অনঙ্গ মঞ্চের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন। চাপা স্বরে সত্যসুন্দরকে বললেন, আঃ, সতুদা, আপনার বক্তৃতা পরে, সবার শেষে। এখন বসুন তো!
সত্যসুন্দর কেমন থতথত খেয়ে বসে গেলেন। ডক্টর সরকার অনঙ্গকে কী একটা বলে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। অনঙ্গ দর্শকদের লক্ষ করে বললেন, এখন সত্যদা সম্পর্কে আপনাদের মধ্যে কারও যদি কিছু বলার থাকে একে-একে এসে বলতে পারেন…।
সঙ্গে-সঙ্গে অশিক্ষক কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেল। চারজন পালা করে উঠে গিয়ে সহকর্মী সত্যসুন্দর দাস সম্পর্কে বক্তব্য রাখলেন। চরিত্রে বক্তৃতাগুলো প্রায় একইরকম। কিছু-কিছু পুরোনো ঘটনার স্মৃতিচারণ, প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ডক্টর মিত্রের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং ফাঁকে-ফাঁকে বক্তার চারিত্রিক গুণাবলীর কিছু কিছু প্রকাশ করা। কারও কণ্ঠস্বর অতি মৃদু, কেউ বা বারবার যুক্তাক্ষর উচ্চারণ করতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছিলেন, কেউ আবার আবেগ ঝরিয়ে একাকার করে দিলেন।
বিচিত্র তথা বিচিত্রতর বক্তৃতাগুলো শুনতে-শুনতে অধ্যাপকবৃন্দ যথেচ্ছ টিপ্পনী কাটছিলেন। দীপক শুধু একবার বলল, মানবদা, যাই বলুক যেভাবেই বলুক, ওদের কথাগুলো কিন্তু খুব আন্তরিক। তাতে দু-তিনজন সঙ্গে-সঙ্গে ঝঝিয়ে উঠলেন, ওসব আন্তরিক-ফান্তরিক নয়। আসলে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেলে কে ছাড়!
এ কথা শুনেই দীপক কী একটা বলতে গেল, কিন্তু ঠিক সেই সময়েই অশিক্ষক কর্মচারীদের কয়েকজন পিছনের দিকে এসে অধ্যাপকদের অনুরোধ করতে লাগলেন কিছু বলার জন্য। কিন্তু প্রত্যেকেই তাঁর পাশের লোককে কিছু বলার জন্য উৎসাহ দিতে লাগলেন। সুরেন পাত্র কলেজের সকল মহলেই বেশ জনপ্রিয়। সুতরাং বক্তৃতা দেওয়ার অনুরোধ চাপ তার ওপরেই আসতে লাগল সবচেয়ে বেশি। অগত্যা তিনি রাজি হয়ে ডায়াসের দিকে গেলেন।
ক্লাসে লেকচার দেওয়ার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে পাত্র কথা শুরু করলেন। টেবিলের ওপর একহাতের ভর রেখে তিনি জোরালো অথচ হিসেবি গলায় বললেন, আমি শুধু একটা ঘটনার কথাই বলব, যে-ঘটনার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে সত্যবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ। অধ্যাপক পাত্র তাকালেন সত্যসুন্দরের দিকে। সত্যসুন্দর মাথা নামিয়ে বসে আছেন। পাত্র আবার বলতে শুরু করলেন, ঘটনাটা সত্যবাবুর কাছে খুবই তুচ্ছ হয়তো তার মনেও নেই। তবু আমার তরফ থেকে সেটা খুবই দামি। আজকের দিনে সবাইকে সেটা জানাতে পারলে আমার ভালো লাগবে…
তিনি বললেন, কীভাবে সত্যসুন্দর তার গবেষণায় একটি যন্ত্র তৈরি করে দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেছিলেন। কথা শেষ করে পাত্র দ্রুত পায়ে মঞ্চ থেকে নেমে ফিরে এলেন নিজের আসনে।
হলঘরে এখন গুঞ্জন চলছে। সম্ভবত আরও কোনও বক্তা আছেন কি না তারই খোঁজ-খবর অনুরোধ-উপরোধ ইত্যাদির চেষ্টা হচ্ছে। অনঙ্গ নস্কর ব্যস্ত পায়ে এপাশ-ওপাশ ঘুরছেন। অধ্যাপকেরা উশখুশ করছেন। নরপতি আবার একগোছা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিল ডক্টর মিত্রের ছবির সামনে।
হঠাৎই করতালির শব্দে সকলে চোখ তুলে মঞ্চের দিকে তাকালেন। অনঙ্গ নস্কর সত্যসুন্দরের পাশে গিয়ে তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বললেন, যাঁকে নিয়ে আজকের অনুষ্ঠান তিনিই আমাদের আসরের শেষ বক্তা।
সত্যসুন্দর বেঁটেখাটো মানুষ। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, তার ওপরে একটা তুষের চাদর। মাথার চুল ধবধবে সাদা এবং কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালে, গালে, থুতনিতে, গলায়, সর্বত্রই ছেয়ে আছে বয়েসের বলিরেখা। গত কয়েকটা ঘণ্টা যেন তাকে আরও বৃদ্ধ করে দিয়েছে।
অনঙ্গ মঞ্চ ছেড়ে নেমে যেতেই শচীদুলালও চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। সতুর বক্তব্য মুখোমুখি বসে শুনবেন বলে প্রথম সারির বেঞ্চিতে জায়গা করে নিলেন তিনি। নিজের ফেয়ারওয়েলের দিনটা আবার তার মনে লম্বা ছায়া ফেলছিল।
একঝলক শীতের বাতাস ঘরে ঢুকতেই জানলার বসা কাকটা চাপা গলায় কাকা করে দুবার ডেকে উঠল। সেটা সকলকে চুপ করতে বলার নির্দেশ কিনা বোঝা গেল না।
থমথমে নিস্তব্ধ হলঘরে সমবেদনা ও সহানুভূতির অনুকণা ভেসে বেড়াচ্ছিল, তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ঘন ধূপের গন্ধ। সকলে অপেক্ষা করছিলেন। সেই অপেক্ষাকাতর মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে সত্যসুন্দরের গলার কাছটা জ্বালা করতে লাগল। উপহারের ছোট বাক্সটা গাঁটসর্বস্ব আঙুলের প্রাণান্ত বাঁধনে আঁকড়ে ধরে সত্যসুন্দর উঠে দাঁড়ালেন। হাতজোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে তিনদিকে ফিরে তিনবার নমস্কার করলেন। তারপর মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলেন ডক্টর মিত্রের ছবির কাছে। মাথা ঝুঁকিয়ে দীর্ঘ প্রণাম জানিয়ে সোজা হলেন। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ছবির দিকে ইশারা করে ভাঙা উচ্চারণে বললেন, আমার বাবা!
বাষ্প জমাট বেঁধে সত্যসুন্দরের চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে অশ্রু মোছার চেষ্টা করলেন তিনি। তারপর আবার ফিরে গেলেন মঞ্চে, নিজের চেয়ারের সামনে।
ঘরে উপস্থিত সকলের ওপরে একবার ঝাপসা চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর খসখসে গলায় বললেন, ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। ডক্টর মিত্রের পাড়ার ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করতাম। তখন বয়েস কত হবে, পনেরো। মিত্র সাহেব একদিন আমাকে বললেন, সতু, নতুন কলেজ হচ্ছে। তোমাকে সেখানে চাকরি করতে হবে। তুমি হবে ইনস্ট্রমেন্ট মেকানিক। ডক্টর মিত্রকে আমি বাবার মতো দেখতাম। বুঝলাম, তিনি যা করবেন তাতে আমার ভালোই হবে। তাই ওই দেবতার কথায় রাজি হয়েছিলাম। পনেরো বছর বয়েসে ঢুকে পড়লাম এই কলেজে। আজ পঁয়তাল্লিশ বছর চাকরির পর বিদায় নিচ্ছি।
