ডক্টর নীতিনপ্রকাশ মুচকি মুচকি হাসছিলেন। আর অঙ্গলাবণি নাকি সুপর্ণলতিকা?– আড়চোখে মিগ্ধপ্রভাতকে দেখছিল।
আপনি এই নতুন পরিচয়কে বিশ্বাস করেছেন। আমি ফ্ল্যাটে আসামাত্রই অঙ্গলাবণি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে সব কথা বলেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেই আপনি ওকে বলেছেন : তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। যে-মুহূর্তে আপনি একথা বলেছেন সেই মুহূর্তেই আমার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে। আপনাদের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া সম্পর্ক আবার বেঁচে উঠেছে। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন, আই হ্যাভ রিপেয়ারড আ শ্যাটার রিলেশনশিপ। নীতিনপ্রকাশ কৌতুকের চোখে তাকালেন সুপর্ণলতিকার দিকে কী বলো, অঙ্গলাবণি?
স্নিগ্ধপ্রভাতের সবকিছু কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। ওই তো বসে রয়েছে অঙ্গলাবণি! কী সুন্দর ওর বসার ভঙ্গি! কী সুন্দর শান্ত ওর ভালোবাসা মাখানো মুখ! ও যে আসলে সুপর্ণলতিকা সেটা জানার পরেও স্নিগ্ধপ্রভাতের টানটা কমছে না কেন? এম. এম. টেকনোলজি কি এতই অদ্ভুত!
সুপর্ণলতিকার দিকে ফিরে হাসলেন নীতিনপ্রকাশ ও কী, এবারে তুমি খুশি তো! এবারে শুরু হোক তোমাদের মোস্ট হ্যাপি কনজুগাল লাইফ। যদি আবার কখনও বোর হয়ে যাও আমাকে শুধু একটা ফোন করে দিয়ো। তোমার মাথা থেকে হাজব্যান্ডের মেমোরি ম্যাপ বদলে দিয়ে ভালোবাসায় টইটম্বুর নতুন এক হাজব্যান্ড ফিরিয়ে দেব। আমার রিসার্চ টিমের লোকজন ওঁকে ফুঁ দিয়ে অ্যানেসথেসিয়া করে আবার তুলে নিয়ে আসবে আমার ল্যাবে। তারপর একটু এম. এম. টেকনোলজি–ব্যস, তার পরই পুরোনো মানুষটা একেবারে নতুন হয়ে যাবে।
স্নিগ্ধপ্রভাতের ঘোর তখনও কাটেনি। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল নীতিনপ্রকাশের দিকে।
নীতিনপ্রকাশ হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধপ্রভাতের হাত চেপে ধরলেন। হেসে বললেন, ঘাবড়াবেন, স্নিগ্ধপ্রভাত। যদি সুপর্ণলতিকা মানে, এই অঙ্গলাবণি– আঙুল তুলে অঙ্গলাবণিকে দেখালেন তিনিঃ বোর হয়ে যায়, তা হলে আপনিও আমাকে কনট্যাক্ট করতে পারেন। তখন স্নিগ্ধপ্রভাতকে পালটে রাজসম্রাট করে ওর কাছে আমি হাজির করব। হাসলেন ডক্টর ও সমাজের যে-কোনও স্বামী-স্ত্রীর প্রবলেম সম্ভ করার জন্যে আমি এবং আমার এম. এম. টেকনোলজি সবসময় হাজির। অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস। আমার ফোন নাম্বার আর ফিজের ব্যাপারটা আপনি পরে আপনার স্ত্রীর কাছ থেকে জেনে নেবেন। তবে মনে হয়, তার আর দরকার হবে না। নীতিনপ্রকাশকে স্নিগ্ধপ্রভাতের দেবতা বলে মনে হচ্ছিল।
ভুলোমন ভুলোদা
মায়ের মুখে কথাটা শুনে আমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেল। ভুলোদার সঙ্গে নেমন্তন্নে যাওয়া!
ওরে বাবা, সে আমি পারব না! মউ পাশেই দাঁড়িয়েছিল। হাততালি দিয়ে বলল, ঠিক হয়েছে, ভুলোদার সঙ্গে গেলে মজাটি টের পাবে।
আমার মুখে একটা হতাশ ভাব ফুটে উঠেছিল। হয়তো সেটা লক্ষ করেই মা বললেন, ভয় কী রে! তুই তো ভুলোর সঙ্গে-সঙ্গেই থাকবি। দরকার হলে ওকে খেয়াল করিয়ে দিবি।
মউ এখনও আমার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। মা ওকে ধমক দিয়ে বললেন, দাদার সঙ্গে ফাজলামো হচ্ছে! চল, পড়তে বসবি।
মা ওকে নিয়ে পড়াতে বসলেন। কাল মউয়ের ইংরেজি পরীক্ষা। আমার অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত পরশু। আর তার জন্যেই পড়তে হল এমন বিপদে। কারণ পরীক্ষা শেষ না হলে ভুলোদার সঙ্গে নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠত না। এ যেন অ্যানুয়াল পরীক্ষার চেয়েও কঠিন পরীক্ষা।
ভুলোদাকে এ-পাড়ার প্রায় সব্বাই ভয় পায়। বিশেষ করে আমি। কারণ, সে সব কিছু শুধু ভুলে যায়। আর এই ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটে যখন-তখন। একবার নাকি রাত দেড়টার সময় উঠে হাত-মুখ ধুয়ে চেঁচিয়ে পড়তে বসে গিয়েছিল। বাড়ির সবাই তো জেগে উঠেছে ভুলোদার ভারী গলার চিৎকারে। তারপর তাকে জিগ্যেস করে জানা গেল, তখন যে রাত সেটা ভুলোদা ভুলে গেছে। ভেবেছে ভোর হয়েছে, তাই হাত-মুখ ধুয়ে পড়াশোনায় মন দিয়েছে।
ভুলোদার আসল নাম বিপ্রদাস সরকার। আমার বড়মাসির ছেলে। থাকে আমাদের বাড়ির পাঁচটা বাড়ি পরে। তার ওই ভুলো মনের কাণ্ডকারখানা দেখে কবে যে ভুলো নামটা চালু হয়ে গেছে জানি না। এখন তার আসল নামটাই বেশ কষ্ট করে মনে রাখতে হয়।
ভুলোদা আমার চেয়ে চার বছরের বড়। গত বছরে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। এত ভুললামন নিয়ে কী করে যে ঠিক-ঠিক উত্তর লিখতে পারল, কে জানে! সবাই যখন একথা জিগ্যেস করে তখন ভুলোদা বলে, কী জানি ভাই, ওই একবারই হয়তো ভুল করে ঠিক-ঠিক উত্তর লিখে ফেলেছি।
হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর ভুলোদা কলেজে ভরতি হয়েছে। একইসঙ্গে আবার ব্যায়াম করতে শুরু করেছে। মাঝে-মাঝে বলে, পড়তে ভালো লাগছে না–অথচ সময় পেলেই আমাকে পড়া-টড়া দেখিয়ে দেয়। এমনিতে ভুলোদা সত্যি খুব ভালো। শুধু ওই ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটুকু ছাড়া।
আজকের নেমন্তন্ন ছোটমাসির ছেলের মুখে-ভাত উপলক্ষ্যে। বাবা অফিসের কাজে কলকাতার বাইরে। মা মউকে পড়াতে ব্যস্ত থাকবেন। একমাত্র আমিই পরীক্ষার পাট চুকিয়ে খেলাধুলো নিয়ে মেতে আছি। অতএব আমাকেই যেতে হবে। যেতে রাজিও ছিলাম। কারণ, জানতাম বড়মাসির বাড়ির অনেকে যাবে। কিন্তু একটু আগেই মায়ের মুখে শুনলাম, ওরা কেউ যেতে পারবে না। কীসব ঝামেলায় পড়ে গেছে। যাওয়ার লোক বলতে রয়েছে শুধু ভুলোদা। ব্যস, এখন আর আমার নিস্তার নেই।
