তা হলে অতীশ এতদিন যা সন্দেহ করেছেন তাই। তিনি অফিসে চলে গেলে রুবি হেঁটে বেড়াতেন।…না, আর ঝামেলা করা ঠিক হবে না। অফিস (?) যাওয়ার সময় হয়ে এল। সময়ের এতটুকু এদিক-ওদিক হলেই তার কল্পনার স্বর্গ ধুলোয় মিশে যাবে।
কত হয়েছে আপনার বিল?
দু-শো আট টাকা ষাট পয়সা।
একমুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না অতীশ। ছুটলেন শোওয়ার ঘরে। ব্রিফকেস খুলে হাতড়ে বের করলেন একশো টাকার বান্ডিলটা। তিনটে নোট টেনে নিয়ে ব্রিফকেস বন্ধ করে দ্রুতপায়ে নীচে নেমে এলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে নোট তিনটে তুলে দিলেন যুবকটির হাতে।
আটটা বাইশ।
আমার কাছে ভাঙানি নেই। আচ্ছা, আমার সঙ্গে আসুন–ওই মোড়ের দোকানটা থেকে ভাঙিয়ে দিচ্ছি।
অতীশের কানে কেউ যেন গরম সীসে ঢেলে দিল। এ তো দেখছি মহা ঝামেলায় পড়া গেল। আর মাত্র আটমিনিট বাকি!
ঠিক আছে, এটা দিন। একটা নোট ছিনিয়ে নিলেন অতীশ : আমার কাছে অন্য আরও নোট আছে– অবাধ্য জিভকে শাসন করে আবার বললেন, মানে, দশটাকার নোটও আছে।
মুহূর্ক্সে মধ্যে অদৃশ্য হলেন অতীশ। শোওয়ার ঘরে গিয়ে আবার ব্রিফকেস খুলে পাগলের মতো নোটের গাদা হাতড়াতে লাগলেন। কোথায় গেল দশটাকার বান্ডিলগুলো? এই তো! একটা নোট টেনে নিয়ে প্রায় দৌড়েই ফিরে এলেন দরজায়।
আটটা তেইশ।
প্যাকিং আর ডেলিভারি মিলিয়ে পড়ল এক টাকা সাঁইতিরিশ পয়সা। তা হলে মোট হল দু-শো নটাকা পচানব্বই পয়সা। আপনমনেই হিসেব করতে শুরু করল যুবক : তা হলে আপনি পাবেন পাঁচ পয়সা।
ওটা আপনি রেখেই দিন…আমার দরকার নেই। তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন অতীশ।
আটটা চব্বিশ।
না, না,…এই তো, আমার কাছে একটা পাঁচ পয়সা আছে। জামা-প্যান্টের পকেট হাতড়াতে আরম্ভ করল যুবক : কোথায় গেল? একটু আগেই তো ছিল পকেটে।
আমার কোনও দরকার নেই। কোন ভিখিরিকে দিয়ে দেবেন। দরজা বন্ধ করতে গেলেন অতীশ। রাগে তাঁর চোখ-মুখ লাল।
হাত দিয়ে বাধা দিল যুবক।
আটটা পঁচিশ।
এই তো–এই যে পেয়েছি। নিন।
হাত বাড়িয়ে পাঁচ পয়সা নিলেন অতীশ। দরজা বন্ধ করলেন। উঃ!
আবার বেল বেজে উঠল! দরজা খুলতেই চোখে পড়ল সেই যুবকের হাসিমুখ।
আটটা ছাব্বিশ।
কুকারটা নিতেই আপনি ভুলে গেছেন, মিস্টার সেন। প্যাকেটটা এগিয়ে দিল যুবক।
ওঃ কী ভুলো মন আমার। ধন্যবাদ।
দরজা বন্ধ করে হাঁফ ছাড়লেন অতীশ। খুব জোর বেঁচে গেছেন! মরে গিয়েও রুবি তাঁকে জ্বালাতে ছাড়ছেন না। এই কুকারের অর্ডার দেওয়ার কী দরকার ছিল?
আটটা সাতাশ।
ঠক ঠক্ ঠক্।
তড়িৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠলেন অতীশ। কে? কে এল আবার?
দরজা খুলে দাঁড়াতেই রাগে তার সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে সেই যুবক। মুখে কান এঁটো করা হাসি।
বিলটা দেওয়ার কথা ভুলেই গেছিলাম। তাই আবার ফিরে এলাম। এই নিন।
হাত বাড়িয়ে বিলটা নিলেন তিনি। কষ্টকৃত হাসি হেসে দরজা বন্ধ করলেন। কুকারের প্যাকেটের মধ্যে বিলটা খুঁজে দিলেন। তারপর এক এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি ভেঙে গেলেন দোতলায়। ব্রিফকেসে চাবি এঁটে ওটাকে হাতে নিলেন। রুবির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নেমে এলেন ড্রইংরুমে। একটুর জন্য আজ বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন।
আটটা উনতিরিশ।
আয়নায় চেহারাটা একবার দেখে তৈরি হলেন। ব্রিফকেস নিয়ে যখন তিনি বাইরের লনে পা দিলেন, তখন ঠিক সাড়ে আটটা বাজতে পনেরো সেকেন্ড বাকি (গত দু-বছরের মতোই)।
মিসেস সরকার তখনও বাগানে দাঁড়িয়ে গাছের পরিচর্যা করছিলেন।
মিস্টার সেন, মিসেস আজ কেমন আছেন?
মিষ্টি হাসি হাসলেন অতীশ : ভালোই আছেন। আজ একটা ওষুধ দিয়েছি ওঁকে সেই ব্যথাটার জন্যে।
ওই ব্যথাটার জন্যেই তো ভীষণ কষ্ট পান আপনার মিসেস। সহানুভূতির গলায় বললেন মিসেস সরকার।
আর কখনও কষ্ট পাবেন না উনি। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন : আচ্ছা চলি।
মা, বাচ্চু সরকার বলল ওর মা-কে, এখন ঠিক সাড়ে আটটা বাজে।
.
বৃথা বিলম্বে কালাতিপাত করিও না। টাইপের পদক্ষেপে হনহন করে বাস-স্টপের দিকে হাঁটছিলেন অতীশ সেন। আশপাশের পাড়াপড়শিরা তাঁকে দেখে নিজেদের ছেলেমেয়েদের যে সময়ানুবর্তিতা সম্বন্ধে জ্ঞান দিচ্ছেন, তা তিনি রোজকার মতোই (গত দু-বছর ধরে) বুঝতে পারলেন।
সাড়ে ছটায় যখন তিনি ফিরবেন না (গত দু-বছরে এই প্রথম ঘটবে) তখন সবাই সেটাকে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে করবে।
সাড়ে সাতটা বাজলে সবাই চিন্তিত হয়ে উঠবে।
সাড়ে আটটায় তার বাড়িতে খোঁজ করতে যাবে এবং থানায় ফোন করলে পর সাড়ে নটায় পুলিশ এসে পৌঁছোবে। ততক্ষণে তিনি হাজার-হাজার মাইল দূরে–পুলিশের নাগালের বাইরে।
এয়ারপোর্টে সিকিওরিটি চেকের জন্য এগোতে যাবেন, এমন সময় পিছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখল কেউ। চমকে ফিরে তাকালেন অতীশ।
কঠিন চৌকো চোয়াল। সরু গোঁফ। গালে একটা কাটা দাগ। জোড়া ভুরু। কোট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।
অতীশ আচমকা ঘাবড়ে গিয়ে বোর্ডিং পাসটি ভদ্রলোকের দিকে সাততাড়াতাড়ি এগিয়ে ধরলেন।
উত্তরে ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা আইডেন্টিটি কার্ড বের করলেন। লাউঞ্জের আলোয় কার্ডটা ঝলসে উঠল।
মিস্টার সেন, আপনাকে একবার আমার সঙ্গে আসতে হবে। আপনার স্ত্রীর মিস্টিরিয়াস ডেথের ব্যাপারে আপনাকে কয়েকটা কথা জিগ্যেস করার আছে।
অতীশ সেনের হঠাৎ মনে হল, তার পা দুটো যেন খুঁজে পাচ্ছেন না। ভদ্রলোক হয়তো আরও কিছু বলছিলেন, কিন্তু অতীশের সেসব বোধগম্য হল না। অবশ দেহে টলে পড়ে যাচ্ছিলেন। ইনস্পেক্টর এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেললেন।
