আমি তোমাদের এখানে দু-চারদিন থাকতেই এসেছি। দেখছ না, ব্যাগটা কী ভারী!
উত্তর শুনে সুকান্তি আর পিসিমা একেবারে ছেলেমানুষ হয়ে গেল। হওয়ারই কথা। কারণ, আমার ছোটবেলা-বড়বেলার অনেকটা সময় শ্রীরামপুরে পিসিমাদের বাড়িতেই কেটেছে। আজ বুঝতে পারি, আমি যে আমি হয়ে উঠেছি, তার জন্যে পিসিমা-পিসেমশাইয়ের কাছে অনেক ঋণ রয়ে গেছে আমার।
তাই ওদের সঙ্গে-সঙ্গে আমিও ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম।
শ্রুতিদি একটু অবাক হয়ে তিনটে পাগলকে দেখছিল।
হঠাৎই একটা গ্যালপিং ট্রেন ছুটে গেল সামনের রেল-লাইন দিয়ে। পিসিমাদের পুরোনো বাড়ির জানলা-দরজা মিহি শব্দ তুলে কঁপতে লাগল।
ট্রেনের এই কু-ঝিকঝিক শব্দ আমার বালিকা বয়েসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তখন পুজোর ছুটি আর গরমের ছুটি মানেই শ্রীরামপুরে পিসিমাদের বাড়ি। আর ট্রেনের কু-ঝিকঝিক।
পিসিমাদের বাড়িটা রাইল্যান্ড রোডের ধারে। বোধহয় একশো কি দেড়শো বছর পুরোনো। পিসেমশাই এটা কেনার পর জোড়াতালি দিয়ে সারিয়ে-টারিয়ে নিয়েছেন। একতলায় একটা ঘর আর কলতলা-বাথরুম। দোতলায় দুটো ঘর আর পশ্চিমে রেললাইনের দিকে একটা বারান্দা। আর একেবারে কোণের দিকে একটা আধুনিক ছাঁদের বাথরুম পিসেমশাই তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন।
আমি হাত-মুখ ধুয়ে শাড়ি-টাড়ি ছেড়ে এলাম।
পিসিমা চা করে দিলেন। তারপর ইতিদির বিয়ের গল্প শুরু হল। কোন বাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল, খাওয়া-দাওয়ার মেনু কীরকম হয়েছিল, বাসি-বিয়ের দিন কী কী মজা হয়েছিল, শয্যা তোলার সময় ভালোমানুষ বরের কাছ থেকে কীভাবে চাপ দিয়ে কড়কড়ে পাঁচশো টাকা আদায় করা হয়েছিল, এইসব।
এর কিছু-কিছু আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে বাবা-মায়ের কাছে শুনেছি। কারণ, ওরা বিয়েতে এসেছিল। তবুও আর-একবার শুনতে খারাপ লাগছিল না।
আমাদের কথাবার্তা হাসি-ঠাট্টায় তিদি ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসছিল। ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে নানান কথা বলছিল। তারপর একসময় আমাকে বিয়ের ফটো দেখাতে বসল।
এসেছিলাম সেই সকাল আটটায়। কখন বেলা বারোটা বেজে গেছে কারও খেয়ালই নেই।
পিসিমা একবার সুকান্তিকে বলেছিলেন, তুই আজ অফিসে বেরোবি না?
সুকান্তি হেসে উঠে বলল, পাগল হয়েছ, মা! অ্যাদ্দিন পর রিমকি এসেছে আর আমি অফিস যাব! প্রণয়কে বলে দেব, ও খবর দিয়ে দেবে। আমার যা ছুটি পাওনা আছে তাতে-দু-চারদিন ডুব মারাটা কোনও ব্যাপার না।
পিসিমা আমাকে স্নান করতে যাওয়ার তাড়া দিতেই সুকান্তি বলল, না, মা। খাওয়ার দেরি আছে। তোমরা বসে গল্প করো–আমি মাংস কিনে নিয়ে আসি। বটতলায় গেলে পেয়ে যাব। আমি তো জানি, রিমকি ছোটবেলা থেকেই মাংসাশী প্রাণী।
সুকান্তি চলে যেতেই পিসিমা আমার অফিসের কথা শুনতে চাইলেন। বিজ্ঞাপন কোম্পানির ধরন-ধারণ পিসিমার একেবারেই অচেনা। তাই বাচ্চা ছেলেকে বোঝানোর মতো করে আমি সব বোঝাতে লাগলাম। বললাম, বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলোর মধ্যে কী কম্পিটিশান। কেন আমাকে কলকাতা ছেড়ে বারবার বাইরে দৌড়াতে হয়।
শ্রুতিদি আমার কথা খুব মন দিয়ে শুনছিল। শোনার পর বলল, তোকে আমার হিংসে হচ্ছে, রিমকি। তোর মতো লাইফ আমার খুব পছন্দ।
পিসিমা একবার অদ্ভুত চোখে বড় মেয়ের দিকে তাকালেন।
আমি শ্রুতিদিকে বললাম, তিদি, সবই নদীর এ পার কহে…। সত্যিকারের সুখ-শান্তি বলতে যা বোঝায় সেটা কারওর নেই। ওটা শুধু খুঁজে বেড়ানোর জিনিস কখনও পাওয়া যায় না।
শ্রুতিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমার হঠাৎই বেশ খারাপ লাগছিল।
খটাখট শব্দে একটা লোকাল ট্রেন চলে গেল।
খোলা জানলা দিয়ে লাইনের ধারের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। কাছেই ইলেকট্রিকের তারে দুটো শালিক বসে রয়েছে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল। জোরালো রোদে কয়েকটা পাতা আয়নার মতো চকচক করছিল।
পিসিমা বললেন, শ্রুতিকে কত বলি, টিউশানি কর–ও করতে চায় না।
টিউশানি আমার ভাল্লেগে না। শ্রুতিদি বলল।
আমি ওকে বললাম, তোমার তো আঁকার হাত ভালো ছিল। হাতের কাজটাজ কিছু করতে পারো…বাটিকের কাজ…।
তিদিন মলিন হাসল। ছোট্ট করে হুঃ… শব্দ করল।
এরপর গল্প আর তেমন জমল না। আমি স্নান করার তোড়জোড় শুরু করলাম। পিসিমাও রান্নাবান্নার ব্যাপারটা দেখতে চলে গেলেন।
.
রাতে সবাই মিলে একসঙ্গে যখন খেতে বসেছি, তখন পিসিমা সুকান্তিকে বললেন, কীরে, কী ঠিক করলি? তুই কি তা হলে একতলার ঘরে শুবি? আর রিমকি তোর ঘরে শোবে?
সুকান্তি খেতে-খেতে মায়ের দিকে তাকাল। জড়ানো গলায় বলল, আমাকে সব লটবহর নিয়ে তাহলে নীচে নামতে হবে। তা ছাড়া আর ব্যাচিলার্স ডেন কি রিমকির ভালো লাগবে? একটু হাসল সুকান্তি।
আমি সাত-তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, একতলায় শুতে আমার কোনও প্রবলেম নেই, পিসিমা।
না, তা না…যদি ভয়-টয় পাস…।
আমি হাসলাম ও চোর-ডাকাত হলে পেতেও পারি। তা ছাড়া আবার ভয় কীসের। আমার একা-একা শোওয়ার অভ্যাস আছে।
সুকান্তি খাওয়া থামিয়ে বলল, রিমকির আই. কিউ. দিন-দিন কমে যাচ্ছে। মা চোর-ডাকাতের ভয়ের কথা বলছে না–বলছে ঘোস্ট প্রবলেমের কথা।
ভূতের ভয়! আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না? পিসিমা, সত্যি…ভূত বলে কিছু থাকলে তবে না তাকে ভয় পাব! ভূত হচ্ছে বাচ্চাদের ভয় দেখানোর জন্যে বড়দের তৈরি একটা মিথ– মিথ্যেও বলতে পারো। আমি তো আর বাচ্চা নই!
