মানব মজুমদার মন্তব্য করলেন, বাঁচা গেল! নইলে ল্যাবরেটরির মালপত্রের হিসেব রাখতে রাখতে আমার জান কয়লা হয়ে যেত, দীপক।
দীপক বোধহয় অন্যমনস্ক ছিল। তাই অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠলো, সত্যদা পঁয়তাল্লিশ বছর চাকরি করেছে। শুনলে বিশ্বাসই হতে চায় না।
তাতে বিরক্ত হয়ে মানব মজুমদার বললেন, কথায় কথায় অবাক হওয়াটা আজকের যুবকদের একটা রোগ। তুমি জানো, সতুর আসল বয়েস কত? চৌষট্টি বছর। সে আমলে তো আর বার্থ সার্টিফিকেটের চল ছিল না। যে বয়েস কলেজের খাতায় লেখাবে সেটাই থেকে যাবে। তা এই চার বছর এক্সট্রা চাকরি করে লোকটা কত টাকা সরকারকে ঠকাল বলো তো? প্রায় সত্তর হাজার টাকা! একি মুখের কথা।
দীপক প্রতিবাদ করতে গিয়েও চুপ করে গেল। কারণ ওর মনে পড়ে গেছে, ওর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার সার্টিফিকেটে যে বয়েস লেখা আছে সেটা আসল বয়েসের চেয়ে দেড় বছর কমানো। তার মানে রিটায়ারমেন্টের সময় ও সরকারকে হাজার তিরিশেক টাকা ঠকাবে? কথাটা ভাবতেই কেমন খারাপ লাগল। পাশে বসা মানব মজুমদারকে ও দেখতে লাগল। ওঁর সার্টিফিকেটে কত বছর কমানো আছে কে জানে!
সরকারকে ঠকিয়ে সত্তর হাজার টাকা আত্মসাৎ করা লোকটা তখন বলে চলেছে, এই কলেজের জন্যে আমি রক্ত দিয়েছি। কথার কথা নয়, সত্যিকারের রক্ত। কারণ কলেজের সমস্ত ওয়্যারিং আমি নিজেই করেছিলাম। তখন হাতে তার ফুটে গিয়ে দু-দিন রক্ত বেরিয়েছিল। ওই মহাপুরুষ ডক্টর মিত্র বলতেন, সতু, এ তোমার নিজের ঘর-বাড়ি। এর কোথাও যেন কোনও কিছুর খামতি না থাকে লক্ষ রেখো। দিন-রাত তিনি থাকতেন আমার পাশে পাশে। সবসময় উৎসাহ দিতেন। তখন তো কলেজে এত লোকজন ছিল না। সব মিলিয়ে আমরা ছিলাম সাতজন।
সমাদ্দার যেন সত্যসুন্দরের কথাগুলো আর সহ্য করতে পারছিলেন না। চাপা গলায় বিষ ঢাললেন, দু-ফোঁটা রক্ত দিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে কলেজের রক্ত চুষে গেছে। এস. কে. মিত্তিরকে মা-বাপ করেই যা পেরেছে লুটেপুটে খেয়েছে।
নবীন সরকার সামান্য মুখ ঘুরিয়ে সমাদ্দারকে একবার দেখলেন শুধু। কিছু বললেন না। তাতে সমাদ্দার কিছুটা সাফাইয়ের সুরে বললেন, না স্যার, প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপালকে দেবতা বানিয়ে অন্যান্য প্রিন্সিপালদের ছোট করার চেষ্টা ঠিক নয়।
নবীন সরকারকে তা সত্ত্বেও নীরব দেখে সমাদ্দার চুপ করে গেলেন। ওপাশ থেকে পাত্র চকিতে দুজনকেই দেখে নিলেন।
আজ আমার জীবনে কোনও অভাব নেই। নিজের কারখানা আছে, কলকাতার বুকে ছোট্ট একটা বাড়িও করেছি। ভালো-ভালো ঘরে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি–আর কী চাই? তবে এসবই মহাপুরুষ ডক্টর মিত্র ছবির দিকে তাকিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন সত্যসুন্দর আর আপনাদের সকলকার আশীর্বাদে। পঁয়তাল্লিশ বছরে আমার সহকর্মীদের যে-ভালোবাসা পেয়েছি তা ভোলবার নয়। আমি অশিক্ষক কর্মচারী–অশিক্ষিতও বটে। কিন্তু মাস্টারমশাইয়েরা কখনও আমার সঙ্গে ওপরওয়ালা হয়ে ব্যবহার করেননি। আমার পিতা মিত্ৰসাহেবের কাছেই আমি যা কিছু শিখেছি। উনি বলতেন, সতু, সব কিছুর পিছনে একটা কেন আছে। সেটাকে জানতে শেখ। যন্ত্রপাতি খারাপ করে ফেললে উনি কখনও রাগ করতেন না। বলতেন, খারাপ কেন হল সেটা আগে জানো, বোঝো– তারপর নিজেই যন্ত্রটা সারাও। তা হলে আর কখনও খারাপ হলেই সর্বনাশ এ-ভয় মনে থাকবে না। দক্ষ কারিগর বলে আপনারা আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন তা আমরণ মাথায় করে রাখব…
কপালে হাত ঠেকালেন সত্যসুন্দর। তার প্রকট কণ্ঠা তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো চঞ্চল হয়ে ওঠানামা করছিল। মনের ভেতরের খচখচানির কাঁটাটা ক্রমাগত বিধছে। পিছনের সারিগুলোয় কিছু উশখুশুনি, চাপা হাসি, সবই তার নজরে পড়ছিল। কথা বলতে বলতে তিনি যেই থেমেছেন অমনি হলঘরে করতালির ফোয়ারা ছুটল। অর্থাৎ সবাই ভেবেছেন সত্যসুন্দরের বলা শেষ। অনুষ্ঠানও শেষ। সত্যসুন্দরের মনে হল করতালির শব্দগুলো যেন তাঁর বলিরেখামাখানো ভাঙা গালে অবিরত চড় মারার শব্দ। মনের ভেতরের ঘূণপোকাগুলো সেই মুহূর্তে তার হৃদয়ে কামড় বসাল।
দীপক রায়চৌধুরী তার সামনের সারির অধ্যাপকদের সঙ্গে তখন আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। আলোচনায় বিষয় হল, ইনস্ট্রমেন্ট মেকানিকের চাকরি করে কলকাতার বাড়ি করা সম্ভব কি না। হঠাৎই সত্যসুন্দরের কথায় ওরা চমকে উঠল।
আমার বলা এখনও শেষ হয়নি!–খসখসে ধরা গলায় চিৎকার করে বললেন সত্যসুন্দর। হাত তুলে সবাইকে বসতে ইশারা করলেন। চাদরটাকে ঠিক করে জড়িয়ে নিলেন গায়ে। তার গলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে, হলঘরের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেল। এত স্তব্ধ যে ধূপকাঠি পুড়ে যাওয়ার শব্দও বুঝি স্পষ্ট শোনা যাবে।
শচীদুলালের ভুরু কুঁচকে উঠল। অনঙ্গর চোখেও সংশয়। সত্যসুন্দর হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। হাতের পিঠ দিয়ে অযথাই চোখ মোছার চেষ্টা করতে লাগলেন। অনঙ্গ উঠে এগিয়ে যেতে চাইছিলেন, শচীদুলাল ইশারায় তাকে বারণ করলেন।
সকলেরই মন ভারী হয়ে উঠছিল এই বৃদ্ধের কান্নায়। জানলায় বসা কাকটা ঘাড় বেঁকিয়ে অবাক চোখে সত্যসুন্দরকে দেখছিল।
কান্নার আবেগ সামলে সত্যসুন্দর জড়ানো ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, আপনারা অনেকেই আজ আমার সম্পর্কে অনেক ভালো-ভালো কথা বললেন। যেসব ঘটনার কথা শচীদা, অধ্যাপক পাত্র বা প্রিন্সিপাল সাহেব বলেছেন সেগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু আপনাদের এত শ্রদ্ধা-ভালোবাসার যুগ্যি মানুষ নই আমি।
