অফিসের কথা মনে পড়ল ব্রিজেশের। ওঁর আন্ডারে এমপ্লয়ির সংখ্যা একশো বারো। নট আ ম্যাটার অফ জোক। ওই একশো বারোজন এমপ্লয়ি ব্রিজেশ দত্ত চৌধুরীর কথায় ওঠ-বোস করে।
কিন্তু এখন অফিস ভুলে থাকার সময়। তাই পুরী রওনা হওয়ার সময় থেকেই অফিশিয়াল মোবাইল ফোন বন্ধ। প্রাইভেট ফোনের নম্বরটা ব্রিজেশ শুধু কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সুনন্দন শর্মাকে দিয়ে এসেছেন। বলেছেন, এক্সট্রিম ইমার্জেন্সি ছাড়া ওঁকে যেন ফোন না করা হয়। কারণ, পুরীর এই তিনটে দিন তিনি পুরোপুরি অলসভাবে কাটাতে চান, জীবনের স্রোতে নিজেকে স্রেফ ভাসিয়ে দিতে চান।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ব্রিজেশ। চারপাশে তাকালেন। সি-বিচে মোটামুটি ভিড়। কাছে দূরে কয়েকটা চায়ের দোকান। দোকানদার খদ্দেরদের জন্য কয়েকটা করে কাঠের বেঞ্চি পেতে রেখেছে। সেখানে টুরিস্টরা বসে চা খাচ্ছে, সমুদ্র উপভোগ করছে।
লোকাল হকাররা ঘুরে-ঘুরে শাঁখ, জগন্নাথের ফ্রেমে বাঁধানো ফটো, মুক্তোর মালা বিক্রি করছে। ভোরবেলা থেকে এই একঘণ্টার মধ্যেই ওরা ব্রিজেশদের অন্তত বারচারেক বিরক্ত করে গেছে। হকারগুলো মহা নাছোড়। মুখের সামনে এসে এমন করতে থাকে যে, ব্রিজেশের মাঝে মাঝে মনে হয়, ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দেন। অফিস হলে ব্যাপারটা এতক্ষণে ঘটে যেত। কিন্তু এটা তো আর অফিস নয়!
সানিয়া গুনগুন গান থামিয়ে জিগ্যেস করলেন, কোথায় চললে?
কোথাও না। সাগরের জলে একটু পা ভিজিয়ে আসি।
আজ সানরাইজ খুব ভালো দেখা গেছে, তাই না?
ব্রিজেশ ছোট্ট করে জবাব দিলেন, হু। তারপর একটু থেমে আবার বললেন, হকারদের কাছ থেকে ফালতু জিনিস কিছু কিনে বোসো না যেন!
সানিয়া বললেন, না, কিনব না।
স্বামী লোকটাকে দেখছিলেন সানিয়া।
বয়েস পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন হলেও কম দেখায়। এই বয়েসেও হালকা শরীরচর্চা ওঁর নেশা। চওড়া গোঁফ, কদমছাট চুল। অল্পস্বল্প নেশা যে করেন সেটা চোখের কোল দেখলে বোঝা যায়। মুখে কেমন যেন একটা যান্ত্রিক শক্ত ভাব আছে। কিন্তু ওঁর হাসি এত সুন্দর-সরল যে, হাসলে ওঁর সাত খুন মাফ করে দেওয়া যায়। দু-যুগ আগে সানিয়া ওঁর এই হাসি দেখেই প্রেমে পড়েছিলেন।
ব্রিজেশের গায়ে লাল লেগো আঁকা একটা সাদা টি-শার্ট আর ছাই রঙা বারমুডা। বালির ওপরে পা ফেলে সমুদ্রের জলের দিকে এগোচ্ছিলেন। জল আসছে, যাচ্ছে তার সঙ্গে ভেসে আসছে রঙিন জেলিফিশ। গতকাল ভোরবেলা একটা বড় মাপের কচ্ছপও ভেসে এসেছিল। লোকাল। জেলেগুলো বলেছিল, কচ্ছপটা ভালোরকম চোট পেয়েছে, ওটা আর বাঁচবে না।
কী করে চোট পেল সে-কথা জিগ্যেস করাতে ওরা বলেছে, হয়তো ওটা কোনও জাহাজের প্রপেলারে ধাক্কা খেয়েছে।
কাল ভোরে কচ্ছপটাকে ঘিরে রীতিমতো ভিড় জমে গিয়েছিল। কেউ-কেউ মোবাইলে ওটার ছবিও তুলছিল।
ব্রিজেশ জলের কিনারায় নেমে এলেন। পা ভেজালেন নোনা জলে। একপলকের জন্য মনে। হল সমুদ্র ওঁর পা ধুয়ে দিচ্ছে। অফিসের ওই একশো বারোজনও কম-বেশি এই কাজটা করে থাকে। আর আশ্চর্য, ব্রিজেশ সেটা এনজয় করেন। যেমন এখন সমুদ্রের পা ধোয়ানোটা বেশ এনজয় করছেন।
সানিয়া স্বামীকে কিছুক্ষণ লক্ষ করছিলেন। কিন্তু ব্যাগের ভেতরে রাখা মোবাইল ফোন বেজে ওঠায় মনোযোগ সরে গেল। ছোট হাতব্যাগের মুখ খুলে ভেতরে উঁকি মারলেন। না, ব্রিজেশের ফোন নয়, সানিয়ার ফোনটাই বাজছে।
ফোন ধরলেন। অপরূপার ফোন। লস এঞ্জেলিস থেকে।
ব্রিজেশ আর সানিয়ার একমাত্র মেয়ে। দু-বছর আগে বিয়ে হয়েছে। তারপর থেকেই স্টেটসে। যোগাযোগ বলতে দিনে দু-তিনটে ফোন। ব্যস।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে হ্যালো বললেন সানিয়া। চোখের কোণ দিয়ে ব্রিজেশকে একবার দেখলেন। জলের ওপরে আয়েশি পা ফেলছেন। তারপর অপরূপার সঙ্গে কথায় ডুবে গেলেন।
সমুদ্রের হাওয়া ব্রিজেশের ভালো লাগছিল। দেখছিলেন, হাওয়ার দাপটে দুটো পায়রা অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিরবেগে বাতাসে ভেসে চলেছে। ব্রিজেশও এখন ওদের মতো অলসভাবে প্রকৃতির হাত ধরে ভেসে চলেছেন। করপোরেট জীবনের কোনও বাঁধন নেই, শাসন নেই। ওই সূর্যের মতো তিনি স্বাধীন। কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
ঠিক তখনই একটা জিনিস ব্রিজেশের চোখে পড়ল।
একটা প্রকাণ্ড মাপের জিনিস–একটা বস্তা কিংবা সেই জাতীয় কিছু সমুদ্রের জলে ভেসে আসছে।
ব্রিজেশের কাছ থেকে পনেরো-বিশ ফুট দূরে ভাসছে–অথবা, সাঁতার কেটে আসছে– জিনিসটা।
আবার একটা উন্ডেড কচ্ছপ নাকি?
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জিনিসটা ব্রিজেশের খুব কাছে এসে গেল। সমুদ্রের জল ওটাকে প্রায় ব্রিজেশের পায়ের কাছে জমা দিয়ে চলে গেল। আর বস্তুটা হামাগুড়ি দিয়ে বালির ওপরে অনেকটা উঠে এল।
অন্য কেউ হলে অবশ্যই চিৎকার-চেঁচামেচি করে একলাফে ছিটকে সরে যেত, কিন্তু ব্রিজেশ অন্য ধাতুতে গড়া। এক পলকেই প্রাণীটাকে তিনি যা দেখার দেখে নিয়েছেন।
না, প্রাণীটা কচ্ছপ নয়। এমন অদ্ভুত প্রাণী বোধহয় কেউ কখনও দেখেনি।
প্রাণীটার চেহারা কচ্ছপ আর শঙ্কর মাছের মাঝামাঝি। মাপে নেমন্তন্ন-বাড়ির নৌকোর মতো। মেটে রঙের শরীরে পায়রা-চঁদা মাছের মতো কালো চাকা-চাকা দাগ। শরীরটা মসৃণ নয়– এবড়োখেবড়ো। যেন খাবলা-খাবলা মাটি চাপিয়ে তৈরি। আর গায়ের চামড়াটা ব্যাঙের মতো খসখসে–তার ওপরে ডুমো-ডুমো আঁচিল।
