আমি অবাক হয়ে শ্রুতিদিকে দেখছিলাম। ও থামতেই বলে উঠলাম, নামটা তোমার শ্রুতির বদলে শ্রুতিধর হলে মানানসই হত।
শ্রুতিদি হাসল।
পিসিমা আবার বলতে শুরু করলেন।
তারপর ছায়াটা আলমারির কাছে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কীসব করতে থাকে। তারপর চলে আসে টেবিলের কাছে। সেখানে ঝুঁকে পড়ে খানিক সময় কাটিয়ে দেয়। জয়তী ভেবেছিল, লোকটা বোধহয় টেবিলের ড্রয়ারটা খোলার চেষ্টা করছে। যাই হোক, এরপর ছায়াটা চলে যায় আলমারির পেছনে। একদিক দিয়ে ঢুকে আর-একদিক দিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর আবার ফিরে আসে জয়তীর কাছে। আবার ওইসব শুরু করে দেয়। জয়তী যখন নেশার ঘোরে প্রায় তলিয়ে যাচ্ছে তখন হঠাৎই সামনের লাইন দিয়ে কানফাটানো শব্দ করে একটা ট্রেন ছুটে যায়। সঙ্গে-সঙ্গে জয়তীর সেন্স ফিরে আসে। ও চেঁচিয়ে ওঠে। তখন অন্ধকার ছায়াটা যেন হাওয়ায় ভেসে জানলার গ্রিল ভেদ করে পলকে পালিয়ে যায়।
পিসিমার গল্প শেষ হতেই আমি হেসে বললাম, ভূত নয়, পিসিমা–চোর। খুব বদ টাইপের চোর। তোমাদের থানায় ইনফর্ম করা উচিত ছিল। লোকটা আলমারি খোলার চেষ্টা করে পারেনি। টেবিলের ড্রয়ারটাও খুলতে পারেনি। তখন তোমার ঘুমন্ত রিলেটিভকে নিয়ে অসভ্যতা করার চেষ্টা করেছে। ইশ, আমি যদি কাল সময়মতো চেঁচিয়ে উঠতে পারতাম! তা হলে সুকান্তি লোকটাকে পাকড়াও করে কষে ধোলাই দিতে পারত।
পিসিমা মাথা নাড়লেন : না রে, চোর-টোর নয়। পাঁচ-সাত বছর ধরে লোকটা একই বাড়িতে একই ঘরে একই কাজ করে চলেছে–এ কখনও হয়! কই, পাড়ার আর কারও বাড়িতে তো কখনও এরকম শুনিনি! তা ছাড়া জানলার গ্রিলের মধ্যে দিয়ে লোকটা ঘরে ঢুকল কেমন করে, আবার পালালই বা কেমন করে! আর কাল রাতে বাইরে থেকে তোর ঘরের দরজার খিল-ছিটকিনি খুলল কেমন করে, বল!
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর জেদি গলায় বললাম, তুমি যে এত জোর দিয়ে বলছ, তুমি নিজে কখনও ভূতটাকে চোখে দেখেছ!
পিসিমা পলকে কেমন উদাস হয়ে গেলেন। খোলা জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলেন কিছুক্ষণ। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে কেমন এক অদ্ভুত গলায় বললেন, না, আমি দেখিনি। প্রথমবার এরকম ঘটনা শোনার পর আমি একা ও-ঘরে অনেক রাত কাটিয়েছি, কিন্তু কেউ আসেনি। আমাদের অনেক রিলেটিভ ও-ঘরে রাত কাটিয়েছে, কিন্তু কোনও প্রবলেম হয়নি। অবশ্য তারা বেশিরভাগই পুরুষ ছিল–আর দু-একজন বয়স্কা মহিলা। তাদের বেলা ওই নিশিকুটুম্ব দেখা দেয়নি। দ্বিতীয়বার সে দেখা দিল জয়তীর বেলায়। তখন জয়তী তোর মতোই দেখতে-শুনতে সুন্দর, অল্প বয়েস। আমার মনে হয়, অল্পবয়েসি সুন্দরী মেয়েদের দিকে এই ভূতটার আলাদা কোনও টান আছে। ওদের প্রাণপণে ভালোবাসতে চায়। নইলে কেউ ওরকম করে! ওরকম কবিতা বলে!
আমি ঠোঁট টিপে চোখ কপালে তুলে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। তারপর মাথা নেড়ে বললাম, তুমি যতই বলো, পিসিমা, আমি ঠিক যেন ফুলি কনভিণ্ড হতে পারছি না।
এবার শ্রুতিদি জবাব দিল, তুই তখন থেকে এরকম জেদ ধরে আছিস কেন, রিমকি। শুরুতে তুই-ই তো বললি ঘরটা হন্টেড। তা ছাড়া মা এই যে বলল, ছায়াটা আলমারির পেছনে ঢুকে গেল– একদিক দিয়ে ঢুকে আর-একদিক দিয়ে বেরিয়ে এল–এটা কি কোনও মানুষের পক্ষে ইম্পসিবল নয়?
কেন, ইম্পসিবল কেন!
আলমারির পেছনেই তো দেওয়াল! সেখানে দুইঞ্চিও ফাঁক নেই! তা হলে একটা গোটা মানুষ ঢুকবে কেমন করে?
আমি দমে গেলাম।
শ্রুতিদি বলেই চলল, তোকে তো লোকটা টাচ করেছিল। ওটা কোনও মানুষের ছোঁয়া? তুই বল! তখন তোর মন-শরীর অবশ হয়ে যায়নি? একটু চুপ করে থেকে শ্রুতিদি আবার নীচু গলায় বলল, ভাগ্যিস ট্রেনটা এসে গিয়েছিল…নইলে আরও বাজে কিছু হতে পারত!
তার মানে! আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। কাল রাতে ঝমঝম শব্দে ট্রেন ছুটে গেছে বলে আমি বাজে কিছু হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছি! পিসিমাদের ওই রিলেটিভ-জয়তী–সে-ও একইরকম ভাবে বেঁচে গেছে।
শ্রুতিদি এত সব জানল কেমন করে! কী করে মনে রাখতে পারল কবিতার ওই রোম্যান্টিক লাইনগুলো!
শ্রুতিদির মুখ থমথম করছিল।
আমি জিগ্যেস করলাম, তুমি এত জানলে কেমন করে?
শ্রুতিদির চোখে জল এসে গেল পলকে। মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে ও উঠে দাঁড়াল। তারপর বলতে গেলে ছুট-পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে পিসিমার দিকে তাকালাম।
পিসিমা মাথা নীচু করে বসেছিলেন। সেই অবস্থাতেই বললেন, শ্রুতিকে নিয়ে ব্যাপারটা শুরু হয়। তার আগে কখনও কিছু হয়নি। সে-রাতে ও একা শুয়েছিল ওই ঘরে। সেদিনটা আবার বাংলা বন্ধ ছিল। তাই কোনও ট্রেন চলেনি। অশরীরী সেই প্রেতটা সেদিন আর মাঝপথে থামেনি। ওর…ওর..সাধ মিটিয়ে তারপর উধাও হয়ে গেছে…।
আমি পাথর হয়ে গেলাম। আমি এসব কী শুনছি!
পিসিমা কেঁদে ফেললেন : সেদিন থেকে শ্রুতি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। পরে…পরে..ওকে মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্যে মিছিমিছি অ্যাবরশন করাতে হয়। তোকে আমি লজ্জায় একথা আগে বলিনি। তা ছাড়া কেউই তো এসব কথা বিশ্বাস করবে না। সবই আমাদের কপাল…
জয়তীর ব্যাপারটার পর এতবছর পার হয়ে গেছে…তাই ভেবেছিলাম ঘরটার দোষ কেটে গেছে। এখন দেখছি যায়নি! আমাদের হয়তো বাড়িটাই ছেড়ে দিতে হবে…।
