গলাটা সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে আলো নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের ভেতরে। আন্দাজে ভর করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বাইরের ঝোঁপঝাড় থেকে রাত-পোকার ডাক কানে আসছিল।
চোখটা একটু সয়ে আসতেই রেললাইনের দিকে খোলা জানলা দুটোর দিকে নজর পড়ল। ঘরের তুলনায় অন্ধকার সেখানে খানিকটা যেন কম। কালো আকাশ, দু-একটা তারা, আর গাছ গাছালির কয়েকটা ডালপালা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
আর-একটা ট্রেন ঝমঝম করে ছুটে গেল। তারপরই যেন চারদিক চুপচাপ হয়ে গেল। বাতাসে নড়ে ওঠা পাতার খসখস শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম আমি।
হঠাৎই ডাকটা শোনা গেল আবার।
রূ–প–শ্রী…।
আবেগ থরথর গলায় ভীষণ চাপা ফিশফিশ স্বরে আমার নাম ধরে ডেকে উঠল কেউ।
না, এবারে শুনতে আমার কোনওরকম ভুল হয়নি। তিনটে অক্ষরকে আলাদাভাবে টেনে টেনে উচ্চারণ করেছে সে। ভালোবাসার জুরে বেপথু কোনও রোমান্টিক কণ্ঠস্বর।
পিসেমশাইয়ের গলা এটা নয়। তা ছাড়া তিনি অপঘাতে মারা যাননি যে, ভূত-প্রেত হয়ে উপোসি ভালোবাসা নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন।
তা হলে এমন করে কে ডাকছে আমায়!
আমি বিছানায় কাঠ হয়ে শুয়ে রইলাম। যেন সামান্য নড়াচাড়া করলেই অতল খাদে পড়ে চিরকালের মতো তলিয়ে যাব।
এইভাবে কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর ভাবতে শুরু করলাম, ঘরের আলোটা জ্বেলে দেব কি না। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে আমার স্বীকার করতে লজ্জা নেই–বেশ ভয়-ভয় করছিল। অথচ আমার মনের একটা অংশ ভেতর থেকে বারবার আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিল যে, ভূত বলে কিছু নেই। যারা ভূতের ভয় পায় ভূতেরা তাদের দেখা দেয়। কিন্তু আমার মনের বাকি অংশ কিছুতেই সেসব যুক্তি মানতে চাইছিল না।
ঠিক তখনই খুট করে একটা শব্দ হল। যেন কেউ ঘরের দরজা খুলল। অন্ধকারে বাইরে থেকে ছুটে আসা বাতাসের ঝাপটাও টের পেলাম আমি। অথচ একটু আগেই দেখেছি দরজায় খিল ছিটকিনি ভালো করেই আঁটা রয়েছে।
আমি শুয়ে-শুয়েই ঘামতে শুরু করলাম। অথচ মাথার ওপরে সিলিং পাখা একই তালে ঘুরে চলেছে। এরপর কি আমি অজ্ঞান হয়ে যাব!
দরজার শব্দ হল আবার। তারপর অতি সাবধানে খিল লাগানোর শব্দ, ছিটকিনি আঁটার শব্দ।
তার মানে! কেউ কি ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা আবার বন্ধ করছে! অসম্ভব।
নিজেকে বারবার বললাম, এ-সময় মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার। অযথা ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয় না। কারণ, ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই। কিচ্ছু নেই।
যুক্তি দিয়ে সবই বুঝতে পারছিলাম, অথচ ভীষণ ভয় করছিল।
আমার খুব কাছে কে যেন নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর পা ফেলে হেঁটে বেড়ানোর অস্পষ্ট শব্দ পেলাম।
আমার চোখ খুব একটা কাজ করছিল না। তবে নাক আর কান দ্বিগুণ সজাগ ছিল। হয়তো সেইজন্যেই পারফিউমের হালকা গন্ধটা টের পেলাম।
এই পারফিউম আমি ব্যবহার করি না। কিন্তু কেন জানি না মনে হল, এটা পুরুষদের পারফিউম। আর গন্ধটা আমাকে যেন টানছিল, নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই একটা জমাট ছায়া জানলার চৌকো ফ্রেমে দেখতে পেলাম–তবে মাত্র একপলকের জন্যে। তারপরই ওটা আলমারির দিকে সরে গেল।
এবার আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু ভোকাল কর্ড স্ট্রাইক করে বসল।
আশ্চর্য! যখন আমি চিৎকার করতে পারতাম তখন লজ্জায় সঙ্কোচে চিৎকার করতে চাইনি। আর এখন প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইছি অথচ পারছি না।
হঠাৎই মনে হল আমার বিছানায় খুব কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে ঝুঁকে পড়েছে আমার শরীরের ওপরে। পারফিউম ছাড়া আমি যেন একটা উগ্র পুরুষালি গন্ধ পাচ্ছি। একই সঙ্গে পায়রার বুকের পালকের মতো নরম আলতো একটা ছোঁয়া আমাকে অবশ করে দিল। হাতে, পায়ে, গলায়, বুকে। টিভি চালিয়ে তার স্ক্রিনের খুব কাছে হাত নিয়ে গেলে যেরকম অনুভূতি হয়, এ-ছোঁয়া ঠিক সেইরকম।
আমার ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র হুইল্প দিয়ে ঝমঝম শব্দে একটা ট্রেন ছুটে গেল।
আর সঙ্গে-সঙ্গে তাল কেটে গিয়ে সব ওলটপালট হয়ে গেল। পলকে পারফিউমের গন্ধ, অলৌকিক ছোঁয়া সব উধাও। আমার ঘুমের ঘোরও কেটে গেল। গলা পর্যন্ত যে-ভয় উথলে উঠেছিল সেটা থার্মোমিটারের পারার মতো দ্রুত নামতে লাগল।
প্রচণ্ড এক চেষ্টায় বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম আমি। হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় আলোর সুইচ জ্বেলে দিলাম।
ঘরে কেউ নেই।
ঘরটা শেষ যেমনটি দেখেছিলাম ঠিক তেমনটিই আছে।
হঠাৎই আমার চোখ গেল ঘরের দরজার দিকে।
দরজার খিল-ছিটকিনি দুটোই ভোলা। দরজার পাল্লা দুটো ইঞ্চিদুয়েক ফাঁক হয়ে আছে।
তা হলে কি ঘরে চোর ঢুকেছিল! কিন্তু বাইরে থেকে তো খিল-ছিটকিনি খোলা অসম্ভব।
দরজা আবার ভালো করে বন্ধ করে খিল আর ছিটকিনি এঁটে দিলাম। পাল্লা দুটো বারকয়েক টেনেটুনে দেখলাম ঠিক আছে কি না। তারপর বিছানায় ফিরে এলাম।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত সওয়া তিনটে।
শরীর আর বইছিল না। আলো জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়লাম। কারণ, আলো নিভিয়ে দিলে আমার আর কিছুতেই ঘুম আসবে না।
.
দুমদুম করে দরজার কেউ ধাক্কা দিচ্ছিল।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। হাতঘড়িটার দিকে তাকালাম। নটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। জানলার দিকে তাকিয়েও বোঝা যাচ্ছে বেলা অনেক হয়ে গেছে।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল। সেইসঙ্গে সুকান্তি আমার নাম ধরে ডাকল ও রিমকি! রিমকি! ওঠ, ওঠ–নটা বাজে! তুই বলে মর্নিংওয়াকে যাবি, সানরাইজ দেখবি!
