..কিন্তু এমনই ভবিতব্য দেখুন, সুনীত এই অদ্ভুত বিপদে পড়ল। মলিন মুখে বললেন বিনোদনারায়ণ, জানি না, এটা সেই অভিশাপের কোনও ছায়া কি না।
আপনার কি মনে হয় কোনও প্রেতাত্মা সুনীতের শরীরে বাসা বেঁধেছে? প্রিয়নাথ প্রশ্ন করলেন।
কী করে বলব! হতাশভাবে জবাব দিলেন বিনোদবাবু, প্রমোদ তো বলছিল সেটাই হয়েছে। ওর চেনা একজন কাঁপালিক আছে। তাকে নিয়ে এসে কীসব তন্ত্র-মন্ত্র করলেই নাকি সুনীত ঠিক হয়ে যাবে। তা আমি রাজি হইনি।
কেন?
প্রমোদ বহুকাল ধরেই কেমন বাউণ্ডুলে গোছের। বাড়ির দিকে মন নেই। সুযোগ পেলেই সাধু-সন্ত-তান্ত্রিকদের পেছনে ছুটে বেড়াত–এখনও তাই। মাঝে-মাঝেই রাতে বাড়ি ফেরে না। যখন তখন ছাইপাঁশ গিলে বসে থাকে। ওকে ভাই বলে পরিচয় দিতে আমার খুব লজ্জা করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিনোদনারায়ণ : আসলে দোষ আমারই, প্রিয়নাথবাবু–ওকে আমি শত চেষ্টা করেও মানুষ করতে পারিনি। তাই ওর প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। বরং ওর মুখোমুখি হলেই আমি কেমন একটা অপরাধবোধে ভুগি। নিজের ব্যর্থতার কথা মনে পড়ে যায়। এটা আমার….।
বিনোদনারায়ণের গলার স্বর কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। মাথা নীচু করে তিনি নিজেকে আড়াল করতে চাইছিলেন।
প্রিয়নাথ ওঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, প্লিজ, আপনি আপসেট হবেন না। আমরা যা চাই সবসময় কি তা হয়!…আচ্ছা, প্রমোদবাবু বিয়ে করেননি?
না। একটু থেমে তারপর? ও যদি নিজে কখনও বিয়ে করে করবে–আমি বড় ভাই হিসেবে কখনও কোনও ইনিশিয়েটিভ নিতে পারব না।
ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে প্রমোদবাবু দুঃখ পাননি?
পেয়েছে। ওকে আমরা ভীষণ ভালোবাসি। ও আমাদের গর্ব। এলাকার সবাই ওকে পছন্দ করে। লেখাপড়ায় জুয়েল ছেলে। খেলাধুলোতেও দারুণ; ওর অনেক বন্ধু-বান্ধব। সবাই মিলে হইহই করে ট্যুরে যায়, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের কাজ করে মানে, করত। সুনীতকে সবাই একডাকে চেনে। আমি যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই তখন যদি কেউ বলে, ওই যে, সুনীতের বড়দা যাচ্ছে, তখন আমার খুব আনন্দ হয়।
সাদা শার্টের পাশপকেট থেকে রুমাল বের করে চোখে বুলিয়ে নিলেন বিনোদবাবু। একটু কেশে গলাটা স্বাভাবিক করে নিয়ে বললেন, আপনি একবার চলুন। নিজের চোখে সব দেখুন। তারপর…আপনি আমাদের শেষ ভরসা।
প্রিয়নাথ হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে বললেন, আমি প্রেসিদ্ধ বা ওঝা নই। তবে ভূত-প্রেতের খোঁজ করে বেড়ানো আমার নেশা। চেষ্টা করে দেখি আপনাকে কোনওরকম হেল্প করা যায় কি না। আচ্ছা, সুনীত যে চিৎকার করে সেটা ঠিক কী ধরনের?
বলে বোঝাতে পারব না, প্রিয়নাথবাবু। আপনি বরং নিজের কানে শুনেই বিচার করবেন।
প্রিয়নাথ লক্ষ করেছিলেন, কথাগুলো বলার সময় বিনোদনারায়ণের মুখে কেমন যেন অসহায় ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল।
এখন, সুনীতের চিৎকার নিজের কানে শোনার পর, প্রিয়নাথ সেই ভয়ের কারণ বুঝতে পারলেন। এই অপার্থিব চিৎকারে বুকের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে যায়।
চলুন–ওপরে চলুন।
বিনোদনারায়ণের কথায় প্রিয়নাথ সংবিৎ ফিরে পেলেন। ভাঙা, ক্ষয় ধরা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ওঁরা ওপরে উঠতে শুরু করলেন।
সিঁড়ির বাঁকের মুখে দেওয়ালে বসানো কারুকাজ করা জাফরি। জাফরির ওপরের দিকে তিনটে ছোট-ছোট হরিণ। সময়ের প্রকোপে জায়গায়-জায়গায় রং চটে গেছে।
জাফরির ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছিল। বাতাসে নদীর ঘ্রাণ প্রিয়নাথ টের পাচ্ছিলেন। একইসঙ্গে শীতের কামড়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই উষ্ণতা ওঠা-নামা করছিল। শীত যেন লাজুকভাবে উঁকিঝুঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপর উষ্ণতা নামতে শুরু করেছে। শীতও আনুষ্ঠানিকভাবে জাঁকিয়ে বসেছে।
গায়ে উলিকটের গেঞ্জি ও সোয়েটার থাকা সত্ত্বেও প্রিয়নাথ সামান্য কেঁপে উঠলেন।
ঘন-ঘন বাঁক নেওয়া সিঁড়ি বেয়ে ওঁরা ওপরে উঠছিলেন। প্রিয়নাথ লক্ষ করছিলেন, সরু চওড়া নানান ধরনের অলিন্দ বাড়িটার নানান দিকে চলে গেছে–অনেকটা ভুলভুলাইয়ার মতন। আলোর ব্যবস্থা বলতে বেশিরভাগই বা। দু-এক জায়গায় টিউব লাইট যে চোখে পড়ছে সেসব নতুন সংযোজন।
দেওয়ালে-দেওয়ালে ড্যাম্পের ছাপ চোখে পড়ছিল। সেইজন্যই হয়তো শীতের সঙ্গে একটা বাড়তি ঠান্ডা যোগ হয়ে গিয়েছিল।
তিনতলায় উঠে দুটো তালাবন্ধ দরজা পেরিয়ে সুনীতের ঘরের দিকে এগোলেন ওঁরা দুজন। বিনোদনারায়ণ দরজা দুটো পেরোনোর সময় বললেন, এত বড় বাড়িতে তিনটে মাত্র প্রাণী। একতলায় আমি, দোতলায় প্রমোদ, আর তেতলায় সুনীত। তাই বাড়তি ঘরগুলো তালাবন্ধই পড়ে থাকে। প্রায় বিশ বছর ওগুলোর দরজা খোলা হয়নি। খুললে হয়তো দেখব ইঁদুর, বাদুড় আর চামচিকে আস্তানা গেড়েছে।
প্রিয়নাথ কিছু বললেন না।
.
সুনীতের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। বিনোদবাবু সামান্য ঠেলতেই দরজা খুলে গেল।
ঘরের ভেতরের আলো প্রিয়নাথের চোখ ধাঁধিয়ে দিল, অলিন্দের আলো মুছে দিল। আর একইসঙ্গে ঘরের দৃশ্য প্রিয়নাথকে ধাক্কা দিল।
ঘরের এক কোণে সুন্দর ধপধপে বিছানা। সেখানে শুয়ে আছে বছর চব্বিশ-পঁচিশের এক যুবক। ফরসা রোগা চেহারা। বুকের কাছ পর্যন্ত লেপ টানা। একটা হাত লেপের বাইরে বলেই রোগা চেহারাটা স্পষ্ট করে আন্দাজ করা গেছে।
সুনীতের মাথায় একরাশ কোঁকড়া চুল। নাক ঠোঁট সুন্দর। ঠোঁটের ওপরে চওড়া গোঁফ। চোয়ালে দু-একদিনের দাড়ি।
