মা-মেয়ের এই নিত্য আক্রমণ আমি আর সইতে পারি না। তপতীটার বিয়ে দিতে পারলে আমি বাঁচতাম। আমার বোঝা অন্তত অর্ধেকটা কমত। কিন্তু সেটাই বা হচ্ছে কই!
সুতরাং নেহাতই আত্মরক্ষার জন্যে হাতের পাকানো খবরের কাগজটা তেলচিটে ময়লা বিছানার ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে বললাম, আজ আমার অফিসের একজন চেনা লোক আমাকে একটা জিনিস দিয়েছে।
ওদের কাছে ভুলেও সত্যি কথা বলা যাবে না। বললে দুজন দু-পাশ থেকে প্রশ্নে-প্রশ্নে আমাকে একেবারে নাজেহাল করে দেবে। ওরা লালবাজার কি সি. বি. আই.-তে চাকরি নিলে দারুণ উন্নতি করতে পারত।
কথা শেষ করেই পুঁটলিটা আমি পকেট থেকে বের করে ফেলেছি। আর ঘরের মলিন বালবের আলোয় সেটা খুলেও ফেলেছি চটপট।
দেখি পুটলির মধ্যে রয়েছে সাতটা ঝিকিমিকি লাল আর সবুজ পাথর।
আমরা তিনজনেই পাথর হয়ে গেলাম।
মল্লিকা আর তপতী লোভ-চকচকে চোখে অপলকে তাকিয়ে রইল পাথরগুলোর দিকে। আমাকে প্রশ্ন করতে ভুলে গেল ওরা। আর করলে কী-ই বা জবাব দিতাম আমি!
পাথরগুলো নিশ্চয়ই খুব দামি। কিন্তু একজন অজানা-অচেনা লোক এগুলো শুধু শুধু কেন দিয়ে গেল আমাকে! ব্যান্ডেলের বিয়েবাড়িতে সত্যিই কি ওই বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার?
প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে গেল। পাথরগুলো চলে গেল মল্লিকা আর তপতীর জিম্মায়। ওরাই এখন এগুলোর মালিক। নিজেরা বোঝাঁপড়া করে ভাগাভাগি করে নেবে। তখনও কি ছাই জানি, আর এক আশ্চর্য ঘটনা অপেক্ষা করে রয়েছে আমার জন্যে! সকাল হলেই নতুন এক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে আমাকে।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি মল্লিকা বা তপতী কেউই বাড়ি নেই। ঘর খালি, রান্নাঘর খালি, কলতলা খালি। গোটা বাড়ি শুনসান। কোথায় গেল ওরা।
জুতো-চটি ইত্যাদি পরীক্ষা করে বুঝলাম, ওরা কেউ বাড়ির বাইরে যায়নি। অথচ বাড়ির ভিতরেও নেই। তা হলে কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল?
সকাল থেকে চা নেই, জলখাবার নেই, রান্না বন্ধ। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পাথরগুলোর কথা জানতে পেরে কোনও গুণ্ডার দল ওদের কিডন্যাপ করল নাকি! ঠিক করলাম, ঘণ্টা দু-তিন অপেক্ষা করে তারপর থানায় খবর দেব। কিন্তু পুলিশে জানালেও তো আর-এক ঝকমারি! কোথা থেকে ওই দামি পাথরগুলো পেলাম, তার কী জবাব দেব?
ফাঁকা বাড়িতে নিরিবিলি বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই কেমন যেন একঘেয়ে লাগতে শুরু করল। মনে পড়তে লাগল আমার বিয়ের কথা, ফুলশয্যের কথা। তারপর তপতীর জন্মের পর আমাদের আড়াইজনের জীবন। তখনও অভাব ছিল, কিন্তু সে-অভাব সইবার মনের জোর ছিল। আর এখন…।
কখন যেন আনমনে মল্লিকার নামটা ডেকে উঠেছিলাম। হঠাৎই সাড়া পেলাম, তুমি কোথায়? তোমাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন! চারপাশটা কী অন্ধকার।
আমি চমকে উঠলাম। চারপাশে তাকালাম। কেউ কোথাও নেই। তা হলে কি ব্যাপারটা আমার মনের ভুল?
মনের ভুল যে নয় সেটা বুঝলাম তপতীর গলা শুনে : বাবা, তুমি কোথায়? আমার এখানে ভয় করছে।
আমি আকুলভাবে ওদের নাম ধরে ডেকে উঠলাম ও মল্লিকা! তপতী!
ওরা ডুকরে কেঁদে উঠল। আমার চোখের সামনে ওরা কি আর কখনও আসতে পারবে না? আমি দু-হাতে শূন্য হাতড়ালাম। সবটাই শূন্য। শুধু ওদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। তা হলে কি ওরা অশরীরী হয়ে গেছে?
আমার কান্না পেতে লাগল। ঘরের চারপাশটা দেখলাম। কত ঝগড়া, কত ভালোবাসার সাক্ষী ঘরের এই চারটে পুরোনো দেওয়াল!
সেদিন অফিসে না গিয়ে আমি সারাদিন ধরে মল্লিকা আর তপতীর সঙ্গে কথা বললাম। ওদের সঙ্গে এত কথা যে আমার বলার আছে তা আগে কখনও বুঝিনি। ওরা আমাকে গোটা ব্যাপারটা খুলে বলল।
লাল আর সবুজ পাথরগুলো ওরা মা-মেয়েতে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ছুঁয়ে টের পেয়েছিল, পাথরগুলো কী অদ্ভুত ঠান্ডা। রাতে ঘুমোনো পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু তারপরই ওরা দ্যাখে, চারপাশটা অন্ধকার–আর পাথরগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।
এরপর থেকেই চলেছে এক অদ্ভুত জীবন। আমি একা মানুষ বাড়িতে থাকি। নিজে হাতে চা করি, রান্না করি, খেয়েদেয়ে অফিসে যাই। আর বাড়িতে যতক্ষণ থাকি সারাক্ষণ বউ আর মেয়ের সঙ্গে গল্প করি। মাঝে-মাঝেই ওরা বলে, এখানে কী কষ্ট! এই অন্ধকারে আর থাকতে পারছি না। মা গো!
আমি সেই আর্তনাদ শুনে ডুকরে উঠি, নিষ্ফল আক্রোশে হাত-পা ছুড়ি। কিন্তু তার বেশি আর কিছু করতে পারি না।
যতই দিন যেতে লাগল তপতী আর মল্লিকার কথা অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল। মনে হতে লাগল, ওরা যেন বহুদূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলছে। ক্রমশ যেন দূরে সরে যাচ্ছে। আমার কাছ থেকে। যেমন, যদি মল্লিকাকে আজ দুপুরে জিগ্যেস করি, তোমার মাথাব্যথাটা কেমন আছে? কমেছে? তা হলে পরদিন ভোরবেলা ওর উত্তর শুনতে পাই। যেন আমার কথা বাতাসে ভেসে ওর কাছে পৌঁছোতে বেশ সময় লাগছে। আবার উত্তর ফিরে আসার সময়েও ঠিক তাই।
তপতী মাঝে-মাঝে বলে, বাবা, তোমার কথা খুব আস্তে শোনা যাচ্ছে।
মল্লিকাও বলে, আর একটু জোরে বলো, শুনতে পাচ্ছি না।
বুঝতে পারছি, আমার হাতে আর সময় নেই। এইভাবে দূরে সরতে সরতে ওরা একেবারে মিলিয়ে যাবে। এমনিতেই আমি আমার অশরীরী সংসার নিয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছি, তার ওপর যদি ওরা চিরকালের মতো হারিয়ে যায় তা হলে…।
