খানিকটা স্বাভাবিক হওয়ার পর অতীশ প্রশ্ন করলেন, এত–এত– তাঁর গলা দিয়ে কাসরঘণ্টার ফাসফেঁসে আওয়াজ বেরিয়ে এল, এত তাড়াতাড়ি কী করে জানতে পারলেন আপনারা? আর কোনও কথা খুঁজে পেলেন না তিনি।
ডিটেকটিভ ইনস্পেক্টর হাসলেন? মিস্টার সেন, আপনি এবং আপনার স্ত্রী–আপনারা দুজনেই পাংচুয়ালিটির সিম্বল ছিলেন। ডেইলি রুটিনে কখনো এক সেকেন্ডেরও হেরফের হত না আপনাদের।
আমাদের ডেইলি রুটিনে? বিড়বিড় করলেন অতীশ, রুবির ডেইলি রুটিনে?
কেন, আপনি জানেন না? ভীষণ মজার হাসি হাসলেন অফিসার ও আপনার ওয়াইফ ঘড়ি মেপে সব কাজ করতেন। আমরা সব জানতে পেরেছি ওই পুপুর জন্যে!
অতীশ হাঁ করে চেয়ে রইলেন অফিসারের দিকে। ব্যাপারটার কিছুই তখনও তার মাথায় ঢোকেনি।
অফিসার একটু হেসে আবার বলতে শুরু করলেন, মিস্টার সেন, পাড়াপড়শিরা আপনাকে দেখে যে ঘড়ি মেলাত, একথা ঠিক। তবে সেটা শুধুমাত্র সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত। তারপর থেকে তাদের কাছে পাংচুয়ালিটির আইডল ছিলেন রুবি সেন। গত দু-বছর ধরে আপনি যেমন ঠিক আটটায় পুপুকে বাড়িতে ঢোকান তেমনি আপনি বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক দশমিনিট পর–অর্থাৎ, কাঁটায়-কাঁটায় সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে মিসেস সেন পুপুকে ছুঁড়ে দিতেন বাইরের লনে–গত দু-বছর ধরেই।
এই মজার দৃশ্য দেখে বাচ্চু মিসেস সরকারের ছেলে–ঠিক আটটা চল্লিশের সময় মজা করে বলে উঠত, মা, দ্য ক্যাট ইজ আউট অফ দ্য ব্যাগ।?
আজ আটটা পঞ্চাশেও যখন বেড়ালটা বাইরে এল না, তখন ও অবাক হয়ে মা-কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে। মিসেস সরকার খুবই কৌতূহলী মহিলা। তা ছাড়া তিনি জানতেন, রুবি সেন অসুস্থ। তাই সন্দেহের বশে মিসেস সরকার আপনার বাড়িতে খোঁজ করতে যান। তারপর– হেসে ফেললেন অফিসার ও মিস্টার সেন, দ্য ক্যাট ইজ নাউ রিয়্যালি আউট অফ দ্য ব্যাগ।
হতভম্ব অতীশ সেন হাত দুটো এগিয়ে দিলেন ইনস্পেক্টরের দিকে।
বিদায় সংবর্ধনা
সত্যসুন্দরের চোখের কোণে ধীরে-ধীরে বাষ্প জমছিল।
ফুলের মালা, ফুলের তোড়া, ছমছমে ধূপের গন্ধ, সবকিছু ক্রমশ তাকে অভিভূত করে ফেলছিল। নিজের অবাক চোখ দুটোকে বড় হলঘরটার চারপাশে বুলিয়ে নিলেন সত্যসুন্দর। কলেজে এই ঘরটাই সবচেয়ে বড় ক্লাস-ঘর। এখানে পাসকোর্সের ছেলেমেয়েদের ক্লাস হয়। কিন্তু এখন সেই ছেলেমেয়েদের নির্ধারিত বেঞ্চিগুলিতে মাননীয় প্রিন্সিপালসাহেব থেকে শুরু করে দশ-বারোজন অধ্যাপক, জনা বিশ সত্যসুন্দরের সহকর্মী, এবং পাঁচ-ছজন ছাত্র-ছাত্রী বসে আছে। সকলেই প্রগাঢ় ভালোবাসা মাখা আতুর চোখে সত্যসুন্দরকে দেখছে। কারণ আজ কলেজ ল্যাবরেটারির মেকানিক সত্যসুন্দর দাসের বিদায় সংবর্ধনা।
খাটো পাটাতনের ওপরে দাঁড় করানো লম্বা টেবিল। টেবিলের পিছনে তিনটে চেয়ার। বাঁ দিকের চেয়ারে সঙ্কুচিতভাবে বসে রয়েছেন সত্যসুন্দর। বাকি দুটি চেয়ার এখনও খালি। ও-দুটো নির্দিষ্ট রয়েছে সভাপতি এবং বিশেষ অতিথির জন্য।
চেয়ারের সারির পিছনেই কুচকুচে কালো বিশাল ব্ল্যাকবোর্ড। তাতে চকখড়ি দিয়ে নানান অঙ্ক কষা ছিল, কিন্তু মাঝামাঝি অংশটা ডাস্টার দিয়ে মুছে গোটা-গোটা হরফে কেউ লিখে দিয়েছে : ১৭ই নভেম্বর বেলা দুটোয় শ্রীসত্যসুন্দর দাসের ফেয়ারওয়েল।
চেয়ার-টেবিল-পাটাতন ইত্যাদি থেকে কিছুটা তফাতে আরও দুটি চেয়ার দাঁড় করানো রয়েছে। তার একটিতে সযত্নে রাখা আছে দুটি ফুলের তোড়া, একটি রজনীগন্ধার গোড়ে মালা এবং একগুচ্ছ জ্বলন্ত সুগন্ধি ধূপ। বাকি চেয়ারটিতে একটি কাচে বাঁধানো তৈলচিত্র ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে। চিত্রের ব্যক্তি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ডক্টর এস. কে. মিত্র। চোদ্দো বছর হল উনি মারা গেছেন। কিন্তু তারপর থেকে কলেজের লঘুগুরু যে-কোনও অনুষ্ঠানে ডক্টর মিত্রের আবক্ষ চিত্রটি সর্বদাই উপস্থিত থেকেছে। এ ঘটনায় অনুমান হতে পারে তিনি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। এবং এ-অনুমান পুরোপুরি সত্যি।
ডক্টর মিত্রের ছবিতে আন্তরিকতার সঙ্গে মালা পরিয়ে দিচ্ছিলেন শচীদুলাল কর্মকার। লম্বা শক্ত দেহের কাঠামো। মাথার চুল ও গোঁফের রং ধবধবে সাদা। বাষট্টি বসন্ত পেরিয়ে গেছেন। শচীদুলাল, কিন্তু তার মধ্যে যে-কোনও একটি বসন্ত তার মাঝারি ফরসা মুখে স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছে। শচীদুলাল দু-বছর আগেই রিটায়ার করেছেন, কিন্তু কলেজে এখনও নিয়মিত আসেন, অফিসের কাজকর্ম দেখেন। বাড়িতে তার নাকি সময় কাটতে চায় না। হেসে বলেন, ঘানির বলদের কাধ থেকে যদি জোয়াল খুলে ছেড়ে দেন, দেখবেন তখনও ব্যাটা গোল হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা হলুম গে সেইরকম। রিটায়ার্ড হয়েও টায়ার্ড হই না।
ডক্টর মিত্রের ছবিতে মালা পরানো শেষ করে আরও কয়েকটা ধূপকাঠি জ্বেলে দিলেন শচীদুলাল। তার মনে পড়ছিল নিজের ফেয়ারওয়েলের দিনটা। তারপর থেকে রোজই কলেজে আসেন অথচ কোথায় যেন একটা তাল কেটে গেছে। ফেয়ারওয়েলের দিনটা শাসনের চোখে তার দিকে তাকায়। নিত্য অফিসসংক্রান্ত যেসব কাজগুলো তিনি করেন, মনে হয় সেগুলো সবই অনধিকার চর্চা। কিন্তু তা হলেও ভালো লাগে। এ কলেজ থেকে রিটায়ার অনেকেই করেছেন, কিন্তু শচীদুলালের মতো হাজিরার ধারাবাহিকতা কেউ রাখেননি। হয়তো এই কারণেই প্রত্যেক বিদায় সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে শচীদুলালের ওপরেই দায়িত্ব পড়ে আয়োজনের প্রধান কর্মকর্তার ভূমিকার। এবং শচীদুলাল তা পালনও করেন সাগ্রহে। যেমন এখন করছেন।
