ক্লাস-ঘরের প্রথম সারির বেঞ্চিগুলিতে কলেজের অন্যান্য অশিক্ষক কর্মচারী বসেছেন। তাদের নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন চলেছে। কেউ-কেউ বা সত্যসুন্দরের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন। যেসব ছাত্রছাত্রী সত্যসুন্দরকে মাত্র কয়েকবছর দেখেছে তারা পিছনের সারিতে বসে আগ্রহ নিয়ে প্রথম সারির আলোচনা শুনতে চেষ্টা করছিল। ঘড়িতে দুটো বেজে কুড়ি মিনিট, অথচ অনুষ্ঠান এখনও শুরুই হল না, এই অভিযোগও করছিল উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের দু-একজন।
ধূপের সাদা ধোঁয়া ক্রমে হলঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সকলেই তৈরি হচ্ছিলেন শোকতাপসমৃদ্ধ একটি বিদায় সংবর্ধনাসভা প্রত্যক্ষ করার জন্য। চেয়ারে একা বসে থাকা সত্যসুন্দরকে মনে হচ্ছিল পার্ট ভুলে যাওয়া কোনও অসহায় অভিনেতা। এবং পরিচালক এই সঙ্কট-মুহূর্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন না তার দিকে।
সামনের সারি থেকে ছোকরা লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট হরিশঙ্কর বলে উঠল, শচীদা, শুরু করে দিন।
ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট নরপতি পাশে বসে থাকা লাইব্রেরিয়ান অরুণ সামন্তকে জিগ্যেস করলো, সামন্তদা, প্রেজেন্টেশানের প্যাকেটটা কার কাছে?
অরুণ সামন্ত বললেন, ওই ফুলের তোড়ার পাশে রাখা আছে।
প্রিন্সিপাল ডক্টর নবীন সরকার ও অন্যান্য অধ্যাপক পিছনের দু-সারি বেঞ্চিতে ঘন হয়ে বসেছেন। আজকের অনুষ্ঠান মূলত অশিক্ষক কর্মচারীদের, তাই ওরাই অগ্রণী। অধ্যাপকরা চাঁদা ও উৎসাহ দিয়ে অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতার কাজ করেছেন। সুতরাং অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিত থাকাটাও জরুরি ছিল। তাদের অনেকেই এসেছেন এবং সচেতনভাবেই গৌণভূমিকা নিয়েছেন।
ব্যবস্থাপনার কাজ সেরে শচীদুলালের দীর্ঘ দেহ এগিয়ে এল পিছনের বেঞ্চির দিকে। তার চোখ অধ্যক্ষ নবীন সরকারের চোখে। দু-দিকের বেঞ্চির সারির মাঝের অলিপথ ধরে ডক্টর সরকারের কাছে এসে দাঁড়ালেন শচীদুলাল। সাদা শার্ট, কালো জহরকোট ও ধুতি পরা শরীরটাকে অনেকটা ঝুঁকিয়ে সরকার সাহেবের খুব কাছাকাছি মুখ এনে বললেন, স্যার, তা হলে শুরু করে দিচ্ছি।
নীরব সম্মতি জানালেন ডক্টর সরকার। উনি সাধারণত খুব কম কথা বলেন, তাঁর দু-পাশে বসে থাকা দুই অধ্যাপক, সুরেন পাত্র আর রমেশ সমাদ্দার, হলঘরে হাজির হওয়া ইস্তক ডক্টর সরকারকে নানাভাবে খুশি করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সরকার সাহেবের তরফ থেকে বিশেষ উচ্চবাচ্য শোনায় তারা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, সরকার সাহেব খুশি হয়েছেন কি না। খুশি হলে সুরেন পাত্রের পাওনা ইনক্রিমেন্টটা যথাশীঘ্র কার্যকরী হবে, এবং রমেশ সমাদ্দার যে দীর্ঘদিন বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন সে-চেষ্টাও সফল হবে কারণ বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই নবীন সরকারের যথেষ্ট পরিচিতি এবং ওজন আছে।
অশিক্ষক কর্মচারীদের ইউনিয়ন নেতা অনঙ্গ নস্কর প্রথম সারিতে বসেছিলেন। শচীদুলালের সঙ্গে কীসব পরামর্শের পর তিনি বেঞ্চির আসন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সোজা গিয়ে উঠে দাঁড়ালেন পাটাতনের ওপরে, চেয়ার-টেবিলের ঠিক পাশটিতে। তার মঞ্চে ওঠার সহজ সাবলীল ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় এ-জাতীয় অভ্যাস তার ভালোরকম আছে। ঘরের সিলিং-এর দিকে একপলক তাকিয়ে বাঁ-হাতটি পিছনে রেখে অনঙ্গ নস্কর বলতে শুরু করলেন, সমবেত অধ্যাপকমণ্ডলী, ছাত্রছাত্রীবৃন্দ ও সহকর্মী কমরেডগণ! আজ আমাদের অত্যন্ত দুঃখের দিন। আমাদের প্রিয় কমরেড শ্রীসত্যসুন্দর দাস রিটায়ার করছেন।
ঘরের সর্বশেষ সারিতে বসা বয়স্ক অধ্যাপক মানব মজুমদার পাশে বসা তরুণ অধ্যাপক দীপক রায়চৌধুরিকে চাপা গলায় বললেন, আজ প্রিয় কমরেড সত্যসুন্দর দাস! যদ্দিন ছিল তদ্দিন তো ওর সঙ্গেও অনঙ্গ বখরা নিয়ে খেয়োখেয়ি করে মরেছে!
দীপক বলল, আর সত্যদাই বা দেবে কেন? অনঙ্গ তো দিনরাত্তির ইউনিয়নের নাম করে ফাঁকি মারে, কাজটা করে আর কখন? আরে বাবা, কাজ না করলে কখনও বখরা পাওয়া যায়। বখরাও যে কষ্ট করে আয় করার জিনিস।
মানব মজুমদার হাসলেন। তাঁর নাকের দুপাশে ভাঁজ প্রকট হল। তিনি এখন সোজা অনঙ্গর দিকে তাকিয়ে। অনঙ্গ তখন বলছেন, এই প্রিয় সতুদাকে নিয়ে আজ যে-অনুষ্ঠান, আমি সেই অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক নবীন সরকারের নাম প্রস্তাব করছি।
প্রথম সারি থেকে কয়েকটি স্বর মিলিতভাবে বলে উঠল, আমরা এই প্রস্তাব সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি।
আর বিশেষ অতিথি হিসেবে আমি আমাদেরই প্রাক্তন সহকর্মী কমরেড শ্রীশচীদুলাল কর্মকারের নাম প্রস্তাব করছি।
আবার একইরকম সর্বান্তঃকরণ-সমর্থন পাওয়া গেল প্রথম সারি থেকে। সেই সঙ্গে কিঞ্চিৎ হাততালিও।
একটু পরেই অনঙ্গ নেমে এলেন। শচীদুলালকে সঙ্গী করে এগিয়ে এলেন সরকার সাহেবের দিকে। সরকার সাহেব সভাপতি হওয়ার জন্য অপ্রস্তুত ছিলেন না, সুতরাং, ওঁরা কাছাকাছি এসে পড়ার আগেই বেঞ্চির আসন ছেড়ে উনি বেরিয়ে এলেন বাইরে। তাকে পথ ছেড়ে দিতে সমাদ্দারকেও বাইরে বেরোতে হয়েছিল। ডক্টর সরকার মঞ্চের দিকে এগোতেই সমাদ্দার ফিরে এসে বসলেন পাত্রের পাশে। পরস্পরের চোখাচোখি হল ক্ষণিকের জন্য।
মঞ্চে উঠে সত্যসুন্দরের পাশের চেয়ারটিতে বসলেন ডক্টর সরকার। তার পাশে খালি চেয়ারটিতে বসিয়ে দেওয়া হল শচীদুলালকে। তারপর অনঙ্গ বললেন, সভাপতি হিসেবে মাননীয় ডক্টর সরকারকে আমি কিছু বলতে অনুরোধ করছি
