শ্রুতিদি কেমন অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখছিল। ওর বলা সকালের কথাটা মনে পড়ল : তোকে আমার হিংসে হচ্ছে, রিমকি।
সুকান্তি পিসিমাকে বলল, রিমকি একটুও বদলায়নি। সেই ছোটবেলার মতোই ঝাসি কি রানি। কী বল, রিমকি!
আমি বললাম, তুই ছোটবেলা থেকে যা কুঁড়ে! তুই কখনও নিজের আস্তানা ছাড়বি! বিছানায় পাশ ফিরতে হলেও তো মাকে ডাকিস পাশ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে।
সুকান্তির সঙ্গে লাঠালাঠি করতে করতেই খাওয়া শেষ হল।
এরপর শুতে যাওয়ার পালা। সুকান্তি বলল, দাঁড়া, তোর জন্যে কটা ম্যাগাজিন নিয়ে আসি।
আমি বললাম, দরকার নেই–আমার সঙ্গে বই আছে, কিন্তু ও শুনল না। ওর ঘরে গেল ম্যাগাজিনগুলো নিয়ে আসতে।
দোতলায় বড় ঘরটায় পিসিমা আর শ্রুতিদি শোয়। তার পাশে ছোট ঘরটায় সুকান্তি। ওর ঠিক নীচেই আমার জন্যে বরাদ্দ করা ঘরটা। এমনিতে ওটা বন্ধই থাকে ইতিও ওখানে শুত না। পিসেমশাই বেঁচে থাকতে ঘরটা ব্যবহার হত। এতকালে ছিল বৈঠকখানা–পরে পিসেমশাইয়ের শোওয়ার ঘর। ঘর ছাড়া বাকিটা পুরোনো ধাঁচের বারান্দা, কলতলা আর বাথরুম।
খাওয়াদাওয়ার পর পিসিমাদের সঙ্গে বসে আর-এক প্রস্থ গল্প, আর কিছুটা সময় টিভি দেখলাম। তারপর হাই উঠতে লাগল।
পিসিমা বললেন, আজকের মতো ঢের হয়েছে। এবার শুতে যা–।
সুকান্তি ম্যাগাজিনগুলো হাতে নিয়ে আমাকে খোঁচা দিল? চল, তোকে সি অফ করে আসি।
একতলার ঘরের দরজায় এসে ও বলল, ঢুকেই বাঁদিকে সুইচবোর্ড–তুই তো জানিস। আর বাথরুম…।
আমি ম্যাগাজিনগুলো ওর হাত থেকে নিয়ে বললাম, মায়ের কাছে মাসির গল্প করিস না। গুডনাইট। কাল সকাল-সকাল উঠবি–আমাকে এসকর্ট করে মর্নিং ওয়াকে নিয়ে যাবি, সানরাইজ দেখাবি।
ও ভুরু উঁচিয়ে বলল, এটা কি পুরী নাকি! এখানে সানরাইজ রান্নাঘরের তাকে পলিপ্যাকে পাওয়া যায়। হাসল সুকান্তি। তারপর গলাটা সিরিয়াস করে বলল, সত্যি তুই ভয় পাবি না তো!
আমি হালকা গলায় বললাম, পেলে তোকে ডাকব।
তা হলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাবি…জানিস তো আমার স্লিপ খুব ডিপ!
ও চলে গেল।
আমি ঘরের আলো জ্বেলে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলাম। সাবধানের মার নেই ভেবে খিল আর ছিটকিনি দুটোই এঁটে দিলাম। তারপর ম্যাগাজিনগুলো বিছানায় রেখে ঘরের এক কোণে গিয়ে শাড়ি ছেড়ে নাইটি পরে নিলাম।
ঘরের আলো বলতে একটিমাত্র টিউব লাইট। আর আসবাবপত্র বলতে একটা ছোট কাঠের আলমারি, একটা টেবিল, একটা চেয়ার, একটা বুককেস, আর একটা ছোট খাট। আলমারির মাথায় পুরোনো আমলের টুকিটাকি জিনিস–তার মধ্যে একটা পেতলের দোয়াত আর একটা পেতলের ফুলদানি। তবে এত ময়লা হয়ে গেছে যে, পেতলের বলে আর বোঝা যায় না।
ঘরে তিনটে জানলা ও একটা ভেতরের কলতলার দিকে, আর দুটো রেললাইনের দিকে। তিনটে জানলাতেই শক্তপোক্ত গ্রিল লাগানো।
বিছানায় গা ঢেলে দিতেই এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেলাম–যেন কেউ আমার জন্যে পালকের কোল পেতে দিয়েছে। অথচ বিছানাটা নিতান্তই মামুলি।
সামান্য আড়মোড়া ভেঙে একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন হাতে তুলে নিলাম। ব্যাগে আরভিং ওয়ালেসের সি অভ ফিলিপ ফ্লেমিং রয়েছে, কিন্তু সেটা আর বের করতে ইচ্ছে করল না।
রাতে বই পড়া আমার বহুদিনের অভ্যেস। তাই ক্লান্ত লাগলেও ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ বোলাতে লাগলাম। বহুদিন সিনেমার খবর নেওয়া হয় না। তাই ম্যাগাজিনটা পড়তে খারাপ লাগছিল না।
মাঝে-মাঝে ট্রেন ছুটে যাওয়ার শব্দে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই, একটা ট্রেন চলে যাওয়ার পর, কে যেন আলতো করে আমার নাম ধরে ডাকল।
রূপশ্রী…।
আমি চমকে উঠলাম। চোখ ফেরালাম দরজার দিকে। দরজায় ছিটকিনি, খিল সব ঠিকঠাকই আছে।
সুকান্তি কি দরজার বাইরে থেকে আমাকে ডাকল। কিন্তু ডাকটার ধরন যেন কেমন অদ্ভুত। কেউ যেন ভীষণ আহ্লাদ করে আমার নামটা উচ্চারণ করেছে।
বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত একটা বাজতে মিনিট পাঁচ-সাতেক বাকি। এ-সময়ে সুকান্তি কেন আমাকে ডাকতে আসবে! নাকি ও আঁসির রানির সাহস পরীক্ষা করে দেখতে চায়।
ম্যাগাজিনটা মাথার কাছে রেখে আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। একটু সতর্কভাবে দরজার কাছে গেলাম। দরজার পাল্লার জোড়ের কাছে মুখ নিয়ে প্রশ্ন করলাম, কে? সুকান্তি?
উত্তরে কোনও সাড়া পেলাম না। তবে মনে হল যেন কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আবার প্রশ্ন করলাম আমি, কে? কে?
কোনও উত্তর নেই।
পিসিমাদের সদরে গ্রিলের দরজা বসানো। তার ঠিক পরেই একটা ভারী কাঠের দরজা। দরজারগুলো তালা-খিল-টিল দিয়ে ঠিকঠাক বন্ধ থাকে। এ ছাড়া বাইরে থেকে উটকো লোক ঢুকে পড়ার কোনও পথ নেই। তিনতলার ছাদের দরজাতেও বরাবর রাতে খিল এঁটে দেওয়া হয়।
সুতরাং, কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকার পর ভীষণ বোকা-বোকা লাগল। মনে হয় আমার নাম ধরে কেউ ডাকেনি। ম্যাগাজিনের দিকে মনোযোগ থাকায় আমি হয়তো ভুল শুনেছি। সামান্য এই কারণে যদি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করি তা হলে সুকান্তি টিটকিরি দিয়ে আর টিকতে দেবে না।
চুপচাপ বিছানায় ফিরে এলাম। ছোট টেবিলটায় জলের জগ আর গ্লাস রাখা ছিল। সেদিকে চোখ পড়তেই পলকে তেষ্টা পেয়ে গেল। বিছানা থেকে নেমে চলে গেলাম টেবিলের কাছে। গ্লাসে জল ঢেলে প্রাণভরে তেষ্টা মেটাতে গিয়েও থেমে গেলাম। বেশি জল খাওয়া ঠিক হবে না। কারণ, রাতে আর বাথরুমে বেরোতে চাই না।
