আমি ওকে শুধু বলতাম, রূপশ্রী, যেদিন তোমার হাড়ে হাড়ে অভিজ্ঞতা হবে, সেদিন বুঝবে আমার গল্পগুলো বোগাস-টু-স্টোরি, না শুধু টু-স্টোরি।
সত্যি, বয়েসের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের কত ধ্যানধারণা বদলে যায়। যাকে চিরকাল, নেই বলে ভেবে এসেছি তাকে আছে বলে মেনে নিই। যেসব ঘটনা একসময় হয় না, হতে পারে না বলে বিশ্বাস করতাম, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সে-বিশ্বাস কেমন বদলে যায়–তখন মনে হয়, হয়, হতেও পারে।
কিন্তু আমি কখনওই চাইনি, মর্মান্তিক কোনও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে রিমকির বিশ্বাস বদলে যাক।
অথচ তাই হয়েছিল।
প্রায় বারো বছর পর একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যেতেই বদলে যাওয়া রিমকিকে আমি চিনতে পারলাম। ওর টগবগে সবুজের ওপরে যেন সন্ধ্যার শান্ত ছায়া নেমে এসেছে।
একপাশে সরে গিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার পর একটু সহজ হয়েছিল রিমকি। নরম গলায় বলেছিল, কাকু, শেষ পর্যন্ত আপনিই জিতলেন।
তারপর ওর গল্পটা আমাকে বলেছিল রিমকি–পুরোনো রিমকির ভাষায় বোগাস টু-স্টোরি। আর নতুন রিমকির ভাষায়? কী জানি!
শুরুর কবিতার লাইন দুটোও ওরই মুখে শোনা–গল্প বলার সময় গুনগুন করে আবৃত্তি করেছিল ও। শুনে আমার মনে হয়েছিল, গল্পের সব কথা যেন ওই মারাত্মক দুটো লাইনের মধ্যেই বলা হয়ে গেছে।
রিমকি আমাকে বলেছিল…।
.
আমি বাড়িতে পা দেওয়ামাত্রই একেবারে হইহই শুরু হয়ে গেল।
সুকান্তি একেবারে চেঁচিয়েই উঠল, মা, মা, মঙ্গলগ্রহ থেকে রূপশ্রী এসেছে! শিগগির নেমে এসো!
দোতলা থেকে নামতে নামতে পিসিমা বলে উঠলেন, রূপশ্রী আবার কে!
রূপশ্রী মানে রিমকি। ভুলেও তো আমাদের বাড়িতে আসে না, তাই বললাম মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছে। ও এখন কথায় কথায় হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াচ্ছে বিগ বস। আমাদের আর পাত্তা দেবে কেন! দেখলে না, অত করে আসতে বললে, ছোড়দির বিয়েতেও এল না!
আমি সুকান্তিকে ধমকে উঠলাম, তুই থামবি! নাকে অক্সিজেনের নল গুঁজে নেনইলে বকবক করে হাঁফিয়ে পড়বি।
পিসিমা ততক্ষণে নীচে নেমে এসেছেন।
পরনে সাদা থান, গলায় সরু চেন, হাতে দু-গাছা চুড়ি, চোখে চশমা। মাথার চুলে বেশ পাক ধরেছে। বয়েস কত হবে এখন? মনে-মনে হিসেব করলাম। ষাট পেরিয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। অথচ টকটকে ফরসা রং এতটুকু মলিন হয়নি। এখনও দারুণ সুন্দরী। ঠিক যেন দেবীপ্রতিমা। শুনেছি, পিসেমশাই পিসিমার রূপ দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। সে কথা বুড়ো বয়েসেও বারবার বলতেন। আরও বলতেন, পিসিমা আগে চলে গেলে সেকষ্ট তিনি সইতে পারবেন না। ভগবান বোধহয় পিসেমশায়ের মনের কথা শুনতে পেয়েছিলেন। তাই সময় হওয়ার অনেক আগেই ওঁকে ডেকে নিয়েছেন।
রিমকিকে রূপশ্রী বললে কখনও চিনতে পারি! পিসিমা হেসে বললেন। তারপর আমাকে জিগ্যেস করলেন, কী রে, ইতির বিয়েতে এলি না কেন?
আমি কাঁধের ব্যাগটা বাঁ-হাতে সামলে ঝুঁকে পড়ে ঢিপ করে পিসিমাকে একটা প্রণাম করলাম।
পিসিমা আমার চিবুক ছুঁয়ে ঠোঁটে সে-আঙুল ছোঁয়ালেন : ইতি বারবার তোর কথা বলছিল…।
কী করব, পিসিমা। একটা কনফারেন্সে ব্যাঙ্গালোর যেতে হয়েছিল।
সুকান্তির দুই দিদি ও বড়দি শ্রুতি, আর ছোড়দি ইতি। তিদি নাকি অনেকদিন আগেই পিসিমাকে জানিয়ে দিয়েছে ও বিয়ে করবে না। কেন তা খুলে বলেনি। পিসিমাই আমাকে এ কথা বলেছিলেন। তখন পিসিমার মুখ দেখে আমার মনে হয়েছিল পিসিমা সবই জানেন, কিন্তু আমাকে বলতে চাইছেন না। পরে অবশ্য কানাঘুষোয় আমি অনেকটাই জেনেছি।
ইতি আমার চেয়ে বছরতিনেকের বড়। আর সুকান্তি আমার পিঠোপিঠি। তাই সুকান্তির সঙ্গেই আমার আজ্ঞা বেশি জমে। পিসিমা সবসময় সবাইকে বলেন, রিমকি আর সুকান্তি এক জায়গায় হলেই সেখানে হইহই করে হাট বসে যায়। কী করে যে ওরা এত বকবক করতে পারে সে ওরাই জানে।
আমাকে সঙ্গে নিয়ে সুকান্তি আর পিসিমা দোতলায় উঠল।
উঠেই দেখি, বাঁ-দিকের বড় বেডরুমটায় তিদি বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। দক্ষিণের খোলা জানলা দিয়ে ছুটে আসা এলোমেলো বাতাস খবরের কাগজের পৃষ্ঠাগুলোকে পাগল করে দিচ্ছিল। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিদির চুল উড়ছিল। তিদি কাগজের পৃষ্ঠাগুলোকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
আমাকে দেখে কাগজ থেকে মুখ তুলে সামান্য হাসল তিদি : কী রে, রিমকি, কেমন আছিস?
ওকে দেখে মনে হল ভোরবেলাতেই স্নান সেরে নিয়েছে।
শ্রুতিদি পিসিমার মুখ পেয়েছে। ফরসা, রোগা। দেখলে একটু অসুস্থ বলে মনে হয়। আগে এরকম ছিল না। বোধহয় কানাঘুষোয় শোনা সেই বিচ্ছিরি ব্যাপারটার পর এরকম হয়ে গেছে। সব ব্যাপারেই কীরকম যেন ঠান্ডা–উৎসাহ উদ্দীপনার ছিটেফেঁটা নেই কোথাও।
আমি বললাম, তুমি কেমন আছ?
আবার সামান্য হাসি। তারপর ইতির বিয়েতে না আসা নিয়ে আর-এক প্রস্থ অনুযোগ।
ঘরে ঢুকে সবে একটা চেয়ারে বসে হাঁফ ছেড়েছি, পিসিমা বললেন, এবার তোকে ছাড়ছি না–দু-চারদিন থেকে যেতেই হবে। সুকান্তি রথীনকে আর শোভাকে ফোন করে খবর দিয়ে দেবে।
আমি হেসে বললাম, আমার উত্তর শুনলে তোমরা ফ্ল্যাবারগাস্টেড হয়ে যাবে।
ফ্ল্যাবারগাস্টেড মানে কী রে? সুকান্তি জিগ্যেস করল।
এ-ও জানিস না! হতবাক, হতভম্ব।
পিসিমা বললেন, তা হতবাক হয়ে যাওয়ার মতো উত্তরটা শুনি।
