স্নিগ্ধপ্রভাত যখন পুরো বুঁদ হয়ে গেছে ঠিক তখনই একজন অচেনা লোক ওকে ডেকে নিয়ে গেছে ক্যাসিনোর বাইরে। বলেছে, কে একজন যেন একটা ইমার্জেন্সি খবর এনেছে মিগ্ধপ্রভাতের জন্য।
বাইরে বেরিয়ে একটা আলো-আঁধারি জায়গায় ওকে ডেকে নিয়ে গিয়ে লোকটা হঠাৎই স্নিগ্ধপ্রভাতের নাক লক্ষ্য করে ফুঁ দিয়েছে।
সঙ্গে-সঙ্গে একটা তীব্র কটু গন্ধ স্নিগ্ধপ্রভাতের নাকে ঢুকে গিয়েছিল। তারপর ওর আর কিছু মনে নেই।
আমি এখানে কেমন করে এলাম? অনেকক্ষণ পর ভেতরের প্রশ্নটা বাইরে বেরিয়ে এল।
রাস্তায় আপনি সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলেন। আমি তুলে নিয়ে এসেছি। আপনার পকেটের জিনিসপত্র সব ওই টেবিলটার ড্রয়ারে আছে।
আঙুল তুলে একটা টেবিলের দিকে দেখাল অঙ্গলাবণি। তার পাশেই একটা ভোলা জানলা। তার কাচের শার্সিতে ভোরের রোদ। আর জানলার বাইরে কঁকড়া গাছে দুটো বুলবুলি। অকারণেই ডাকছে।
বুলবুলি দুটোকে কেমন যেন চেনা মনে হল।
কোথায় পড়ে ছিলাম আমি?
চার নম্বর সুপারওয়ের ওপরে।ফানল্যান্ড সাইবার ক্যাসিনোর পাশের একটা অন্ধকার জায়গায়…।
একটু সময় নিল স্নিগ্ধপ্রভাত। তারপর আলতো গলায় কাল রাতের ব্যাপারটা যেটুকু মনে ছিল বলল।
আপনি খুব জোর বেঁচে গেছেন। এই কায়দায় লুঠপাট করাটা এখন ভীষণ বেড়ে গেছে।
আপনার জন্যেই বেঁচে গেছি..। কৃতজ্ঞতার সুরে বলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
হাসল অঙ্গলাবণি। কিছু বলল না। আয়ত চোখ মেলে স্নিগ্ধপ্রভাতকে দেখতে লাগল।
আপনি ছাড়া এ-ফ্ল্যাটে আর কে-কে থাকে?
আবার হাসল : কেউ না। আমি একা। তারপর কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল, চলুন, হাত-মুখ ধোবেন চলুন–
অঙ্গলাবণির কথাবার্তায় কেমন যেন অধিকারের ভাব। কিন্তু স্নিগ্ধপ্রভাতের ভালো লাগল। ওর ভেতরে-ভেতরে বোধহয় বহুদিনের একটা আর্তি ছিল যে, কেউ ওকে অধিকার করুক। বাইরে থেকে নয়–ভেতর থেকে।
স্নিগ্ধপ্রভাত অঙ্গলাবণির মুখের রেখাগুলো পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
অচেনা এক পুরুষকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার ব্যাপারে কোনও দ্বিধা বা সংশয়ের ছাপ নেই। বরং কোথায় যেন একটা কৌতুক ও কৌতূহল কাজ করছে।
হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল মিগ্ধপ্রভাত। অঙ্গলাবণির দেওয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে হেসে বলল, আপনি খুব পরোপকারী…।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল অঙ্গলাবণি : আপনি যেরকম ভাবছেন সেরকম নয়। নেহাত চাকরি ছাড়া আর কোনও কাজ নেই, তাই…। এই যেমন আপনার জন্যে কদিন অফিস ছুটি নিয়েছি…।
নতুন এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে দিনটা কাটতে লাগল। কোনও কাজ নেই–শুধু বিশ্রাম আর আরাম। সেইসঙ্গে অঙ্গলাবণির মধুর শাসন, দু-একটা এলোমেলো কথা। স্নিগ্ধপ্রভাতের বেশ লাগছিল।
ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে ওদের কথা হচ্ছিল।
কাচের জানলায় রোদ এখন চড়া হয়েছে। আকাশ সকালের নীল থেকে চোখ-ধাঁধানো সাদাটে হয়ে গেছে।
মিউজিক সিস্টেমে হালকা সুর বাজছিল। তাতে কেমন একটা মিষ্টি আমেজ তৈরি হয়ে যাচ্ছিল।
একা-একা এতবড় ফ্ল্যাটে থাকেন…ভয় করে না?
যত না ভয় তার চেয়ে বেশি মনখারাপ লাগত।
আপনি কি সারাজীবন একা না কি? কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই আছে…।
জীবনের শুরুতে মা-বাবা-ভাই-বোন ছিল। তারপর স্বামী। আর তারপর…একা আমি।
আপনার হাজব্যান্ড এখন কোথায়?
এ-থ্রি সিটিতে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে আছে। বছরখানেক হল আমাদের কাটাকুটি হয়ে গেছে।
কাটাকুটি! শব্দটা কেমন যেন কানে বাজল।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কপালে বোধহয় প্রশ্নের ভাঁজ পড়েছিল। সেটা লক্ষ করে অঙ্গলাবণি বলল, না–ডিভোর্স হয়নি। অফিসিয়ালি ডিভোর্স পেতে এখনও বছরদুয়েক বাকি।
কথাটা বলে তেতো হাসল। স্নিগ্ধপ্রভাতের পাতে আরও একটু তরকারি দিল।
মুখে ভাত নিয়ে জড়ানো গলায় স্নিগ্ধপ্রভাত জিগ্যেস করল, আপনাকে ছেড়ে চলে গেল কেন?
ও ভীষণ বোর হয়ে গিয়েছিল। বলত, আমাদের ভালোবাসা নাকি ফুরিয়ে গেছে। এর পর তো আর একসঙ্গে থাকার কোনও মানে হয় না!
দারুণ!
অঙ্গলাবণি অবাক হয়ে স্নিগ্ধপ্রভাতের চোখে তাকাল।
স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, রান্নাটা দারুণ হয়েছে। তারপর ও কী নাম আপনার হাজব্যান্ডের?
জেনে কী হবে!
তবু…জানতে ইচ্ছে করছে।
শোভনসুন্দর…।
নামটা চমৎকার–তবে মানুষটা নয়।
কী করে বুঝলেন?
আপনাকে ভালোবাসতে চায়নি, তাই।
হাসল অঙ্গলাবণি : আমারও তো অনেক দোষ থাকতে পারে! চট করে কারও সাইড নেওয়া ঠিক নয়।
আপনার সাইড নিতে আমার ভালো লাগছে। এটা কিন্তু খোশামোদ নয়। আসলে প্রত্যেকের মনের ভেতরে ভালো লাগার একটা সুইচ আছে। ওটা যখন-তখন কোনও লজিক ছাড়াই অন-অফ হয়। আপনার বেলায় অন হয়ে গেছে।
খেতে-খেতেই হেসে গড়িয়ে পড়ল অঙ্গলাবণি। হাসি থামলে পর বলল, সত্যি, আপনি এক অদ্ভুত মানুষ!
শোভনসুন্দর। নামটা মনে-মনে বিড়বিড় করল স্নিগ্ধপ্রভাত। অঙ্গলাবণি আর শোভনসুন্দরের জীবনে ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে।
স্নিগ্ধপ্রভাত অবাক হয়ে যাচ্ছিল। অঙ্গলাবণির জীবনের সঙ্গে ওর এত মিল! কোন বিচিত্র এক দুর্ঘটনা দুজন সমান্তরাল মানুষকে একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ স্নিগ্ধপ্রভাতকে খুঁটিয়ে লক্ষ করল অঙ্গলাবণি। তারপর আলতো করে ছুঁড়ে দিল একটি প্রশ্ন : আপনার বাড়িতে কে কে আছে?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্নিগ্ধপ্রভাতের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুকের ভেতরের প্রবল চাপটা শূন্য হয়ে গেল। মুখ সামান্য নীচু করে ও বলল, সুপর্ণলতিকা–আমার ওয়াইফ।
