প্রাণীটার পিছনদিকে অক্টোপাসের শুড়ের মতো গোটা চারেক লেজপাখনার মতো ছড়িয়ে আছে। চারটে শক্তপোক্ত পা। পায়ের আঙুলগুলো হাঁসের পায়ের পাতার মতো চামড়া দিয়ে জোড়া। আঙুলের ডগায় মোটা বাঁকানো নখ।
সবচেয়ে বীভৎস হল প্রাণীটার চোখ। অন্তত ব্রিজেশের তাই মনে হল।
চোখ তো নয়, যেন নীল রঙের দুটো টেনিস বল–তাও আবার শরীরের বাইরে উঁচু হয়ে আছে! এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে–যেন কাউকে খুঁজছে।
প্রাণীটা নখ দিয়ে ভিজে বালির ওপরে খুব ধীরে-ধীরে আঁচড় কাটছিল। বোধহয় অচেনা পরিবেশে আচমকা হাজির হয়ে ঠিক কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না।
ব্রিজেশ আর দেরি করলেন না। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকালেন। কাছেই একজন বৃদ্ধ লাঠি হাতে বালির ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখের পলকে ব্রিজেশ ছুটে গেলেন তার কাছে।
এক্সকিউজ মি বলে এক ঝটকায় লাঠিটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন। তারপর ছুটে আবার প্রাণীটার কাছে চলে এলেন। কালী পুজোয় খাঁড়া উঁচিয়ে যেমন করে পাঁঠাবলি দেয় ঠিক সেইভাবে লাঠিটা শক্ত দু-হাতে তুলে ধরলেন মাথার ওপরে। এবং ভয়ংকর শক্তিতে প্রাণীটার মাথা তাক করে সেটা নামিয়ে আনলেন।
বেলুন ফাটার মতো শব্দ হল। একটি চি-চিঁ শব্দও বেরিয়ে এল প্রাণীটার মুখ থেকে। কিন্তু ব্রিজেশ বুঝলেন, লাঠির ঘায়ে প্রাণীটাকে সেরকম কাবু করা যায়নি।
চায়ের দোকানদারদের পেতে রাখা বেঞ্চিগুলোর দিকে চোখ গেল ব্রিজেশের। ওগুলো বেশ ভারী কাঠ দিয়ে তৈরি। সুতরাং লাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটা খালি বেঞ্চির দিকে ছুটে গেলেন।
প্রাণীটা ঘিরে ততক্ষণে ভিড় জমতে শুরু করেছে। কিন্তু সব দর্শকই ভয়ংকর প্রাণীটার কাছ থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেছে।
বেঞ্চি কাঁধে নিয়ে ব্রিজেশ চিৎকার করে ছুটে এলেন। ওঁর মারমুখী চেহারা দেখে সবাই চটপট সরে গিয়ে ওঁকে পথ করে দিল।
প্রাণীটা তখন ওর লম্বা লাল জিভ বের করে ভিজে বালির ওপরে বোলাচ্ছে। ওর চারটে লেজ ছটফট লাফাচ্ছে। নীল চোখ এলোমেলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
দর্শকদের গুঞ্জন জোরালো হল। আর ব্রিজেশ কাঠের বেঞ্চিটাকে গদার মতো ব্যবহার করলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটা বসিয়ে দিলেন প্রাণীটার দেহে।
ওটার পিঠের চামড়া ফেটে গেল। কালচে তরল ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। প্রাণীটা ওর শরীর মোচড়াতে লাগল। চোখ উলটে পা ছুঁড়তে লাগল। চি-চিঁ শব্দটা আরও জোরালো হল।
ব্রিজেশ কিন্তু থামেননি। বেঞ্চিটাকে বারবার কাঁধে তুলে প্রাণীটাকে একের পর এক আঘাত করতে লাগলেন।
দর্শকদের একটা অংশ চেঁচিয়ে ব্রিজেশকে উৎসাহ জোগাতে লাগল। কেউ-কেউ ইশ! আহা! করতে লাগল।
হইচই আর ভিড় দেখে সানিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন। অনেক মুখের ভিড়ে স্বামীর মুখটা খুঁজছিলেন, কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলেন না।
কাঠের বেঞ্চিটা ওঠা-নামা করাতে করাতে ব্রিজেশ হাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যখন থামলেন তখন প্রাণীটা একেবারে থেঁতলে গেছে। নেহাত ওটার রক্ত লাল নয়–নইলে দৃশ্যটা অনেক বীভৎস দেখাত। প্রাণীটার গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও চোখ দুটো অক্ষত ছিল। প্রাণীটার নীল চোখ দুটো কেমন শান্ত মায়াময় দেখাচ্ছিল।
মৃত প্রাণীটাকে ঘিরে জটলা বাড়ছিল। প্রাণীটার নাম কী, কোন জাতের, এইসব বিষয় নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছিল। ব্রিজেশ বেঞ্চিটা একপাশে নামিয়ে রেখে হাঁপাচ্ছিলেন। অনেকেই ব্রিজেশের শক্তি আর সাহসের তারিফ করছিলেন। বলছিলেন, ব্রিজেশ প্রাণীটাকে খতম না করলে সি-বিচে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে যেতে পারত। কেউ-কেউ গতকাল ভেসে ওঠা কচ্ছপটার কথা বলছিলেন।
সানিয়া ততক্ষণে ব্রিজেশকে দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু সমুদ্রের কিনারায় জটলাটা ঠিক কীসের সেটা বুঝতে পারছিলেন না। তাই উবিগ্ন হয়ে ব্রিজেশের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন।
ব্রিজেশ সানিয়ার দিকে তাকালেন। সানিয়া বেশ খানিকটা দূরে, অনেকটা উঁচুতে, বালির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রিজেশ হাত তুলে ওঁকে আশ্বাস দিলেন। বোঝাতে চাইলেন যে, চিন্তার কিছু নেই, এখুনি তিনি স্ত্রীর কাছে ফিরে যাবেন।
কিন্তু ব্রিজেশের প্ল্যান ভেস্তে গেল একটা উটকো লোকের জন্য।
লোকটা ভিড় ঠেলে সরিয়ে, বলতে গেলে আচমকাই, ব্রিজেশের সামনে এসে উদয় হল।
লোকটার গায়ের রং বেশ কালো। লম্বাটে মুখ। ঢ্যাঙা চেহারা। গায়ে পুলিশের খাকি উর্দি। মাথায় ক্রিকেটারদের কালো ক্যাপ। হাতে তামাটে রঙের ব্যাটন।
হয়তো ওর পুলিশের পোশাক আর হাতের লাঠি দেখেই জটলা পাকানো জনতার ভিড় বেশ কিছুটা পাতলা হয়ে গেল।
লোকটা পান চিবাচ্ছিল। প্রাণীটার ডেডবডির খুব কাছে এসে ও মুখ ছুঁচলো করে পুচ করে ভিজে বালিতে পানের পিক ফেলল। তারপর লাঠিটা আলতো করে বাঁ-হাতের তালুতে ঠুকতে ঠুকতে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোর ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল।
লাঠিটা মরা প্রাণীটার দিকে তাক করে পুলিশটি বাতাসে রুক্ষ প্রশ্ন ভাসিয়ে দিলঃ এটাকে কে মারল রে?
জনতার গুঞ্জন শুরু হল। দু-একজন একটু ইতস্তত করে ব্রিজেশের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন।
ব্রিজেশও প্রায় একইসঙ্গে নিজের বুকে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, আমি–আমি মেরেছি…।
লোকটা ব্রিজেশের দিকে দু-পা এগিয়ে এল। লাঠি উঁচিয়ে বেশ উদ্ধতভাবে জানতে চাইল, কেন? মারলেন কেন?
এ-এমনি…।
