সত্যসুন্দরের চোখের কোল ভিজে উঠেছে। রুদ্ধস্বরে কোনওরকমে উচ্চারণ করলেন, স্যার, আমি কয়টা কথা বলতে চাই।
ডক্টর সরকার কাঁধে হাত চাপড়ে নরম গলায় বললেন, বলবেন, আগে শচীবাবুর বলা হোক, তারপর।
অনঙ্গ নস্কর উঠে এসে দুটো ফুলের তোড়া নিয়ে তুলে দিলেন শচীদুলালের হাতে।
শচীদুলাল তোড়া দুটো সত্যসুন্দরের হাতে দিলেন। সত্যসুন্দর উঠে দাঁড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে সে-দুটো গ্রহণ করলেন। নামিয়ে রাখলেন সামনে, টেবিলের ওপরে। গলার মালাটাও খুলে ফেললেন, রাখলেন তোড়ার পাশে।
ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট নরপতি আর লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট হরিশঙ্কর আসন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। একজন নতুন ধূপের গোছা সতর্ক হাতে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, আর অন্যজন নানান তদারকিতে মনোযোগ দিয়েছে। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কমবয়েসি এই দুটি ছেলে কম দৌড়ঝাঁপ করেনি। অনঙ্গ নস্কর কাছে আসতেই হরিশঙ্কর চাপাগলায় জিগ্যেস করল, অনঙ্গদা, প্রেজেন্টেশানটা কখন দেবেন?
শচীদার বলা শেষ হলেই দেওয়া হবে।
সত্যকে আমি তেইশ বছর ধরে দেখছি..শচীদুলালের ভরাট কণ্ঠ হলঘরের আনাচে-কানাচে বিদ্ধ হয়ে গেল অনায়াসে। ভাঙা জানলায় নিশ্চুপ কাকটি হঠাৎই নড়েচড়ে বসল। একজন ছাত্র হাত বাড়িয়ে দুবার হুস-হুঁস করল, কিন্তু কাকটি সে তাড়ানিকে কোনও আমলই দিল না।
…সতুর মতো বিনয়ী, সৎ, কর্মঠ মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। গ্যাসট্রিকের গোলমালে মরো-মরো অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে ভরতি হতে হয়। তখন এই সতু সত্যসুন্দরের দিকে আঙুল দেখালেন শচীদুলাল, এই সতু তিন-তিনটে রাত আমার বেডের পাশে জেগে বসেছিল। তাতে আমার মনের জোর এত বেড়ে গিয়েছিল যে নিশ্চিত জানতাম আমি বেঁচে উঠব। ওর সেই ঋণ আমি কোনদিনও শুধতে পারব না। না, শুধতে চাইও না। কারণ, কারও কারও কাছে ঋণী থাকার এক অদ্ভুত আনন্দ আছে। আমার মনে পড়ে…।
সত্যসুন্দর মাথা নীচু করে শুনতে লাগলেন। তার বুকের ভেতরে হঠাৎই নির্মম কষ্ট হচ্ছিল। শ্বাসনালীটা যেন আগাপাশতলা ভরতি হয়ে গেছে নোনা জলে। শচীদুলালের আন্তরিক কথাগুলো এক অপূর্ব সম্মোহনপাশে বেঁধে ফেলতে লাগল ঘরের প্রতিটি শ্রোতাকে। সত্যসুন্দরও যেন নতুন করে জানতে পারছেন নিজেকে। কেমন এক সঙ্কোচ, লজ্জা ও পাপবোধ তাঁকে অনুক্ষণ বিব্রত করতে শুরু করল। শচীদা বড় বাড়াবাড়ি করছে। ধূপের সুতীব্র গন্ধ সত্যসুন্দরের সর্দিরা নাকেও ঢুকে পড়ছিল। শীতের হাওয়া কখনও কখনও আঁচড় কাটছে তাঁর রুক্ষ ত্বকে। সত্যসুন্দরের ঝিমুনি আসছিল ক্রমশ।
পিছনের সারিতে অধ্যাপক মানব মজুমদার দীপকের উরুতে টোকা মারলেন। দীপক একমনে শচীদুলালের বক্তব্য শুনছিল, টোকার স্পর্শে ফিরে তাকাল। চোখে নীরব প্রশ্ন। মানব মজুমদার প্রায় ফিসফিসে গলায় বললেন, শচীর অসুখের সময় ওকে দেখতে যাওয়ার নাম করে সতু পাঁচ-ছ দিন সই করেই কেটে পড়েছিল। আর এখন তো শুনলে, ব্যাটা মাত্র তিন রাত্তির জেগেছিল।
আশপাশের আরও কয়েকজন মাস্টারমশাই কৌতূহলী হয়ে মানব মজুমদারের কথা শুনছিলেন। তাঁরা সকলেই মুচকি হেসে উঠলেন।
পিছনের সারির চাঞ্চল্য অনেকক্ষণ ধরেই শচীদুলালের নজরে পড়ছিল। ফলে এক অচেনা অস্বস্তি তার মনের ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল। ওই চাঞ্চল্যের কারণ কি শচীদুলাল আঁচ করতে পারছেন না? ব্যাপারটা সত্যসুন্দরের নজরও এড়িয়েছে বলে মনে হয় না। এরকম একটা মানবিক অনুষ্ঠানে এ-ধরনের অমনোযোগ বেশ দৃষ্টিকটু। শচীদুলাল নিজের বক্তব্যের শেষ অংশটুকু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন মনে-মনে। অস্বস্তিটুকু ঝেড়ে ফেলে সেটাই বলতে লাগলেন তিনি।
..সত্যর অভাব কোনওদিন পূরণ হওয়ার নয়। ওকে ভুলে যাওয়া আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। ওর সুস্থ জীবন কামনা করে আমি আমার কথা শেষ করছি।
শচীদুলাল বসে পড়লেন চেয়ারে। বুকের ভেতরে হাঁফ ধরে গেছে তার। পেটে চিনচিন ব্যথা। অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটটা সময়মতো খেতে ভুলে গেছেন।
সরবে হাততালি শুরু হয়েছিল শচীদুলাল বক্তব্য শেষ করার সঙ্গে-সঙ্গেই। এখন অনঙ্গ নস্কর মঞ্চে এসে হাতের ইশারা করতেই হাততালি ও কলগুঞ্জন স্তব্ধ হল।
অনঙ্গ গলার স্বরকে সামান্য খাদে নামিয়ে আস্তে-আস্তে বললেন, এখন কমরেড সত্যসুন্দর দাসকে আমাদের সকলের তরফ থেকে একটি ক্ষুদ্র উপহার দেওয়া হবে। উপহার তার হাতে তুলে দেবেন কমরেড শচীদুলাল কর্মকার।
লাইব্রেরিয়ান অরুণ সামন্ত তাঁর পাশে বসা টাইপিস্ট দ্বিজেন ঘোষকে বিরক্তির স্বরে বললেন, কথায় কথায় কমরেড জুড়ে দেওয়াটা অনঙ্গর রোগে দাঁড়িয়ে গেছে।
দ্বিজেন ঘোষ অনঙ্গকে একদম দেখতে পারে না। তা ছাড়া সে একটু ফিচেল স্বভাবের। সুতরাং অরুণবাবুর কথায় সে বলে উঠল, আচ্ছা অরুণদা, অনঙ্গটা ওর বউকে কী বলে ডাকে জানেন? সেখানেও কি কমরেড জুড়ে দেয়? চোখে সামান্য অর্থপূর্ণ ইশারা করে দ্বিজেন আরও বলল, মানে ওর বউও তো ওর সহকর্মী কিনা।
দ্বিজেনের পাশে বসা অ্যাকাউন্ট ক্লার্ক হীরেন মণ্ডল পানের ছোপধরা দাঁত বের করে ফিকফিক করে হাসতে লাগল। অরুণ সামন্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তেই অনঙ্গ রঙিন কাগজে মোড়া লাল ফিতে বাঁধা একটা ছোট প্যাকেট শচীদুলালের হাতে তুলে দিলেন। শচীদুলাল সেটা সত্যসুন্দরের হাতে দিলেন। সত্যসুন্দর উপহার হাতে নিয়ে যথাক্রমে শচীদুলাল, ডক্টর নবীন সরকার এবং সমবেত দর্শকমণ্ডলীকে উদ্দেশ করে মাথা অবনত করে নমস্কার জানালেন। তারপর শ্লেষ্মধরা খসখসে গলায় বললেন, আমার সহকর্মীরা কয়েকদিন আগে আমাকে জিগ্যেস করতে গিয়েছিল আমার কোন উপহার পছন্দ। তা আমি বলেছিলাম কিছুই আমার চাই না। ভগবানের আশীর্বাদে কোনওকিছুরই তো অভাব নেই। যাই হোক, তবু তারা যখন আমাকে ভালোবেসে এই উপহার দিল তখন আমি সেটা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছি। আমার জীবনে…।
