শ্রুতিদির বিয়ে না করার কারণ হিসেবে কানাঘুষোয় কিছু-কিছু শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম, আর-পাঁচটা ঘটনার মতোই ওর লাভার ওকে বিপদে ফেলে পালিয়েছে। কিন্তু এখন পিসিমার মুখে এসব কথা শোনার পর সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল।
আমি কল্পনায় এক অতৃপ্ত প্রেমিককে দেখতে পাচ্ছিলাম–যার বয়েস একশো, দুশো, তিনশো, কি চারশো বছর। যার ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা আজও মেটেনি। এককালে সে হয়তো এইখানেই থাকত। পাগলের মতো আকুল ভালোবাসা নিয়ে কারও জন্যে অপেক্ষা করত।
আমি চোখ বুজে ফেললাম। পায়রার বুকের নরম পালক আমার শরীরে বিলি কাটতে লাগল। আমি একটা চেনা পারফিউমের গন্ধ পেলাম।
ঠিক তখনই পশ্চিমের রেল-লাইন ধরে ঝমঝম শব্দে একটা ট্রেন ছুটে গেল। তার হুইলের শব্দটা আমার বুকের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
ভূতনাথের ডায়েরি : ভয় পাওয়া মানুষ
চিৎকারটা শুনেই প্রিয়নাথ জোয়ারদার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। চিৎকারটার মধ্যে যেন হিম বরফকুচি মেশানো ছিল। চিৎকারটা যতক্ষণ ধরে চলছিল ততক্ষণের জন্য করিডরের আলোটা যেন মলিন হয়ে গেল হঠাৎ ভোল্টেজ কমে গেলে যেমন হয়। তারপর, সেই ভয়-পাইয়ে-দেওয়া চিল্কারের রেশ শেষ হলে, বাটা আবার তেজ ফিরে পেল।
বিনোদনারায়ণ প্রিয়নাথের সামনে দু-এক পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছিল। মুখে আলতো করে হাত বুলিয়ে নিয়ে নরম গলায় বললেন, সুনীত। ওর কথাই আপনাকে বলছিলাম। তেতলায় পেছনের দিকটায় ও থাকে।
প্রিয়নাথ চিৎকারটার কথাই ভাবছিলেন। এমন চিৎকার বুকের ভেতর পর্যন্ত আঁচড় টেনে দেয়। খুব নীচু পরদায় শুরু হয়ে ধাপে-ধাপে ওপরে উঠছে। যেন ঘোরানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে কেউ আইফেল টাওয়ারের মাথায় পৌঁছোতে চাইছে। আর যতই ওপরে উঠছে, গলার স্বর ততই চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
মৃত্যুকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কেউ হয়তো এরকম চিৎকার করে। হয়তো ভাবে, এই চিৎকারটা তাকে বাঁচিয়ে দেবে। যত উঁচু পরদায় চিৎকার করতে পারবে, তার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
চিৎকারটা শেষ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড যেন আলপিন-নিস্তব্ধতা। তারপর বিনোদনারায়ণ কথা বলেছিলেন। কিন্তু প্রিয়নাথের কানে ভয়ংকর চিৎকারটার রেশ তখনও বাজছিল। পুরোনো যত চিৎকার বা আর্তচিৎকার প্রিয়নাথ শুনেছেন সুনীতের চিৎকার এক পলকে সব মুছে দিয়েছে।
বিনোদবাবু বলেছিলেন, ওঁর ছোট ভাই সুনীতনারায়ণ মাঝে-মাঝে অদ্ভুতভাবে চিৎকার করে ওঠে। সেই সঙ্গে আরও কিছু কিছু বিচিত্র কাজ করে। প্রিয়নাথ যদি এ-ব্যাপারে কোনও সাহায্য করতে পারেন তা হলে ভালো হয়। কারণ, ডাক্তার বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন।
বিনোদনারায়ণ প্রিয়নাথের খোঁজ পেয়েছেন লতায়-পাতায়। তারপর একদিন বিকেলবেলা ওঁর নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছেন। প্রিয়নাথকে খুলে বলেছেন নিজের সমস্যার কথা। তারপর কাতরভাবে অনুনয় করে বাড়িতে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন।
কী করে আপনি বুঝলেন আপনার ভাইয়ের প্রবলেমটা কোনও ভূতুড়ে ব্যাপার? সিগারেটে কড়া টান দিয়ে জানতে চাইলেন ভূতনাথ।
কেমন যেন সংকুচিত হয়ে ইতস্তত করে বিনোদনারায়ণ বললেন, লোকমুখে শুনেছি, বিজ্ঞান যেখানে শেষ সেইখান থেকে আপনার এলাকা শুরু। সুনীতের জন্যে ডাক্তার-সাইকিয়াট্রিস্ট করে করে আমি বিজ্ঞানের পুঁজি শেষ করে বসে আছি। তাই নিরুপায় হয়ে আপনার কাছে এসে হাত পেতেছি। আমার ছোট ভাইটাকে যে করে তোক বাঁচান। ওর কষ্ট আর সইতে পারছি না। এত হাসিখুশি টগবগে জোয়ান ছেলেটার এই প্যাথেটিক অবস্থা ভাবা যায় না…।
কথা বলতে বলতে বিনোদনারায়ণের চোখে জল এসে গিয়েছিল। প্রিয়নাথ লক্ষ করেছিলেন, ছোট ভাইয়ের কথা বলার সময় বড় ভাইয়ের মুখে-চোখে পিতৃস্নেহ ফুটে উঠেছিল–যা আজকের দিনে প্রায় দেখাই যায় না।
প্রিয়নাথ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে রইলেন। একমনে সিগারেটে টান দিয়ে গেলেন। তারপর ছোট্ট করে বললেন, ঠিক আছে। আমি একবার চেষ্টা করে দেখি। কবে আপনাদের বাড়ি যাওয়া যায় বলুন…।
যেদিন আপনি বলবেন।
বিনোদনারায়ণদের বাড়ি বসিরহাটে। ওঁদের পিতৃপুরুষ জমিদার ছিলেন। তাই জমিজমা-পুকুর দিঘির কোনও হিসেব ছিল না। এখনও নয়-নয় করে যা অবশিষ্ট আছে তা-ও অনেক। পুরোনো আমলের বিশাল বাড়িতে ওঁরা তিন ভাই থাকেন। বিনোদনারায়ণ, প্রমোদনারায়ণ, আর ছোট ভাই সুনীতনারায়ণ।
বিনোদনারায়ণ যখন সবে কিশোর থেকে যুবক হয়ে উঠছেন তখন ওঁদের বাবা সাপের কামড়ে মারা যান। শ্রাদ্ধ-শান্তি ক্রিয়াকর্ম ইত্যাদি মিটে গেলে হঠাৎই একজন সন্ন্যাসী ওঁদের বাড়িতে আসেন। সকলের হাত দেখে ভাগ্যচর্চা করে তিনি বলে যান, এ-বংশের পুরুষদের অপঘাতে অকালমৃত্যু হবে। এটা নিয়তির অভিশাপ।
তার পরই সুনীতের জন্ম হয়।
এর কয়েক বছর পর বিনোদনারায়ণের মা ম্যালেরিয়ায় মারা যান। প্রমোদ আর সুনীত তখন খুবই ছোট। বিনোদনারায়ণ ওঁদের কোলে-পিঠে করে আগলে রেখে বড় করেন। অভিশাপের ভয়ে তিনি বিয়ে করেননি। সারাটা জীবন সম্পত্তি দেখাশোনা আর ধর্মকর্ম নিয়ে থেকেছেন। মনে মনে ভেবেছেন নিশিদিন ঈশ্বর-সাধনায় মগ্ন থাকলে অভিশাপ ধীরে-ধীরে কেটে যাবে। কালো ছায়া সরে গিয়ে আবার আলো দেখা দেবে।
