পাল্লা অর্ধেকটা খুলে রেখেছিলেন। সেটা নিশ্চয়ই পুব দিক কারণ, চাঁদের একটা টুকরো দেখা যাচ্ছিল।
বহু চেষ্টা করেও ঘুম আসছিল না। বিছানায় উশখুশ করছিলেন। হঠাৎই জড়ানো গলায় গানের কলি শুনতে পেলেন নৃমুণ্ডমালিনী তারা / মুণ্ডমালা কোথায় পেলি..।
প্রমোদনারায়ণ। দোতলায় বাসিন্দা–প্রিয়নাথের প্রতিবেশী।
রাতের খাওয়ার সময় প্রমোদনারায়ণের দেখা পায়নি প্রিয়নাথ। এখন ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলে নিলে কেমন হয়!
বাইরে বেরিয়ে দেখলেন চওড়া বারান্দার শেষ প্রান্তে, খানিকটা চাতাল মতো জায়গায়, একজন ছায়া-মানুষ বসে আছে। তার শরীর অন্ধকার আর চাঁদের আলোয় মাখামাখি।
পায়ে-পায়ে কাছে এগিয়ে গেলেন প্রিয়নাথ। আলতো করে ডাকলেন, প্রমোদবাবু।
ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন প্রমোদনারায়ণ।
একমুখ দাড়ি, ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল, কপালে লাল তিলক চাঁদের আলোয় কালো দেখাচ্ছে। আর গভীর চোখদুটো নিশাচর প্রাণীর মতো অন্তর্ভেদী, উজ্জ্বল।
ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরদিকে তাকালেন প্রমোদনারায়ণ : ও, ভূতনাথবাবু! আসুন…বসুন। মায়ের চরণ ধোওয়া চাঁদের আলো…এর কোনও জবাব নেই।
চাতালে সতরঞ্জি পাতা ছিল। ভূতনাথ তার ওপরে বসে পড়লেন। খোলা জায়গায় বেশ শীত করছিল। গায়ের শাল আরও ঘন করে জড়িয়ে নিলেন।
অন্ধকারে বেশ কিছু গাছের মাথা আর দু-একটা বাড়ি চোখে পড়ছে। একটা প্যাচা নিঃশব্দে উড়ে গেল। কয়েকটা জোনাকি আলোর ফুটকি জ্বেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। প্রিয়নাথের মনে পড়ে গেল সুনীতের ফটোটার কথা।
শীতের বাতাস যেমন-তেমন বইছিল। প্রিয়নাথের নাকে মদের গন্ধ ভেসে আসছিল।
শুনেছি, আপনি সুনুকে সারিয়ে তোলার জন্যে কলকাতা থেকে এসেছেন। প্রমোদনারায়ণ কথা বললেন, আমিও ওকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু দাদা এমন ঝামেলা করে। কিছুতেই বোঝে না ধর্মকর্ম এক জিনিস আর তন্ত্র আর-এক জিনিস। আমার সাধনায় বারবার বিঘ্ন ঘটায়…। বেশ বিরক্তভাবে কথা শেষ করলেন প্রমোদবাবু।
প্রিয়নাথের কৌতূহল হল। ওঁকে জিগ্যেস করলেন, আপনি কীভাবে সুনীতকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন একটু বলবেন?
বললাম যে–তন্ত্র দিয়ে। সবাই জানে, তন্ত্রশাস্ত্র চিরন্তন–প্রত্যক্ষ ফল দেয়। তন্ত্র স্বয়ং মহেশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী। একে কেউ কখনও অবজ্ঞা করে! একটু থেমে প্রমোদনারায়ণ বললেন, সুনীতের জন্যে আমি ভূত-প্রেত ভয়নাশক যন্ত্র প্রয়োগ করেছি।
সেটা কী জিনিস?
চলুন–আমার ঘরে চলুন–দেখাচ্ছি।
প্রমোদনারায়ণ চাতাল ছেড়ে উঠে পড়লেন। গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজতে-ভজতে ঘরের দিকে রওনা দিলেন।
প্রিয়নাথ ওঁকে অনুসরণ করলেন।
ঘরটা যথেষ্ট প্রাচীন, আর মাপে বেশ বড়। মেঝে পর্যন্ত লম্বা-লম্বা জানলা। ঘরের সিলিং এ কড়ি-বরগা।
ঘরের দেওয়ালে নানা ধরনের ছবি আর ছক আঁকা। শিব ও কালীর বড়-বড় দুটো ফটো মালা দিয়ে সাজানো। ঘরের মেঝের এককোণে বইয়ের গাদা। তার পাশে চারটে তাকও বইয়ে ঠাসা।
ঘরের ডানদিক ঘেঁষে অগোছালো ময়লা বিছানা। বিছানার পাশে টেবিলে মদের বোতাল, গ্লাস, আর চশমা।
সব মিলিয়ে ঘরটায় কেমন যেন অগোছালো উজ্জ্বল ছাপ।
হাতলওয়ালা একটা চেয়ারে প্রিয়নাথকে বসতে বললেন প্রমোদনারায়ণ। তারপর টেবিল থেকে চশমাটা চোখে দিয়ে খাটের তলায় কী যেন খুঁজতে লাগলেন।
অবশেষে খুঁজে পেয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার হাতে লাঠির মতো গোল করে পাকানো একটা কাগজ। সেটা ভূতনাথের সামনে মেলে ধরে বললেন, এই দেখুন–ভূত-প্রেত ভয়নাশক যন্ত্র।
ভূতনাথ দেখলেন, একটা ভূর্জপত্রে ছক কেটে কয়েকটা সংখ্যা লেখা।
প্রমোদনারায়ণ বললেন, দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে অষ্টগন্ধ দিয়ে লিখে রেখেছি। দাদাকে লুকিয়ে সুনীতের ঘরের দেওয়ালে খাটের নীচে সিঁদুর দিয়ে এই যন্ত্র লেখা আছে। এ ছাড়া শ্মশানে গিয়ে কিছু ক্রিয়াকর্ম করার চেষ্টা করছি। একটু-একটু কাজ হচ্ছে…আরও হবে। আসলে সুনু যে কোনওরকম হেল্প করছে না!
প্রমোদনারায়ণের হাত থেকে যন্ত্রটা নিয়ে প্রিয়নাথ খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর সেটা ওঁকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, আচ্ছা, সুনীত যে বারবার সদরিয়া আর নেহা শব্দ দুটো বলছে, তার অর্থ কী?
