অনঙ্গ নস্কর এবার নিজের আসনে ফিরে গেলেন। সভাপতির ভাষণ শুরু হল।
হলঘরের তিনটে কাচের জানলা। সেগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু দুটো শার্সি ভাঙা থাকায় শীতের হাওয়া ঢুকে পড়ছিল ঘরের মধ্যে। তা ছাড়া একটা কাক এসে বসে পড়েছে ভাঙা জানলার ফ্রেমে। এই কাকটি কলেজ এলাকার বাসিন্দা এবং বিশেষ করে এই ভাঙা জানলাটার প্রতি তার আশ্চর্য টান আছে। ছাত্রছাত্রীরা জানে, ক্লাস চলাকালীনও কাকটি প্রায়শই এসে বসে থাকে। ফলে তারা ঠাট্টা করে বলে, কাকটা হায়ার সেকেন্ডারি পাস। বিএসসি-র ক্লাস করতে এসেছে। সুখের ও স্বস্তির ব্যাপার, কাকটি জানলার বসে মোটেও ডাকাডাকি করে না। চুপটি করে মানুষের কথা শোনে।
নবীন সরকারের চশমা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি তখন বলতে শুরু করলেন ।
সত্যসুন্দরবাবুর পরিচয় আজ আর নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। শুধু বলতে পারি, কলেজের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ একটি খুঁটি সরে গেল। আমাদের ল্যাবরেটরির সমস্ত যন্ত্রপাতি সত্যবাবুর তত্ত্বাবধানে যেরকম সুস্থ ও সবল ছিল তা নিছক নজির হয়ে থাকবে এখন থেকে। তার মতো দক্ষ মেকানিক আমি এর আগে কখনও দেখিনি। তা ছাড়া এই কলেজকে উনি নিজের সংসারের মতো আন্তরিক চোখে দেখতেন। সবসময় বলতেন…।
অশিক্ষক কর্মচারীরা অভিভূত হয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন।
তাদের পিছনের সারিতে বসা ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী চোখে প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে। ওরা অল্প-চেনা সত্যদা সম্পর্কে অনেক নতুন-নতুন ঘটনা আজ জানতে পারছে। শ্রদ্ধায় দ্রব হয়ে আসছে। ওদের সুকুমার মন।
কিন্তু একেবারে পিছনের সারিতে ছবিটা অন্যরকম ছিল।
সমাদ্দার চাপা হাসলেন। তাতে অধ্যাপক পাত্র প্রশ্ন করলেন, হাসলেন কেন?
জানেন না, কেন হাসছি! সত্যকে বেলা দুটোর পর কদিন কলেজ চত্বরে পাওয়া গেছে। বলতে পারেন? আমাদের ল্যাবরেটরি থেকেই মাল ঝেড়ে-ঝেড়ে ও নিজের বাড়িতে একটা ইনমেন্ট ওয়ার্কশপ খুলেছেনাকি এ-খবরও রাখেন না?
পাত্র কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, সে কী! ল্যাবরেটরির মালপত্রের কোনও হিসেব নেই? যদি সত্য ধরা পড়ত, তা হলে তো ওর চাকরি নিয়ে টানাটানি হত!
সমাদ্দার ধূর্ত হাসলেন। বললেন, আচ্ছা ভালোমানুষ মশাই আপনি! সরকারি কলেজে আবার মালপত্রের হিসেব থাকে না কী? আর এখানে কে-ই বা ধরা পড়ে, কে-ই বা কার চাকরি খায়। কিছুই বোঝেন না! ওই জন্যেই আপনার ইনক্রিমেন্ট অ্যাদ্দিন ধরে ঝুলে রয়েছে।
নিজের অজ্ঞতায় পাত্র লজ্জা পেলেন। কেমন একটা ভক্ত-ভক্ত ভাব করে তাকালেন প্রভু সমাদ্দারের দিকে। বললেন, সত্যি, আপনি বেশ খবর-টবর রাখেন।
সমাদ্দার হাসলেন। তার পোকায় খাওয়া একজোড়া কষদাঁত দেখা গেল। অবশেষে গলার স্বর নামিয়ে এনে বললেন, সত্যর একটা কালো তাপ্লিমারা ফোলিও ব্যাগ ছিল দেখেননি? ওর ভেতরে থাকত যন্ত্র সারানোর যন্ত্রপাতি। দুটোর পরই ব্যাগ নিয়ে সত্য বেরিয়ে পড়ত। ঘুরে-ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় ইনস্ট্রমেন্ট সারাত, নয়তো সারানোর কন্ট্রাক্ট ধরত। ওঃ, প্রচণ্ড ধড়িবাজ!
…সত্যবাবুর আর একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট হল, উনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠা থেকেই চাকরিতে যোগ দেন, এবং আজ ষাট বছর বয়েসে অবসর নিচ্ছেন। আমাদের কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ডক্টর এস. কে. মিত্র নিজে সত্যবাবুকে এই কলেজে নিয়ে আসেন, নিজের হাতে তাকে কাজ শিখিয়েছেন। সত্যবাবুর কাছ থেকেই এসব কথা আমি শুনেছি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডক্টর সরকার আবার বললেন, খুব খারাপ লাগছে যে আজ উনি অবসর নিচ্ছেন। ফেয়ারওয়েল কথাটা শুনলেই মনে হয় সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠান। কিন্তু আমি সে-অর্থকে সত্যি বলে মনে করি না। সত্যবাবুকে আমি বলতে চাই, একলেজ তার নিজের কলেজ। উনি যেন কোনওমতেই কলেজের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন না করেন। আমরা আশা করব, শচীবাবুর মতো উনিও আমাদের আপনার জন মনে করে বরাবর পাশে-পাশে থাকবেন। সত্যবাবুকে আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।
শচীদুলাল মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলেন। সত্যর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে ভেদাভেদের পাঁচিল তোলা শুরু হল। তবে এরপর সত্য তাঁর মতো কলেজে আসবে না। শচীদুলাল কদিন আগে ওকে জিগ্যেস করেছিলেন। ও বলেছিল, কী করে আসব, শচীদা! আমার কারখানা রয়েছে, নাতি-নাতনি রয়েছে, বড় মেয়েটার বাচ্চা হবে, বাড়ি এয়েছে। না, আমার আসা হবে না।
শচীদুলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কারখানা নেই। ছেলেরা ভিন্ন হয়ে গেছে, অতএব নাতি-নাতনিও কাছে নেই। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন জব্বলপুরে। সে শুধু চিঠি লেখে। শচীদুলালের স্ত্রী আছে, পেনশনের টাকা আছে, আর কলেজ আছে। কলেজটাই বেশি করে আছে।
ডক্টর সরকার বক্তৃতা শেষ করে বসতে যাচ্ছিলেন, তক্ষুনি একটা গোড়ে মালা হাতে অনঙ্গ প্রায় ছুটে এলেন তাঁর কাছে। চাপা গলায় কী যেন বললেন। তারপর মালাটা সরকার সাহেবের হাতে ধরিয়ে অনঙ্গ নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। সরকার সাহেব মালাটা নিয়ে সত্যসুন্দরের গলায় পরিয়ে দিলেন। হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন সত্যসুন্দর। সরকার সাহেব তাঁকে কাঁধে হাত রেখে বসতে বললেন। হলঘরে হাততালির বন্যা বয়ে গেল। ডক্টর সমাদ্দারও হাসিমুখে হাততালি দিলেন।
