একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, লাইন ছেড়ে দাও।
কথা-বলা-টেলিফোন লাইন কেটে দিয়ে বলল, ধন্যবাদ।
*
দু-সপ্তাহের মধ্যেই অঙ্গলাবণি স্নিগ্ধপ্রভাতের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। ও চোখের আড়াল হলেই স্নিগ্ধপ্রভাতের অন্তরে অসহায় পিপাসা জেগে ওঠে। এক অদ্ভুত টান ওকে অঙ্গলাবণির পরাধীন করে তোলে। সে-কথা একদিন, এক দুর্বল মুহূর্তে অঙ্গলাবণিকে বলেও ফ্যালে।
ইলেকট্রনিক অরগ্যানের মতো মিষ্টি শব্দের ঢেউ খেলিয়ে হেসে ওঠে অঙ্গলাবণি। তারপর বলে, এ কী ছেলেমানুষি! ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে তোমার এই ইলিউশানের কথা বলতে হবে।
ইলিউশান! মায়া! তোমাকে মনে-মনে চাওয়াটা স্রেফ মায়া! সত্যি নয়?
কী জানি! ডক্টর হয়তো তা-ই বলবেন।
এই যে তোমাকে ছুঁতে না পেলে আমার মন কষ্ট পাচ্ছে–এটাও মায়া?
হতেও তো পারে।
আচমকা স্নিগ্ধপ্রভাত অঙ্গলাবণির দিকে ঝুঁকে পড়ল। আকুলভাবে জড়িয়ে ধরল ওকে। এবং ঠোঁটে চুমু খেল।
এক আশ্চর্য উত্তাপ এক শরীর থেকে অন্য শরীরে বয়ে গেল। উত্তাপ না হয়ে সেটা বিদ্যুৎ তরঙ্গও হতে পারে।
দুটো শরীর গলতে শুরু করল। কেউই আর নিজের আয়ত্বে ছিল না। মন যা-যা চাইছিল শরীর তা-ই করতে শুরু করল।
এতদিন ধরে যে-সংযম দুজনে মেনে চলছিল একটি মুহূর্তে সেটা মিথ্যে হয়ে গেল।
একসময়, খানিকটা শান্ত হওয়ার পর, স্নিগ্ধপ্রভাত বলে ফেলল, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।
সুপর্ণলতিকা?
অসম্ভব।
হাসল অঙ্গলাবণি। বলল, আমার অবস্থাটাও একইরকম। এখন বুঝলাম তোমার মধ্যে কতরকম অস্থির পাগলামি লুকিয়ে আছে। শোভনসুন্দর কখনও আমাকে এরকম পাগলের মতো আদর করেনি।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কাছ থেকে সরে এল অঙ্গলাবণি। বলল, ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে একটা ফোন করি।
সেকথা শুনতে পেয়ে কথা-বলা-টেলিফোন বলে উঠল, নাম্বার বলো–।
নম্বর বলল অঙ্গলাবণি। এবং ও-প্রান্তে ফোন বাজতে শুরু করল।
ডক্টর ফোন ধরতেই ঘরের দেওয়ালের একটা অংশ টিভির পরদা হয়ে গেল। সেখানে ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে দেখা গেল।
হাউ আর য়ু, মাই লেডি?
ফাইন। আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আপনাকে এখুনি একবার আমার ফ্ল্যাটে আসতে হবে।
কেন, কী হয়েছে?
খুব সিরিয়াস ব্যাপার। আপনি এলে পর বলব।
নীতিনপ্রকাশ হাসলেন কী, আমার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে?
জানি না। আপনি এলে সব বলব।
টেলিফোন শেষ হয়েছে বলে ফোন ছেড়ে দিল অঙ্গলাবণি। টেলিফোন ওকে যথারীতি ধন্যবাদ জানাল।
টেলিফোনের কথাবার্তা শুনে স্নিগ্ধপ্রভাত একটু অবাক হয়েছিল।
ওর যেন মনে হচ্ছিল, ডক্টর নীতিনপ্রকাশ আর অঙ্গলাবণির মধ্যে কী এক গোপন খেলা চলছে। আর সে-খেলাটা ওকে নিয়েই।
তা হলে কি নীতিনপ্রকাশই শোভনসুন্দর? আড়ালে থেকে পরকীয়া সহবাসের ওপরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন? যদি তাই হয়, তা হলে মানতেই হবে, এ বড় নিষ্ঠুর পরীক্ষা।
নিজেকে গিনিপিগ ভাবতে স্নিগ্ধপ্রভাতের বেশ খারাপ লাগল।
কীসের এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে, অঙ্গলাবণি?
উত্তর না দিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। বলল, ডক্টর এলেই সব জানতে পারবে।
.
ডক্টর নীতিনপ্রকাশ চেয়ারে বসে কৌতুকভরা চোখে তাকিয়ে ছিলেন স্নিগ্ধপ্রভাতের দিকে। ওঁকে ঠিক টিভি-পরদার রঙিন ছবির মতোই লাগছিল।
অঙ্গলাবণি তিনজনের জন্য কফি আর বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকল। ওঁদের সামনের টেবিলে সেগুলো সাজিয়ে দিয়ে ইশারায় চুমুক দিতে বলল। তারপর নিজে একটা কাপ তুলে ঠোঁটে ছোঁয়াল। সেই ঠোঁট, যেখানে স্নিগ্ধপ্রভাতের ঠোঁটের ছোঁয়া লেগে আছে।
কফিটা কেমন হয়েছে? ডক্টর স্নিগ্ধপ্রভাতকে জিগ্যেস করলেন।
দারুণ! মুখে তৃপ্তির শব্দ করল স্নিগ্ধপ্রভাত।
আপনি কেমন আছেন?
বেশ অবাক হয়ে নীতিনপ্রকাশের চোখে তাকাল স্নিগ্ধপ্রভাত : কেন, ভালোই তো আছি!
আমরাও তা-ই চাই। হাসলেন ডক্টর।
তারপর চশমাটা চোখ থেকে খুলে কাচদুটোয় মুখের ভাপ দিলেন। জামার আস্তিনে ঘষে কাচদুটো পরিষ্কার করলেন।
চশমা না থাকায় নীতিনপ্রকাশের চোখদুটো ছোট-ছোট দেখাচ্ছিল।
স্নিগ্ধপ্রভাত, আপনাকে আজ আমি একটা নতুন টেকনোলজির কথা শোনাব–এম. এম. টেকনোলজি। যার পুরো নাম হল মেমোরি ম্যাপিং টেকনোলজি। এই টেকনোলজি দিয়ে আমাদের মেমোরিকে–মানে, স্মৃতিকে বদলে দেওয়া যায়।
তার মানে!
তার মানে আর কিছুই না… চশমাটা নেড়েচেড়ে ঠিকঠাক করে চোখে বসালেন নীতিনপ্রকাশ : আমাদের স্মৃতি হচ্ছে অনেকটা সাদা কাগজে পেনসিলের দাগের মতো। ব্রেনের কোটি কোটি নিউরোনের মধ্যে স্মৃতি বাসা বেঁধে থাকে। আমাদের এই নতুন টেকনোলজি কাগজে আঁকা পেনসিলের দাগ সহজেই মুছে ফেলতে পারে, এবং এঁকে দিতে পারে নতুন পেনসিলের দাগ। আই মিন, টোটাল মেমোরির নানান অংশ আমরা খুশিমতো মুছে দিতে পারি। আবার আমাদের পছন্দমতো তৈরি করা মেমোরি–মানে, ফ্যাব্রিকেটেড মেমোরি প্রিন্ট করে দিতে পারি আপনার মগজে। হাসলেন নীতিনপ্রকাশ : ইন ফ্যাক্ট আমি তাই করেছি। আপনার ওয়াইফ সুপর্ণলতিকার চেহারা আর আচরণের যে-স্মৃতি আপনার মেমোরিতে ছিল সেটা আমি টোটালি ইরেজ করে দিয়েছি। সেইজন্যেই নতুন এক লোকালিটির নতুন এই ফ্ল্যাটে ওকে দেখে আপনি চিনতে পারেননি। ওকে আপনি অন্য কারও স্ত্রী অঙ্গলাবণি বলে মেনে নিয়েছেন…।
স্টপ ইট, ডক্টর! চিৎকার করে উঠল স্নিগ্ধপ্রভাত, প্লিজ ডোন্ট টক রাবিশ!
