তাই আমি প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাসের ভিড়ে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে খুঁজি। থুতনিতে সামান্য খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। মাথার চুল প্রায় সাদা। চোখের মণি যেন আলোয় ফুলকি। নাকের ওপরে হাই পাওয়ারের চশমা। আর হাতে সান্ধ্য আজকাল।
আমি পাগলের মতো প্রতিটা দিন কাটাই, আর পাগলের মতো সেই বৃদ্ধ লোকটিকে খুঁজে বেড়াই–যে লাল-সবুজ ঝিকিমিকি পাথর দিয়ে আমার জীবন পাথর করে দিয়েছে।
আপনি কি তাকে দেখেছেন? দেখতে পেলে অবশ্যই সান্ধ্য আজকাল-এর দপ্তরে অন্তত একটা পোস্টকার্ড দিয়ে জানাবেন। আমি যে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছি।
দয়া করে আমাকে বাঁচান। সংসার-হারানো এক প্রৌঢ়কে দয়া করে সাহায্য করুন। আপনার কাছে এই আমার একান্ত প্রার্থনা।
.
গল্পটা পড়া শেষ করে রমাপদবাবু কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। ভারি অদ্ভুত গল্প তো! গল্প, নাকি সত্যি?
খবরের কাগজটা ভাজ করে সতর্ক চোখে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন রমাপদবাবু। যেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাবেন অমনি বাঁ-পাশ থেকে কে যেন ডেকে বলল, কী ব্যাপার, রমাপদবাবু! চিনতে পারছেন?
রমাপদবাবু চোখ ফেরালেন। বাঁ দিকে আড়াআড়ি সিটে জানলার দিকে পাশেই এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন। তাঁর হাতে এক কপি সান্ধ্য আজকাল।
রমাপদবাবুর দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ হাসলেন। হাতের কাগজটা ভাঁজ করে বললেন, চিনতে পারলেন না তো!
বুকের ভিতরে
তিরি আমাকে এক ধাক্কা মারল। ওর হাত নাড়া দেখে মনে হবে যেন মাছি তাড়াচ্ছে, কিন্তু যে-প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ধাক্কাটা আমার বুকে এসে লাগল তাতে মনে হল যেন, হাত নয়, ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিন।
আমি ছিটকে পড়ে গেলাম পেছনে। পড়তে-পড়তেই শুনলাম, দেওয়ালের কোণে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো সুমিতা এক ভয়ংকর চিৎকার করে উঠেছে।
একটা ফাইবার গ্লাসের চেয়ার আমার শরীরের ধাক্কায় কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল। সেটা ধরে ওঠার চেষ্টা করতেই তিরির পাশে দাঁড়ানো লোকটা চকিতে ছিটকে এল কাছে। ইস্পাতের পাতে মোড়া বুটের গুঁতো মারল আমার পেটে। চোখের সামনে হাজারটা নক্ষত্র ঝলসে উঠে অলৌকিক সুপারনোভা ঘটে গেল। পাঁচকোনা ঘরের ফাইবার গ্লাসের দেওয়ালগুলো নাগরদোলার মতো বনবন করে ঘুরপাক খেতে লাগল। আর তারই মধ্যে সুমিতা একের পর এক চিৎকার করে চলল। মনে হচ্ছিল, ঘুরপাক খাওয়া নাগরদোলাটা কখনও বুঝি থামবে না। আর সুমিতার চিৎকারও বোধহয় তাই।
এখনও বলে দাও, ওরা কোথায় লুকিয়ে রয়েছে।
তিরির রুক্ষ স্বরের প্রশ্নটা যেন সুদীর্ঘ এক টানেলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে গেল আমার কানে। অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল বারবার : ..কোথায় লুকিয়ে রয়েছে? কোথায় লুকিয়ে রয়েছে? কোথায়…।
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে নিলাম কয়েকবার। হঠাৎই সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। কারা কোথায় লুকিয়ে রয়েছে? আমি তার কী জানি? সুমিতাই বা এখানে কী করছে?
আমার বুকে যে-লোকটা গুতো মেরেছিল তার মনে বোধহয় দয়া হল। ঝুঁকে পড়ে অনায়াসে চেপে ধরল আমার বাঁ-হাত। তারপর তার চেয়েও অনায়াসে এক ঝটকায় খাড়া করে দিল আমাকে। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, রুদ্রপ্রসাদ চৌধুরী, বীরত্ব দেখিয়ে কোনও লাভ নেই। এই ঘরে তোমাদের অনেক ইয়ার-দোস্ত বহু বীরত্ব দেখিয়ে গেছে। সেসব বীরত্বের এঁটোকাটা এখন যেখান-সেখানে ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। একটু থেমে আবার বলল, আমরা কাজ শুরু করলে শেষ না করে থামি না।
তিরি আমার কাছে সরে এল। আলতো ধাক্কায় আমাকে ঠেলে বসিয়ে দিল একটা চেয়ারে। তারপর আমার মুখের কাছে মুখ এনে জিগ্যেস করল, চৌধুরী, সত্যি করে বলো তো, এইরকম জেদের কোনও মানে হয়? কেন বেকার গোঁ ধরে বসে আছ?
আমি জোর-জোরে শ্বাস নিলাম। বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। জিভটা বুলিয়ে নিলাম ঠোঁটের ওপর। সত্যিই কি আমি ছেলেমানুষি গোঁ ধরে বসে আছি? একটু পরেই কি আমার বীরত্বের এঁটোকাটা এই ঘরের মেঝেতে নয়ছয় হয়ে পড়ে থাকবে? সুমিতার দিকে একবার দেখলাম। চিৎকার থেমে গেছে, তবে চোখ-মুখ ফোলা, চোখে জল, শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠছে। ওর সহ্যশক্তি এত কম তা আগে কখনও বুঝতে পারিনি। ও আমার সঙ্গে সিকিওরিটি কন্ট্রোল ডিভিশনে কাজ করছে আজ প্রায় বারোবছর। কিন্তু তা সত্ত্বেও নমনীয় রয়ে গেছে।
তিরি সোজা হয়ে দাঁড়াল। ডাকল, ইকা, চৌধুরীকে একটু জল দাও। ওর এখন জলের দরকার। তারপর হেসে বলল, আর যদি শেষ পর্যন্ত মুখ না-ই খোলে তাহলে শান্তিজলের দরকার পড়বে।
ঘরে আমরা মোট পাঁচজন। পঞ্চম লোকটির নামই বোধহয় ইকা। কারণ তিরির কথায় সে নড়ে উঠল। এতক্ষণ সুমিতার কাছাকাছি একটা টেবিলে ভর দিয়ে বসেছিল। চোখের চাউনি চতুর। বেশ মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ ধরে ঘরের কর্মকাণ্ড দেখেছে, কিন্তু কোনও কথা বলেনি। এখন, ফাইবার গ্লাসের একটা গ্লাস হাতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে-আসতে বলল, তিরি, এবার ছেলেটাকে ছেড়ে মেয়েটাকে ধরো, মনে হয় তাড়াতাড়ি কাজ হবে।
তিরি ধীরে-ধীরে মাথা দোলাল। বলল, কথাটা এমনিতে ঠিকই, তবে এখানে লাভ নেই। ওই টানেলের ম্যাপ শুধু চৌধুরীই জানে। এই লোকটা–এর মাথার ভেতরেই রয়েছে খবরটা আমার মাথায় আঙুলের কয়েকটা টোকা মারল তিরি ও সেটা যে করে হোক আমাদের বের করতে হবে।
আমার পাঁজরায় তীব্র ব্যথা। মাথা ঝিমঝিম করছে–যেন মাথার ভেতরে অসংখ্য উলের বল গুঁজে দিয়েছে কেউ। কতক্ষণ এই অত্যাচার চলবে কে জানে! চলুক। যে করেই হোক মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে আমাকে। কারণ, শুধু আমার ওপরেই নির্ভর করছে একশো শিশুর ভবিষ্যৎ মানবজাতির ভবিষ্যৎ।
