লোরাকে সংক্ষেপে গাইডলাইন দিলাম। তারপর বললাম, অরিনের সঙ্গে ও যেন কথা বলে নেয়।
তখনও জানি না, একটা অদ্ভুত রিপোর্ট আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
*
পরদিন বিকেল চারটের সময় লোরা আর অরিন আমার চেম্বারে এল।
ওদের বসতে বললাম।
অরিন একটা ফোল্ডার আমার দিকে এগিয়ে দিল? এতে তিরিশটা কালার প্রিন্টআউট আছে।
ফোল্ডার খুলে ছবিগুলো দেখলাম।
ডিজিটাল ক্যামেরার ডিস্ক থেকে কম্পিউটারে ট্রান্সফার করে ছাপা ছবি। ছবিগুলো ফটোগ্রাফের চেয়েও জীবন্ত।
মেয়েটিকে দেখতে অতি সাধারণ। লম্বাটে মুখ। গায়ের রং মাঝারি। কপালে ছোট টিপ। গলায় সোনার চেন। পরনে গাঢ় নীল পাড় আকাশি রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ।
মেয়েটির কাঁধে সমাজসেবিকা ঢঙের একটা ব্যাগ ঝুলছে।
এই আমাদের ব্ল্যাকমেলার?
হ্যাঁ, স্যার। অরিন বলল।
অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটিকে দেখলাম আমি।
এই সাদামাটা মেয়েটা একের পর এক কোটিপতিকে অকাতরে ব্ল্যাকমেল করে চলেছে! চেহারা দেখে বিশ্বাস হতে চায় না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অরিন বলল, রাজীব টাটা গতকাল ওকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দিয়েছেন। বললেন, এই ভদ্রমহিলা নানারকম সোশাল ওয়েলফেয়ারের কাজে যুক্ত আছেন। তাই তিনি খুশি হয়ে ওঁকে পাঁচলাখ টাকা দিয়েছেন। এটা ওঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। যদি কখনও ব্যাপারটা পুলিশের আওতায় আসে রাজীব টাটা নিশ্চয়ই আমাদের জানাবেন আমাদের হেল্প চাইবেন।
আমি ব্ল্যাকমেল শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে-সঙ্গে উনি যেভাবে হেসে উঠলেন তাতে মনে হল আমি যেন চাঁদকে চৌকো বলেছি। আমার খুব ইনসাল্টিং লেগেছে, স্যার। এরপর চুপচাপ চলে আসা ছাড়া কোনও পথ ছিল না।
অরিন গম্ভীর মুখে কথা শেষ করল। বুঝলাম, সকালের অপমানটা বিকেলেও মিলিয়ে যায়নি।
এবার লোরার পালা।
ও যা বলল সেটা সত্যি-সত্যিই অবাক হওয়ার মতো।
মেয়েটির নাম নিশিকা। এলগিন রোডে থাকে। লোরা ওকে অনুসরণ করার সময় নিশিকা বেশ কয়েকবার পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। লোরার মনে হয়েছে নিশিকা অনুসরণের ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, একফোঁটাও বিচলিত হয়নি। ফলে লোরা অতি সহজেই ওর বাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। ওর নাম-ঠিকানাটাও টুকে নিয়ে আসে।
তোমার ফলো করার কাজটা তা হলে জলের মতো সহজ হয়ে গেছে? লোরাকে জিগ্যেস করলাম।
হ্যাঁ, স্যার–অ্যাট লিস্ট আমার তাই মনে হয়েছে।
সত্যি, একজন ব্ল্যাকমেলারের পক্ষে এ ভারী অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া।
কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর অরিনকে বললাম, অরিন, নিশিকা রাজীব টাটাকে কিছু একটা ফাঁস করে দেবে বলে ভয় দেখাচ্ছিল। লেট আস ডিগ ইনটু রাজীব টাটাস পাস্ট। খুঁজে বের করো, রাজীব টাটা কী এমন কেলেঙ্কারির কাজ করেছেন যা ফাস হলে ওঁর মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আর যে-তিনজন মালটি মিলিওনেওয়ার গত দুমাসে সুইসাইড করেছেন খোঁজ করে দ্যাখো ওঁদের লাইফে কোনও গোপন স্ক্যান্ডাল ছিল কি না। সিক্রেট ইনফরমেশানই ব্ল্যাকমেলারদের স্ট্রেংথ।
অরিন বলল, ও.কে, স্যার।
এই পাস্ট হিস্ট্রিগুলো স্ক্যান করার কাজে লোরা তোমাকে হেল্প করবে। য়ু আর পাটনার্স।
অরিন আড়চোখে লোরার দিকে দেখল। লোরার মুখে একটা উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠল।
ওরা চলে গেলে আমি ছবির ফোল্ডারটা টেবিলে নামিয়ে রেখে কম্পিউটারের দিকে ঘুরে বসলাম। পুরো ব্যাপারটার একটা ব্রিফ রিপোর্ট তৈরি করতে শুরু করলাম। কাজ করতে করতে আমার চোখ বারবার টেবিলে রাখা খোলা ফোল্ডারটার দিকে চলে যাচ্ছিল।
সেখান থেকে নিশিকা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। চ্যালেঞ্জের হাসি।
মেয়েটা আরও কজন কোটিপতিকে ব্ল্যাকমেল করছে কে জানে!
.
নিশিকা আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসল। শাড়িটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে কাঁধের ব্যাগটা কোলের ওপরে রাখল। তারপর আত্মবিশ্বাস ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
হাসিটা এমন যেন ও বুঝতে পেরেছে আমার ডিপার্টমেন্টের তদন্তের নিটফল শূন্য, কিংবা মহাশূন্য।
অরিন আর লোরা আমাকে গতকাল রিপোর্ট দিয়েছে যে, রাজীব টাটা এবং সুইসাইডে মারা যাওয়া তিন কোটিপতির জীবনে বলার মতো তেমন কোনও কুকাজ নেই। চারজনেরই জীবন মোটামুটিভাবে যুধিষ্ঠির কিংবা সত্যবানের মতো।
সুতরাং নিশিকাকে আমার দপ্তরে একবার ডেকে পাঠিয়েছি।
এসব ভাবছিলাম আর নিশিকার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর চোখদুটো আমার কেমন অলৌকিক মনে হচ্ছিল। সোজা চেয়ে আছে আমার দিকে। চোখে পলক পড়ছে না।
ঠান্ডা গভীর চোখ। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। যেন আমার আপাদমস্তক অন্তরতম আনাচকানাচ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে জরিপ করে নিয়েছে। আমার সম্পর্কে কিছুই আর ওর জানতে বাকি নেই।
কোনওরকমে অস্বস্তি কাটিয়ে আমি কথা বললাম, নিশিকা, আপনি রাজীব টাটাকে ব্ল্যাকমেল করছেন। আরও তিনজন মালটি মিলিওনেয়ার আপনার ব্ল্যাকমেলের টার্গেট হয়ে সুইসাইড করেছেন। এখনও আমরা কোনও কংক্রিট প্রুফ পাইনি–তবে আজ না হয় কাল প্রমাণ পাবই। তখন আপনার এই হাসি মিলিয়ে যাবে। তার চেয়ে বেটার আপনি এখন নিজে থেকেই পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুন।
নিশিকার চোখ অপলক। ঠোঁটে একচিলতে হাসি। ও বলল, আপনাকে সব বলব।
আমি মাথা নেড়ে ইন্টারকম ভিডিয়োফোনের দিকে হাত বাড়ালাম : হ্যাঁ, কনফেস করাটাই বেটার। শাস্তি কম হবে।
