আমি সাড়া দিলাম : খুলছি, খুলছি! এক মিনিট…।
এক মিনিটের কম সময়েই পোশাক পালটে টুথব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
কাল রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারিসনি নাকি!
আমি জড়ানো গলায় বললাম, না।
তখনই ও দরজার কাছ থেকে জ্বলন্ত টিউব লাইটটা দেখতে পেল।
কী রে, সারা রাত আলো জ্বেলে ঘুমিয়েছিলি নাকি!
হ্যাঁ। আলো পাখা অফ করে দে। আমি হাত-মুখ ধুয়ে ওপরে যাচ্ছি। গিয়ে সব বলছি। পিসিমাকে বল চা করতে।
ওপরে গিয়ে চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়েই আমি বললাম, পিসিমা, কিছু মাইন্ড কোরো না। তোমাদের ওই একতলার ঘরটা কিন্তু হন্টেড।
হন্টেড মানে! ঠিক কী বলতে চাইছিস? সুকান্তি জিগ্যেস করল।
আমি চায়ের কাপে আর-একটা লম্বা চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বললাম, হন্টেড মানে হন্টেড। ওই ঘরটায় ভূতের উপদ্রব আছে। আমাকে আগে বলিসনি কেন?
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
পিসিমা, শ্রুতিদি, সুকান্তি–সবাই বেশ ফ্যালফেলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। পিসিমা আর তিদি তো মনে হল আমার কথায় বেশ ভয় পেয়ে গেছে। আর সুকান্তি আমাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছিল। বুঝতে চাইছিল আমি সত্যি-সত্যি ভূতের কথা বলছি, নাকি ঠাট্টা করছি।
কিছুক্ষণ পর সুকান্তি মুখ নীচু করে মিনমিন করে বলল, না…মানে…ভাবিনি যে, এখনও ও-ঘরটায় কোনও প্রবলেম হতে পারে। মুখ তুলে পিসিমার দিকে তাকাল ও মা, তুমি তো জানো, ছোড়দির বন্ধু ঈশিতা তো এসে রাতে ও-ঘরে ছিল। তখন তো কিছু হয়নি! তারপর…।
লক্ষ করলাম, শ্রুতিদির চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। আর পিসিমাও কেমন যেন অস্বস্তি পেয়ে এর মুখে ওর মুখে চাইছেন।
সুকান্তি আমার কাছে ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, তুই ঠিক কী দেখেছিস বল তো! কী হয়েছে কাল রাতে?
কী আবার হবে! একটা লোক ঢুকে পড়েছিল আমার ঘরের ভেতরে। অথচ রাত্তিরে শোওয়ার আগে খিল-ছিটকিনি ঠিকমতো এঁটে দিয়েছিলাম।
আমি চা খেতে-খেতে পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম।
জানলা দিয়ে রোদ-ঝলমলে দিন দেখা যাচ্ছে। চারপাশে কোথাও অশরীরী-অলৌকিকের ছায়ামাত্র নেই। এই পরিবেশে কাল রাতের ব্যাপার-স্যাপারগুলো বলতে গিয়ে আমার হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। মনে হল, এমন তো নয় যে, বাইরে থেকে কায়দা করে একতলার ঘরটার খিল-ছিটকিনি খোলা যায়! তা হলে কোনও বদমাস লোক চুরি বা অন্য কোনও বদ মতলবে বাইরে থেকে খিল ছিটকিনি খুলে মাঝরাতে ঘরে ঢুকে পড়েছে। তারপর ট্রেনের আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে পালিয়েছে।
সে কথাই সুকান্তিকে বললাম।
সুকান্তি মানতে চাইল না। বলল, না রে, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ঘরটা বোধহয় সত্যি সত্যিই হন্টেড। তোর আগে আরও দুটো এরকম কেস হয়েছে।
কীরকম, শুনি ।
এবার পিসিমা মুখ খুললেন : জয়তাঁকে তুই চিনবি না। আমার ননদের বড় মেয়ে। বছরপাঁচেক আগে ও ওয়াশ হসপিটালে ওর এক আত্মীয়কে দেখতে এসেছিল। কী একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল যেন। তখন ও আমাদের বাড়িতে এসে থেকেছিল। রাতে নীচের ওই ঘরটায় শুয়েছিল। ও কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়েছিল।
কী দেখেছিল রাতে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল।
পিসিমা শাড়ির আঁচলে হাত মুছলেন। তারপর বললেন, দাঁড়া, ভাতটা একবার দেখে আসি। আঁচটা কমিয়ে দিয়ে আসি।
পিসিমা উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
একটু পরেই ফিরে এসে বলতে শুরু করলেন।
রাত কত হয়েছিল জয়তীর খেয়াল নেই। তবে খুব গভীর রাত নিশ্চয়ই। হঠাৎই ও দেখল রেললাইনের দিকে একটা জানলার গ্রিলের বাইরে একটা ছায়া। চুপচাপ দাঁড়িয়ে যেন ওকে লক্ষ করছে।
জয়তী প্রথমটায় ভেবেছে চোর-ছ্যাচড় হবে। ও চিৎকার করতে যাবে, ঠিক তখনই দ্যাখে ছায়াটা গ্রিল ভেদ করে ঘরে ঢুকে পড়ল–ঠিক একতাল মাখনের মতো। জয়তী আর চিৎকার করতে পারেনি। ও কাঠ হয়ে শুয়ে ছায়াটাকে লক্ষ করতে চেষ্টা করছিল।
তখন শুক্লপক্ষ ছিল। তাই আবছা হলেও লোকটাকে দেখতে পাচ্ছিল জয়তী। লোকটাও ওর বিছানার ধার ঘেঁষে পায়চারি করছিল। জয়তী ওর নিঃশ্বাসের শব্দ পেয়েছিল। একটা সেন্টের গন্ধ পেয়েছিল। তারপর…তারপর…।
সুকান্তি আচমকা উঠে দাঁড়াল। বলল, মা, আমি একটু বাজারে বেরুচ্ছি। আচ্ছা, কাঁচালঙ্কা কি ফুরিয়ে গেছে, না আছে?
একশো নিয়ে আসিস।
সুকান্তি একটা গানের কলি ভাঁজতে-ভাঁজতে বেরিয়ে গেল।
আমি পিসিমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
সুকান্তির সামনে পরের কথাগুলো বলতে অসুবিধে হত…। পিসিমা বললেন, ও অবশ্য জানে–তাই আমার অসুবিধেটা বুঝতে পেরে চলে গেল। তোরা মেয়ে, তোদের সামনে বলা যায়…।
এরপর লোকটা জয়তীর গায়ে হাত দিয়েছিল। ওর..ওর…এত…এত ভালো লেগেছিল যে, ও মুখ ফুটে বারণ করতে পারেনি। পিসিমা চোখ নামালেন। ওঁর মুখে লালচে ভাব ফুটে উঠল।
শ্রুতিদিরও দেখলাম কান-টান লাল হয়ে গেছে। অনধিকারী ভালোবাসায় তৃপ্তি পাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায়। কিন্তু শরীর যে সবসময় মনের কথা মানতে চায় না!
এইসব করতে করতেই লোকটা বিড়বিড় করে কবিতার মতো কী একটা আবৃত্তি করছিল। জয়তী দু-চারটে লাইন মনে করে আমাকে বলেছিল, কিন্তু আমার ঠিক মনে পড়ছে না। শুরুটা এইরকম ছিলঃ যে আমাকে চিরদিন…, তারপর কী যেন।
শ্রুতিদি হঠাৎ বলে উঠল, যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে / অথচ যার মুখে আমি কোনওদিন দেখিনি, / সেই নারীর মতো…তারপর খানিকটা ঝাপসা, মনে পড়ছে না…তারপর আবার আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা, / আর তুমি নারী/ এই সব ছিল সেই জগতে একদিন।
