খরচ বাঁচানোর জন্য সকালে খবরের কাগজ কেনেন না রমাপদবাবু। তবে কম খরচে সান্ধ্য আজকাল কেনাটা তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঠিক মানিকতলার মোড়ে এলেই তাঁর ঝিমুনি কেটে যায়। কারণ একটা বাচ্চা ছেলে সান্ধ্য আজকাল-এর গোছা নিয়ে বাসে উঠে চিৎকার করতে থাকে, সান্ধ্য আজকাল! সান্ধ্য আজকাল! রমাপদবাবু ওর কাছ থেকে একটা কাগজ কিনে পড়তে শুরু করেন। বেশিভাগই চনমনে খবর। আর প্রতি শুক্রবারে সান্ধ্যবাসর শিরোনামের বিভাগে একটা করে গল্প। রমাপদবাবু কাগজের একটি অক্ষরও বাদ দেন না। এমনকী বিজ্ঞাপনগুলোও রেহাই পায় না তার নজর থেকে।
আজ শুক্রবার। মানিকতলার ক্রসিং-এ এসে সেই চেনা ছেলেটার কাছ থেকে একটা সান্ধ্য আজকাল কিনলেন রমাপদবাবু। তার আশেপাশে আরও কেউ-কেউ কাগজ কিনলেন ছেলেটার কাছ থেকে। |||||||||| বাসের স্তিমিত আলোয় সামান্য ঝাঁকুনির মধ্যেও তিনি কাগজে চোখ বোলাতে শুরু করলেন। প্রথম কটা পাতায় চোখ বুলিয়ে চলে এলেন গল্পের পাতায়। ভারী অদ্ভুত নামের একটা গল্প ছাপা হয়েছে আজ। রমাপদবাবু গল্পটা পড়তে শুরু করলেনঃ
বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি
সমীর সরকার
বিশ্বাস করুন, ভীষণ বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি। আপনি সান্ধ্য আজকাল-এর পাঠক। সুতরাং আপনিই একমাত্র আমাকে বাঁচাতে পারেন এই বিপদ থেকে। আর কিছুদিন এইভাবে চললে আমি সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে যাব।
আমার এই কাহিনি মোটেই গল্প নয়, বরং নিষ্ঠুর সত্যি। আপনার কাছে এ আমার আন্তরিক আবেদনঃ আমাকে বাঁচান! এভাবে আমি আর পারছি না।
ঘটনাটা গোড়া থেকেই তা হলে খুলে বলি।
আজকের মতোই সেদিনটা ছিল শুক্রবার। অফিস থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরছি। হাতে ছিল আপনারই মতো এক কপি সান্ধ্য আজকাল। বাসে হকারের কাছ থেকে কেনা। বাসের অল্প আলোয় ঝিমুনি কাটিয়ে খবরের কাগজটার পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলাম, এমন সময় পাশ থেকে কে যেন ডেকে বলল, কী ব্যাপার, সমীরবাবু! চিনতে পারছেন?
চমকে তাকিয়ে দেখি, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। আমার পাশের দুজন ভদ্রলোকের ঠিক পরেই বসে আছেন। তারও হাতে সান্ধ্য আজকাল।
বৃদ্ধের থুতনিতে সামান্য খোঁচা-খাঁচা দাড়ি। মাথার চুল প্রায় সাদা। কপালে ও গালে ভাঁজ পড়েছে। ফরসা মুখ। নাকটা বেশ মোটা ও লালচে। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। চশমার পাওয়ার যথেষ্ট বেশি। কারণ, কাচের ওপরে রিং-এর মতো দাগ পড়েছে, আর ভদ্রলোকের চোখজোড়া কুতকুতে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
বৃদ্ধ হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। হাতের কাগজটা ভাঁজ করে বললেন, চিনতে পারলেন না তো!
আমি বেশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। কাগজ পড়া মাথায় তুলে হন্যে হয়ে ভাবতে শুরু করলাম? কোথায় দেখেছি এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে? কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।
বৃদ্ধ রঙ্গ করে বললেন, গত মাসে ব্যান্ডেলে বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলেন ভুলে গেলেন! আপনার তো সকাল-বিকেল ব্রাহ্মীশাক খাওয়া উচিত।
ব্যান্ডেলে যে আমি গত মাসে নেমন্তন্ন খেতে গেছি একথা সত্যি। আমার শ্যালিকার মেয়ের বিয়ে ছিল। কিন্তু…সেখানে এই বৃদ্ধটিকে দেখেছি বলে…।
আশপাশের লোকজন কৌতূহলী হয়ে আমাদের কথা শুনছিল। ফলে আমার অস্বস্তিও ক্রমশ বাড়ছিল।
কী করব ভাবছি, এমন সময় রহস্যময় বৃদ্ধটি আমাকে বাঁচালেন। বললেন, আসুন, একটু নামি। আপনার সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে। কদিন ধরেই আপনাকে খুঁজছি।
আমার যথেষ্ট অবাক লাগছিল। কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে ওঁর প্রস্তাবে রাজি হলাম। বাস থেকে নেমে পড়লে হয়তো নিরিবিলির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির পালাটা শেষ করা যাবে।
মানিকতলার ট্র্যাফিক সিগনালে বাস দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমরা দুজনে নেমে পড়লাম রাস্তায়।
সামনেই একটা ছোট্ট পেট্রল পাম্প। তার পাশের আধো-অন্ধকার গলিতে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন, সমীরবাবু, একটা জিনিস আপনাকে দেব। একদম খাঁটি জিনিস।
বলেই কাপড়ে জড়ানো একটা ছোট পুঁটলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে আমার হাতের মুঠোয় একেবারে গুঁজে দিলেন। বৃদ্ধের দড়ির মতো আঙুলের ছোঁয়া লাগল আমার হাতে। আঙুলগুলো হিমঘরের মতো ঠান্ডা।
আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে যেন দাঁড়িয়েছিলাম। শুধু দেখলাম, ভদ্রলোকের চোখ দুটো আলোয় বিন্দু হয়ে জ্বলছে।
চলি, সমীরবাবু–পরে আবার দেখা হবে।
বৃদ্ধ চলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হলেন।
আমি ওই আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যেও কোনওরকমে জিগ্যেস করলাম, কোথায় দেখা হবে?
বৃদ্ধ অদ্ভুতভাবে হাসলেন। অনেকক্ষণ ধরে হাসলেন। তারপর বললেন, কোথায় আবার, এই বাসেই দেখা হবে! আজকের মতন। দেখবেন সান্ধ্য আজকাল হাতে বসে আছি।
কথাটা বলেই ভদ্রলোক সরু গলি ধরে হাঁটা দিলেন। আমি পিছু ডাকতে গিয়েও থমকে গেলাম। কী নামে ডাকব?
তারপর গুটিগুটি পায়ে পুঁটলিটার ওজন পরখ করতে করতে বাস-রাস্তায় এলাম। সেখান থেকে বাস ধরে সোজা বাড়ি।
বাড়িতে ঢুকেই দেরির জন্যে একপ্রস্ত মুখঝামটা খেলাম মল্লিকার কাছে। রেগে গেলে ওকে আরও কুৎসিত দেখায়। আমাদের আস্তানাটার মতো ওর শরীরটাও শুধু হাড় আর পাঁজর দিয়ে তৈরি। তার ওপর বারো মাসের মাথাব্যথার রুগি।
তপতী একটু দূর থেকে আমাদের ঝগড়া দেখছিল। বোধহয় ভাবছিল, ঠিক কখন থেকে ও মায়ের পক্ষ নেওয়া শুরু করবে।
