নিশিকার হাসিটা চওড়া হল? কাউকে ফোন করে ডাকার দরকার নেই। আমি কনফেস করব শুধু আপনার কাছে–আর কারও কাছে নয়।
তার মানে! আমার কেমন যেন নার্ভাস লাগছিল।
রামা-শ্যামার কাছে সব খুলে বলে কোনও লাভ নেই। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। জানতাম আমাদের দেখা হবেই। আপনি আমাকে ডেকে পাঠাবেন।
কীভাবে জানলেন আমি ডেকে পাঠাব?
হাসল নিশিকা, বলল, জানি। এই জানাটাই আমার অলৌকিক ক্ষমতা।
মেয়েটা কি জ্যোতিষী নাকি! কে জানে, হয়তো ব্লাফ দিচ্ছে! কিন্তু ওর চোখ তো সে কথা বলছে না। বরং মনে হচ্ছে সত্যি কথাই বলছে। ওঃ, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরটা কেমন করছে!
এবারে বলুন, রাজীব টাটাদের মতো বড়লোকদের কী কেলেঙ্কারির ঘটনা আপনি জানেন যা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওঁদের থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা নিচ্ছেন! ওঁদের পাস্ট লাইফের কী গোপন খবর আপনি জানেন?
নিশিকা হাসল, মাথা নাড়ল এপাশ-ওপাশ–যেন আমি কোনও ছেলেমানুষি কথা বলেছি। তারপর ও ওঁদের অতীতের কোনও খবর তো আমি জানি না! আমি জানি শুধু ওঁদের ভবিষ্যতের কথা–আগামী দিনে ওঁদের জীবনে কী হতে চলেছে।
কী বলছেন আপনি! বুঝতে পারছিলাম আমার মুখ হাঁ হয়ে গেছে, চোখ বড় বড় : আপনি কি জ্যোতিষী? ফরচুন-টেলার?
না। জ্যোতিষীরা আন্দাজ করে ভাগ্যের কথা বলে। প্রতিদিনের খবর জানে না। আমার সামনে ঝুঁকে এল নিশিকা? আমি প্রতিদিন, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মুহূর্তের খবর জানি। আমি আন্দাজে কিছু বলি না। আমি ফরচুন-টেলার নই…ফিউচার-টেলার।
আমি নিশিকার অন্তর্ভেদী চোখের দিকে দেখছিলাম। অপলক ওই চোখ ভবিষ্যতের সবকিছু দেখতে পাচ্ছে!
সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা খুব সহজ–আমি ওই বড়লোকগুলোর কাছে গিয়ে বলি আমি ওদের ভবিষ্যতের সব খবর জানি। তাই আমাকে টাকা দিতে হবে। একটু থেমে তারপর ও বড়লোকদের আমি ঘেন্না করি। আর আপনার মতো সমাজে যারা উঁচু চেয়ারে বসে রয়েছে তাদেরও আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি না। আপনারা সবাই মিলে দেশটাকে উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছেন।
নিশিকা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, বড়-বড় শ্বাস ফেলছিল।
আমি হাত তুলে ওকে শান্ত হতে বললাম। তারপর ও তার মানে ওঁদের ভবিষ্যতের কুকীর্তি গোপন রাখার জন্যে ওঁরা আপনাকে টাকা দেন? যাতে কাউকে আপনি সেসব কথা না বলে দেন?
না, না! আপনি ঠিক বুঝতে পারেননি। ফিউচারের সব গোপন কথা অন্যদের কাছে ফাস করে দেব বলে আমি ওদের ভয় দেখাই না। আমি ওদের ভবিষ্যতের কথা ওদেরই বলে দেব– এই বলে ভয় দেখাই। যেমন ধরুন, রাজীব টাটা কোন বছরে কোনদিন কটার সময় কীভাবে মারা যাবে আমি জানি। সেটা যদি ওকে জানিয়ে দিই তা হলে লোকটা কি আর নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারবে? রোজ গুনবে মরতে ওর আর কদিন বাকি। এই টেনশানে-টেনশানে ওর লাইফ হেল হয়ে যাবে। তারপর একদিন আর সইতে না পেরে সুইসাইড করবে। তাই না?
আমি পাথর হয়ে বসে রইলাম। ব্ল্যাকমেলের রহস্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
আমার আরও কাছে ঝুঁকে এল নিশিকা। প্রায় ফিসফিস করে বলল, আপনার মারা যাওয়ার দিনক্ষণও আমি জানি। যদি আপনি আমাকে পুলিশের তরফ থেকে প্রোটেকশান দেন–মানে, আমাকে ডিসটার্ব না করেন, তা হলে সেসব সিক্রেট আপনাকে বলব না। আপনি নিশ্চিন্তে জীবনটাকে এনজয় করতে পারবেন।
আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। ওর কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম। আমি সুইসাইড করতে চাই না–নিশ্চিন্তে বাঁচতে চাই।
নিশিকা চলে যাওয়ার আগে বলে গেল, ব্ল্যাকমেল করে পাওয়া টাকার প্রায় সবটাই ও সত্যি-সত্যি সোশাল ওয়েলফেয়ারের কাজে খরচ করে।
ভয়ের খুব কাছে
ব্রিজেশ ঢেউ গুনছিলেন, আর মনে-মনে বেশ মজা পাচ্ছিলেন। বিনিমাইনের এই চাকরিটা শখের খেলা হিসেবে মন্দ না।
পুরীর সমুদ্র বরাবরই ব্রিজেশের খুব প্রিয়। কারণ, সমুদ্রের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর মধ্যে কোথায় যেন একটা একগুঁয়ে ফোর্স লুকিয়ে রয়েছে। বিউটির সঙ্গে ফোর্স মিশে গেলে তার আকর্ষণই আলাদা!
একটু আগেই সমুদ্রের ভেতর থেকে সূর্য উঠেছে। এখন তার লাল-কমলা আলো জলের ওপরে চকচক করছে। বহুদূরে দুটো নৌকো দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই ওগুলো কালো ফুটকি হয়ে শেষে মিলিয়ে যাবে।
সমুদ্রের খুব কাছাকাছি ব্রিজেশ বসেছিলেন। লোকাল একজন মহিলা দশটাকার বিনিময়ে প্লাস্টিকের চেয়ার ভাড়া দেয়–এক ঘণ্টার জন্য। তার কাছ থেকে দুটি চেয়ার ভাড়া নিয়েছেন– ছাই রঙের হাতলওয়ালা চেয়ার। একটায় ব্রিজেশ বসেছেন আর তার পাশের চেয়ারে সানিয়া। ভাবতে অবাক লাগে, কতদিন পর ওঁরা স্বামী-স্ত্রী এমনভাবে পাশাপাশি বসেছেন, অলসভাবে সময় কাটাচ্ছেন।
সমুদ্রের হাওয়া চোখে-মুখে ঝাপটা মারছিল। সামনে সমুদ্রের অনন্ত বিস্তার, আর সঙ্গে ঢেউয়ের পরে ঢেউ। ব্রিজেশ চাইছিলেন, সময় এখন থেমে যাক, সমুদ্রের অদ্ভুত গন্ধটা চিরস্থায়ী পারফিউমের মতো শরীরে লেগে থাক।
গুনগুন গান কানে আসায় সনিয়ার দিকে মুখ ফেরালেন।
কপালের দু-পাশে চুল সাদা হয়ে গেছে, ত্বক আর আগের মতো মসৃণ নেই, কিন্তু গানের গলাটা একইরকম রয়ে গেছে। এই মেয়েটার সঙ্গে দু-দুটো যুগ কাটিয়ে দিয়েছেন ব্রিজেশ। ওঁর হাই প্রোফাইল করপোরেট লাইফে সানিয়া সবসময় সলাস আর স্টেবিলিটি জুগিয়েছেন–শান্তি আর স্থিতি। তাই এই কম কথা বলা মেয়েটাকে ব্রিজেশ এখনও পছন্দ করেন। কিন্তু মাঝে-মাঝে মনে হয়, অফিসে যেমন সাবর্ডিনেটরা ওপরওয়ালার মরজিমাফিক চলার চেষ্টা করে সানিয়া সেরকম কিছু করছে না তো!
