ও অবাক হয়ে খেয়াল করল, এতক্ষণে এই প্রথম ওর সুপর্ণলতিকার কথা মনে পড়ল। বাড়ি ফেরার জন্য ওর এতটুকুও মন টানল না।
আপনার বউয়ের কথা বলুন। সুপর্ণলতিকা নামটা কিন্তু দারুণ! অঙ্গলাবণিকে খুশি-খুশি দেখাল।
হ্যাঁ, দারুণ নাম–তবে অঙ্গলাবণির কাছে কিছু নয়।
ওঁর কথা বলুন। কেমন মানুষ আপনার ওয়াইফ?
ভালো। কিছুক্ষণ চুপচাপ খেতে লাগল স্নিগ্ধপ্রভাত। তারপর অনেকটা বোধহয় শোভনসুন্দরের মতো।
অঙ্গলাবণি মুখ নামাল।
আপনাকে আর-একটুকরো মাছ দিই…।
দিন।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কেমন অদ্ভুত লাগছিল। ঘরে ফেরার কোনও তাড়া নেই। ফিরতে ইচ্ছেও করছে না। বরং মনে-মনে ও একটা অ্যাডভেঞ্চার চাইছে। আর নিজেকে বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে।
আচ্ছা, সুপর্ণলতিকাকে কেমন দেখতে? কাল বিকেলে ও কী যেন বলেছিল? দুটো ফ্লোট্যাক্সির অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে…কোন স্পেস কো-অর্ডিনেটে যেন…?
নাঃ, ভালো করে কিছু মনে পড়ছে না।
মাথার ভেতরে টিপটিপ করে যন্ত্রণার একটা ধারা অবিরাম বয়ে চলেছিল। মাঝে-মাঝে অস্থির হয়ে ব্যথাটা জানান দিচ্ছিল।
.
একদিন দু-দিন করে তিনটে দিন পেরিয়ে গেল। শুয়ে-বসে অলস গল্প করে ওদের সময় কাটতে লাগল।
তিনদিনে স্নিগ্ধপ্রভাত পুরোপুরি সেরে উঠেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর এখানে থেকে যেতে মন চাইছিল। অথচ লজ্জায় সংকোচে অঙ্গলাবণিকে সেকথাও বলতে পারছিল না।
চারদিনের দিন অঙ্গলাবণি ওকে বলল, আপনি এখন ভালোই আছেন। আজ থেকে আমার অফিস যাওয়া শুরু। আপনি এই ফ্ল্যাটের পাহারায় রইলেন। কী, কোনও আপত্তি নেই তো!
না, আপত্তি নেই। তবে একা-একা থাকতে বোর লাগবে।
সেকী? শোভনসুন্দর তো উলটো কথা বলেছিল আমাকে। আমার সঙ্গে দোকা থাকতে থাকতে ও বোর হয়ে গিয়েছিল। হাসল অঙ্গলাবণি।
আমি আমার কথা জানি–অন্যেরটা জানি না। তাই আমারটাই বললাম। নাকি আপনি বোর হয়ে যাচ্ছেন?
না, না ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ শেষ করছিল অঙ্গলাবণি। আয়নার মধ্যে দিয়ে স্নিগ্ধপ্রভাতের দিকে তাকিয়ে বলল, জানেন, আমার অফিস-বসটা একটা রোবট। কাজ ছাড়া আর কোনও নেশা নেই। এমনকী আমার দিকে মুখ তুলে একপলক তাকায় না। মানে, যখন তাকায় তখন শুধু কাজের কথাই বলে।
আমি কিন্তু সেরকম না। বরং বেশ দুর্বল মানুষ।
অঙ্গলাবণি আয়নায় হাসল।
আয়নাটা অ্যান্টিক। সুন্দর কারুকাজ করা।
সেদিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, দারুণ!
সাজতে-সাজতে ভুরু তুলল অঙ্গলাবণি : আয়নাটা?
–আয়নার ছায়াটা। আপনার ইমেজটা।
এটা কিন্তু ভারচুয়াল ইমেজ। একে আঙুলে ছোঁয়া যায় না। হাসল ঠোঁটের কোণে।
ভারচুয়াল ইমেজ থেকেই একদিন রিয়েল ইমেজে পৌঁছে যাব। তারপর সেখান থেকে অবজেক্টে। তখন ছুঁতে কোনও অসুবিধে হবে না।
ভারচুয়াল রিয়েলিটি কিন্তু সত্যি নয়।
সত্যি না হোক সত্যির কাছাকাছি তো বটে! তাতেই আমার সাধ মিটবে।
এত অল্পেতেই আপনি খুশি?
হ্যাঁ। ঘাড় কাত করে বলল মিগ্ধপ্রভাত, আসলে চেয়েছিলামই তো অল্প! তাই অল্প পেলেই খুশি। কিন্তু পেলাম কই!
দাঁড়ান, অফিস থেকে ফিরে এসে আপনার এই ফিলিংটা অ্যানালিসিস করতে হবে।
ঠিক তখনই কথা-বলা-টেলিফোন মিষ্টি ধাতব গলায় বলে উঠল, ফোন এসেছে–ফোন ধরো।
অঙ্গলাবণি ধরছি বলতেই ঘরের দেওয়ালের একটা অংশ টিভির পরদা হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল একজন প্রৌঢ়ের রঙিন মুখ।
চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা। গালে ধপধপে সাদা চাপদাড়ি। মাথায় ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল। নাকের নীচে সাদা পুরু গোঁফ। তারই আড়ালে একচিলতে হাসি।
কেমন আছ, অঙ্গলাবণি?
এখনও পর্যন্ত ভালোই, ডক্টর–।
কোনও কমপ্লেন নেই?
না–একটুও না।
দ্যাখো, পেশেন্টকে আমি কিন্তু পুরোপুরি তোমার হাতে ছেড়ে দিয়েছি। হি ইজ অল ইয়োর। কোনও প্রবলেম হলে বলবে। আর কদিন যাক–তারপর তোমার বাড়িতে একদিন চা খেতে যাব।
ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম, ডক্টর।
ও.কে., সি ইউ দেন…।
পরদার ছবি মিলিয়ে গেল।
অঙ্গলাবণি বলল, টেলিফোন শেষ হয়েছে।
সঙ্গে-সঙ্গে পরদাটাও মিলিয়ে গেল। দেওয়ালটা আবার দেওয়ালের মতো হয়ে গেল। কথা বলা-টেলিফোন বলল, ধন্যবাদ।
এবার স্নিগ্ধপ্রভাতের দিকে ফিরে তাকাল অঙ্গলাবণি? উনি ডক্টর নীতিনপ্রকাশ। তোমার চিকিৎসা করছেন…।
স্নিগ্ধপ্রভাত হাসল ও ভুল বললে। আমি এখন তোমার চিকিৎসায় আছি।
অনেক পরে, অঙ্গলাবণি টা-টা করে অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর, স্নিগ্ধপ্রভাতের খেয়াল হল ওরা হঠাৎই আপনি থেকে তুমি-তে নেমে এসেছে। কিন্তু এরকম হঠাৎ নেমে এলেও ওরা কেউই কোনও হোঁচট খায়নি।
আচ্ছা, এটা কি নামা, না ওঠা?
অঙ্গলাবণি চলে যাওয়ার পর স্নিগ্ধপ্রভাতের মনখারাপ লাগছিল। এত বড় শৌখিন ফ্ল্যাটে ভীষণ একা-একা লাগছিল।
সুপর্ণলতিকাকে একটা ফোন করলে কেমন হয়! কী করছে ও এখন?
সুতরাং ডাইনিং হলে টেলিফোনের কাছে গিয়ে ও বলল, একটা ফোন করব।
বলামাত্রই টেলিফোন জবাব দিল, কত নাম্বার বলো…।
নম্বরটা ঠিকমতো মনে পড়ছিল না। কেমন যেন ঝাপসা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মিগ্ধপ্রভাতের মাথা টিপটিপ করছিল।
শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে একটা নম্বর বলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
নম্বরটা বলা শেষ হতে-না-হতেই ও-প্রান্তে রিং বাজতে শুরু করল।
রিং হয়েই চলল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করা সত্ত্বেও কেউ ফোন ধরল না। নিশ্চয়ই সুপর্ণলতিকা বাড়িতে নেই কোথাও বেরিয়েছে। অথবা নম্বরটাই ভুলভাল হয়েছে।
