সত্যসুন্দরের গলার শিরা ফুলে উঠছিল। ছানিপড়া ঘোলাটে চোখ এখন দু-টুকরো কয়লার মতো দপদপ করে জ্বলছে। নাকের দুপাশে বহতা অশ্রুর দাগ। আবার বলতে লাগলেন, কলেজের কাজে আমি অনেক ফাঁকি দিয়েছি। কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে…।
সত্যসুন্দর ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বলে চললেন অনর্গল। সকলে শুনতে লাগল তার অন্যায়-অবিচার আর পাপের কাহিনি। সামনের সারি থেকে শুরু করে শেষ সারি পর্যন্ত কোথাও কোনও শব্দ নেই, কোনও চাপা হাসি নেই, কোনও সন্দিহান কুটিল নজর নেই। সত্যসুন্দরের কথাগুলো জ্বলন্ত লাভাস্রোত হয়ে প্রত্যেকের কানে ও মরমে ঢুকে যেতে লাগল নিষ্ঠুরভাবে।
…এত মিথ্যা প্রশংসা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এখনও যদি আমি প্রতিবাদ না করি, সত্যি কথা না বলি তা হলে বাবার কাছে আমি ছোট হয়ে যাব।–ডক্টর মিত্রের ছবিটাকে ইশারায় দেখালেন উদভ্রান্ত সত্যসুন্দর। বললেন, আজ এখানে আমার শেষ দিন। শেষ দিনে সত্যি কথা বলতে কাকে আমার ভয়! আমার সহকর্মীরা, শ্রদ্ধেয় মহান মাস্টারমশাইরা, প্রত্যেকে ভালো করেই, জানেন কত পাপ আমি করেছি…।
ঘরের প্রতিটি মানুষ পরস্পরের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছিল। সত্যসুন্দরের মুখোমুখি বসে তারা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছিল তারা কত অসহায়। শচীদুলালের পেটের চিনচিনে ব্যথাটা ক্রমে বুকের কাছে উঠে আসছিল। সতুটা কি পাগল হয়ে গেল? কীসব যা তা বকছে! কিন্তু কই, শচীদুলাল তো উঠে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরতে পারছেন না।
সত্যসুন্দরের কষ্টটা ক্রমশ হালকা হচ্ছিল, এবং একইসঙ্গে গলে যাওয়া ব্যথা অশ্রুধারা হয়ে তার আঁকিবুকি কাটা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। গলার স্বরে কান্না মিশে গিয়ে কথাগুলো অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে যাচ্ছে। ছোট নাতনিটার কথা মনে পড়ছিল তাঁর। বাড়ি থেকে আসার সময়ে জিগ্যেস করছিল, দাদু আজ তোমার ফেয়ারওয়েল ফেয়ারওয়েল মানে কী?
সত্যিই তো, ফেয়ারওয়েল মানে কী? ফেয়ারওয়েলের দিনটাই কি কোনও মানুষের চরম অপমানের দিন? একটা বৃদ্ধ মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে হরেকরকম মিথ্যের ফাঁস এঁটে দেওয়া হয় তার গলায়, সঙ্গে থাকে উপহারের বোঝা। বৃদ্ধের সাধ্য কি ফাসবদ্ধ গলা দিয়ে কোনও স্বর বের করে। সুতরাং হাজারো মিথ্যে মুখ বুজে সয়ে যায় সে। মন ভারী হয়, চোখ ভিজে যায়, কিন্তু বুকের ভেতরের মানুষটা? সে যে দমবন্ধ হয়ে ছটফট করে মরে।
সত্যসুন্দর বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন। ধূপের গন্ধ এখন আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে। সঙ্গে মিশে গেছে টাটকা রজনীগন্ধার সুবাস। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন সত্যসুন্দর। ঘরের সবকটা মানুষ পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ। ওরা সবাই কি যার-যার ফেয়ারওয়েলের দিনটার কথা ভাবছে?
…যা সত্যি তাই আপনাদের এতক্ষণ ধরে আমি বললাম। যদি কোনও অন্যায় করে থাকি মার্জনা করবেন।-খাটো শরীরটা ঝুঁকিয়ে আবার সবাইকে নমস্কার জানালেন সত্যসুন্দর। শরীরটা কেমন ঝরঝরে লাগছে! মনটাও খুশি-খুশি!
বাইরে শীতের বিকেল পড়ে আসছে। বাতাসে ঠান্ডা বেড়ে উঠছে ক্রমশ। জানলায় বসা কাকটা গলা ছেড়ে ডেকে উঠল, কাকা।
সত্যসুন্দর চোখ ফিরিয়ে দেখলেন, জানলায় একটা অপরূপ লালমোহন পাখি বসে আছে। মিষ্টি সুরে ডাকছে। চকচকে চোখে দেখছে তাকে। ছোট নাতনিটার কথা মনে পড়ছিল সত্যসুন্দরের। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। মেয়েটা তার দাদুর জন্য রোজই পথ চেয়ে বসে থাকে। আজ ওকে গিয়ে বলতে পারবেন, ফেয়ারওয়েলের মানে কী। নিজের মুখোমুখি বসে এক নিষ্ঠুর অথচ সহজ হিসেবনিকেশের পালা।
সত্যসুন্দর মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। হলঘরের একটা মানুষও এখন তার দিকে তাকাতে পারছে না। যেন তার চোখে চোখ পড়লেই ওরা ভস্ম হয়ে যাবে।
ওরা যদি তাকাত তা হলে দেখতে পেত সত্যসুন্দরকে তখন কত সুন্দর দেখাচ্ছিল।
বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি
প্রতিদিন সন্ধেবেলা একটা সান্ধ্য আজকাল কেনা রমাপদবাবুর অভ্যেস। সারাদিনের খাটুনির পর অফিসপাড়া থেকে হেঁটে চলে যান বাবুঘাটে। সেখানে লাইন দিয়ে উঠে পড়েন বাসে। একটা সিট দখল করে ঝিমোতে থাকেন। কারণ, দমদম ক্যান্টনমেন্ট অনেক দূরের পথ। সুতরাং তাঁর প্রৌঢ় শরীরটা তখন একটু জিরিয়ে নেয়। নইলে বাড়ি ফেরার পরই তো নিত্যকার অভাবের সঙ্গে জুডোক্যারাটের লড়াই। এ লড়াইয়ে অভাব কখনও ক্লান্ত হয় না। তা ছাড়া তার সঙ্গে হাত মেলায় মনোরমা আর জয়িতা। বউ আর মেয়ে।
বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়লেই রমাপদবাবু ভয় পান। আবার সেই জরাজীর্ণ বট-অশ্বথের শেকড় গজানো আস্তানা। উনুনের ধোঁয়া। জনতা বাথরুম। জলের ভাগাভাগি নিয়ে চুলাচুলি। তার ওপর মনোরমা আর জয়িতা।
জয়িতার বিয়ের বয়েস পেরোতে চলল, তবু একটা পাত্র জুটল না। একটা প্রেম-ট্রেমও করে উঠতে পারল না মেয়েটা! দেখতে মন্দ নয়, কিন্তু ইদানীং খিটখিটে হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে বোধহয় একটু লোভীও। ওর আর দোষ কী! মায়ের ধাত পেয়েছে।
কতদিন রমাপদবাবুর মনে হয়েছে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তারপর একলা নিরিবিলি জীবন। বাড়ি ফেরামাত্রই কেউ আর কিচিরমিচির শুরু করে বিরক্ত করবে না, কিন্তু মধ্যবিত্ত সাহসে কুলোয়নি। সমাজ হচ্ছে এক অদ্ভুত অভিভাবক ও খাওয়ানোর মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই।
