সুপর্ণলতিকাকে বিয়ে করার সময় আট বছরের নিয়মটা আটশো বছরের হলেও স্নিগ্ধপ্রভাতের কোনওরকম আপত্তি ছিল না। তীব্র ভালোবেসে ও সুপর্ণলতিকাকে বিয়ে করেছিল। ওকে ভালোবেসে স্নিগ্ধপ্রভাত বুঝতে পেরেছিল, এই ভয়ংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগেও ভালোবাসার ব্যাপারটা একইরকম রয়ে গেছে। এই প্রবল টানকে বিজ্ঞান এখনও ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
কিন্তু তার পরের ঘটনাগুলোকেও স্নিগ্ধপ্রভাত ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারেনি। বিয়ের দু-আড়াই বছর উদ্দাম মাতামাতির পর সবকিছু কেমন ধীরে-ধীরে বদলে গেল। বিকেল থেকে আকাশের রং পালটে ধীরে-ধীরে যেমন গোধূলি এবং সন্ধে হয়, ব্যাপারটা অনেকটা যেন সেইরকম।
তার পরের কয়েকটা বছরে একটা টাটকা ছটফটে মাছ ডিপ ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা হিম হয়ে গেল। আর এখনও তাই।
কেন, কে জানে!
সুপর্ণলতিকা কি বড্ড বেশি কথা বলে? সবসময় কি ওর ঠোঁট নড়ে?
ঠোঁট। এই ঠোঁটের জন্য একদিন স্নিগ্ধপ্রভাতের ঠোঁট পাগল ছিল। কিন্তু দু-আড়াই বছরের মধ্যেই সে-পাগলামি স্তিমিত হয়ে গেছে। এখন ওর মনে হয় ধীরে-ধীরে ও আর সুপর্ণলতিকা দুটো ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। রাতে সেই দুটো ফ্ল্যাট পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে থাকে। যেমন করে শুয়ে থাকত স্বর্ণদ্যুতি আর রত্নমঞ্জু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
নিভে যাওয়া সম্পর্ককে কি আবার দপ করে জ্বেলে দিতে পারে বিজ্ঞান? বোধহয় না। বিজ্ঞানের আবিষ্কার শরীরে আগুন ধরাতে পারে–মনে নয়।
একজন হলোগ্রাম-স্ট্রিপার নাচতে নাচতে স্টেজ থেকে নেমে এসেছিল। মেয়েটা যেমন খুশি টেবিল-চেয়ার-মানুষকে ভেদ করে নাচের ভঙ্গিতে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে লাগল। একজন বেসামাল খদ্দের ওকে জাপটে ধরতে গিয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ল।
মেয়েটা যখন সিগ্ধপ্রভাতকে ভেদ করে চলে গেল তখন ও যেন সামান্য উষ্ণতার ছোঁয়া পেল। মনটা ক্ষণিকের জন্য চনমনে হয়ে উঠল।
আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। মনে হল জীবন কত ক্লান্তিকর, কত দীর্ঘ।
রাতে বাড়ি ফেরার সময় স্নিগ্ধপ্রভাত ভাবতে চেষ্টা করছিল ফানল্যান্ডটাই যেন ওর বাড়ি। সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ও সুপর্ণলতিকা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে যাচ্ছে। কিন্তু ভাবনাটা তেমন জমছিল না।
ফ্ল্যাটে ফিরে এসে ও সুপর্ণলতিকার মুখোমুখি হল।
সুপর্ণলতিকা কোনও কথা বলল না। ঠান্ডা চোখে স্বামীর দিকে একপলক তাকিয়ে পামটপ কম্পিউটারে সেলাইয়ের গ্রাফিক্স দেখতে লাগল।
স্নিগ্ধপ্রভাত স্ত্রীকে দেখছিল।
সেই একইরকম মনোরম সৌন্দর্য মাখানো মুখ। সময়ের কোনও ছাপ পড়েনি সেখানে। অথচ স্নিগ্ধপ্রভাত পলকের জন্যও কোনও টান অনুভব করল না।
ওর ভেতরে-ভেতরে কান্না পাচ্ছিল। রোজই এমন কান্না পায়।
একটা ঠান্ডা সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে জীবন কাটানো যায় না কিছুতেই। অথচ ও চেষ্টা করেও ভেতর থেকে কোনও উষ্ণতা খুঁজে পায় না। ওর ভালোবাসা নির্ঘাত মরে গেছে। আর সেই মৃত শিশুটিকে কোলে নিয়ে ও বোকার মতো বোতল থেকে দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করছে।
স্নিগ্ধপ্রভাতের নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছিল। সুপর্ণলতিকার টান ও টের পায়। অথচ সেই টানের উত্তর দেওয়ার মতো ক্ষমতা ওর নেই।
জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল স্নিগ্ধপ্রভাত। ভাবতে চেষ্টা করল, ঠিক কবে থেকে ওরা ফ্ল্যাটে বদলে যেতে শুরু করেছে।
চোখ বুজে ডানহাত এলিয়ে দিল চোখের ওপরে।
ইশ, কোনও ম্যাজিশিয়ান যদি পারত ওর ফুরিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিতে!
.
মাথার ভেতরে কেমন যেন দপদপ করছিল। কেউ যেন সেখানে পুঁচকে একটা হাতুড়ি নিয়ে ঠুকঠুক করে পেরেক ঠুকছিল। স্নিগ্ধপ্রভাতের মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কোথা থেকে যেন গোলাপের গন্ধ ওর নাকে এসে ঢুকছিল–এবং ওর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
দুটো ইচ্ছের লড়াই চলতে-চলতে ওর ঘুম ভেঙে গেল।
সম্পূর্ণ অচেনা একটা ঘরে অচেনা একটা বিছানায় জেগে উঠল স্নিগ্ধপ্রভাত।
অবাক চোখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই রক্তের মতো টুকটুকে লাল একগুচ্ছ গোলাপ ওর নজরে পড়ল। বিছানার পাশেই স্বচ্ছ টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ ফুলদানি। বোধহয় অ্যাক্রিলিকের তৈরি। ফুলদানির ওপরটা গোলাপের পাপড়িতে ঢাকা।
ওঃ..আপনার ঘুম ভেঙেছে!
গোলাপের দিক থেকে চোখ তুলল স্নিগ্ধপ্রভাত। চোখ পড়ল আর-এক গোলাপের দিকে।
সুন্দর লম্বাটে মুখ। ফরসা কপালে উজ্জ্বল টিপ। পরনে হালকা গোলাপি শাড়ি। পাতলা ঠোঁটে একচিলতে দুষ্টুমির হাসি। সেইসঙ্গে আবছা পারফিউমের ঘ্রাণ যেন টের পেল স্নিগ্ধপ্রভাত।
আমি কোথায়? প্রশ্নটা ওর নিজের কানেই কেমন বোকা-বোকা শোনাল।
কোথায় আবার! আমার ফ্ল্যাটে! কী সহজ স্বাভাবিক উত্তর দিল তরুণী!
আপনি কে?
খিলখিল করে হেসে উঠল। স্নিগ্ধপ্রভাতের শরীরের ভেতর দিয়ে ঝরনা বয়ে গেল।
আমার নাম অঙ্গলাবণি।
নামটা ঝংকার তুলল কানে। অনেক প্রশ্ন ভিড় করে এল ঠোঁটে। উচ্চারণ না করে স্নিগ্ধপ্রভাত সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লাগল অঙ্গলাবণির মুখে।
এখানে ও কেমন করে এল!
জটপাকানো স্মৃতি হাতড়ে এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করল।
ঝাপসাভাবে যেটুকু ও মনে করতে পারল সেটা হল, কাল রাতে ও ফানল্যান্ডে ছিল। ছোট ছোট চুমুকে হুইস্কি খাচ্ছিল আর হলোগ্রাফিক ক্যাবারে দেখছিল। একটি রোগা মেয়ে সাপের মতো শরীরটা খেলিয়ে সিলিকোন-যৌবনের নগ্ন হাতছানি দিয়ে নাচছিল।
