স্যান্ডউইচ দুটো শেষ করে অত্যন্ত সাবধানে ফ্রিজ থেকে নিজের জন্য একটা (দুটো নয়) ডিম বের করলেন। হিটারে জল চাপিয়ে তার মধ্যে ডিমটা ছেড়ে দিলেন। হঠাৎ তার খেয়াল হল, তাড়াতাড়িতে শেভ করতেই ভুলে গেছেন। সর্বনাশ! এরকম উলটোপালটা হলেই মহা বিপদ!
তাড়াতাড়ি ওপরে গিয়ে ব্রিফকেসটা ঘর থেকে বের করে আনলেন (রুবির মৃতদেহের দিকে তাকালেন না অতীশ)। ওটা খুলে টাকার বান্ডিলের নীচ থেকে শেভ করার সাজ-সরঞ্জাম বের করে বাথরুমে ছুটলেন।
শেভ করে ব্রিফকেস আবার গুছিয়ে যখন ডাইনিং রুমে ফিরে এলেন, তখন সাতটা সাতান্ন।
চটপট ডিমটা প্রায় গিলে ফেললেন অতীশ। এরকম ভুল করলে কারও খুন করাই উচিত নয়। এক সেকেন্ডেরও গণ্ডগোল তিনি হতে দেবেন না। ঠিক আটটায় পুপুকে সদর দরজা খুলে ঢোকাতে হবে বাড়িতে। রোজকার মতো।
আটটা বেজে এক সেকেন্ড।
তাড়াহুড়ো করে সদর দরজা খুললেন অতীশ। ঠিক পায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে বেড়ালটা। দরজা খোলা পেয়ে ওটা ঘরে এসে ঢুকল। অতীশের পায়ে গা ঘষতে লাগল। পুপুকে গত দু-বছর ধরেই আটটায় দরজা খুলে ঘরে ঢোকান অতীশ। ধবধবে লোমের পুঁটলি যেন বেড়ালটা। সুন্দর দেখতে। অথচ রুবি একেবারেই দেখতে পারতেন না ওটাকে। পুপু ছিল ওঁর দু-চক্ষের বিষ! এখন আর কোনও ভয় নেই পুপুর। আপনমনেই হাসলেন অতীশ।
আটটা তিন।
বেড়ালটাকে রোজকার মতো গত রাতের এঁটো খাবারগুলো খেতে দিলেন অতীশ। তারপর ড্রয়িংরুমের চেয়ারে বসে জামা-প্যান্ট, জুতো চটপট পরে ফেললেন। এবার খবরের কাগজটা খুলে দেখতে লাগলেন।
আটটা বেজে ন মিনিট।
ক্রিরি-ং—রি রিং– । একটুও চমকালেন না অতীশ। তিনি যেন এতক্ষণ ধরে এই ফোনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। আয়েশি পায়ে এগিয়ে গেলেন ক্র্যাডলের কাছে। তুলে নিলেন রিসিভারটা।
হ্যালো গম্ভীর স্বর ভেসে এল ও-প্রান্ত থেকে।
অতীশ সেন স্পিকিং খুব ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে হবে। ভাবলেন অতীশ।
আরে, অতীশ..আমি বড়ুয়া বলছি।
কী, বল।
কী ঠিক করলি? কোথায় যাবি ছুটিতে?
ভাবছি এই দু সপ্তাহ একটু আশপাশ থেকে ঘুরে আসা যাবে। অতীশ দুসপ্তাহ ছুটি নিয়েছেন অফিস থেকে এবং ছুটির মেয়াদ আজ থেকেই শুরু।
মিসেসকে সঙ্গে নিয়ে, না একা? বড়ুয়া হেসে জানতে চাইল।
তোর তাতে কী দরকার? ঠাট্টার সুরে বললেন অতীশ।
আচ্ছা–হ্যাভ আ গুড টাইম– ফোন রাখার শব্দ শোনা গেল।
রিসিভার নামিয়ে রাখলেন অতীশ সেন। তিনি যে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন, তা পাড়াপড়শিরা কেউই জানে না। ফলে আজও তিনি ঠিক সাড়ে আটটায় বাড়ি থেকে বেরোবেন। আশপাশের সবাই তাকে দেখে ঘড়ি মেলাবে। গত দু-বছর ধরে তাই হয়ে আসছে। বাসে করে তিনি অফিসের দিকেই প্রথমে যাবেন। তারপর সেখান থেকে বাসে চড়ে সোজা এয়ারপোর্ট। দশটা একুশে বম্বে যাওয়ার একটা প্লেন আছে। তাতে চেপে সোজা বম্বে। সেখান থেকে পাঁচটা পঁয়তিরিশের প্লেনটা তাকে ধরতে হবে। গন্তব্যস্থল মাদ্রাজ। বম্বে থেকে যখন তিনি প্লেনে উঠবেন, তখন নাম এবং চেহারা তাঁকে পালটাতে হবে। মাদ্রাজে নেমে নিজেকে লোকের ভিড়ে মিশিয়ে ফেলতে তার এতটুকু অসুবিধে হবে না। তখন কাজে লাগবে রুবির টাকাগুলো। আপনমনেই হাসলেন তিনি।
আটটা সতেরো মিনিট ছসেকেন্ড।
আর দু-মিনিট চুয়ান্ন সেকেন্ড পর তাকে রোজের মতো রেডিয়ো চালাতে হবে।
ক্রিরিরিরিং–।
একটু অবাক হয়ে অতীশ এগিয়ে গেলেন ফোনের দিকে। কিন্তু ফোনের কাছে গিয়েই তিনি যেন একটা শক খেলেন। হৃৎপিণ্ড যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে গলা দিয়ে। না–ফোন নয়!
বাজছে দরজার কলিংবেল!
কে এল এই সময়ে (অথবা অসময়ে!)?
দুরুদুরু বুকে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন অতীশ। দরজা খুললেন।
সামনে দাঁড়িয়ে একজন সুবেশধারী যুবক। পরনে কোট, প্যান্ট, টাই–ফিটফাট।
কী চাই? দরজা আগলে দাঁড়িলে রইলেন অতীশ। যাই হোক না কেন, দরজা থেকে কিছুতেই সরব না। ভাবলেন তিনি।
এটাই তো আটাশ নম্বর বাড়ি?
হ্যাঁ।
অতীশ হঠাৎ খেয়াল করলেন, যুবকের পায়ের কাছে দাঁড় করানো একটা বড় প্যাকেট।
মিস্টার সেন তো আপনিই?
হ্যাঁ।
আমি নাহাটা ডিস্ট্রিবিউটার থেকে আসছি। আপনার ওয়াইফ একটা অটোমেটিক প্রেশার। কুকারের অর্ডার দিয়েছিলেন, তাই–
না, না, ওসব কুকার-ফুকার লাগবে না আমাদের। দরজা বন্ধ করতে গেলেন অতীশ।
মিস্টার সেন, যিনি অর্ডার দিয়েছিলেন, তিনি ক্যান্সেল করলেই আমরা অর্ডারটা ক্যান্সেল্ড বলে মনে করব, নয়তো নয়। আপনি কাইন্ডলি একবার মিসেস সেনকে খবর পাঠান। আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
উঃ–যত জ্বালা। এখন কী করবেন অতীশ?
হঠাৎ খেয়াল হতেই দরজা ছেড়ে ভেতরে এসে রেডিয়োটা অন করে দিলেন তিনি। আবার ফিরে গেলেন দরজায়।
আটটা একুশ।
মিসেস সেন এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। পরমুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, উঠেছেন–মানে এখন ব্রেকফাস্টে বসেছেন।
আমি একবার ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। ঘরের ভেতর পা বাড়াল যুবক।
দাঁড়ান মশাই! আপনি ভেতরে ঢুকছেন কার হুকুমে? উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন অতীশ। নাঃ, রাগলে চলবে না। মনে-মনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। লোকটা সন্দেহ করতে পারে।
আমার স্ত্রী কি নিজে আপনাকে অর্ডার দিয়েছিলেন? এবার কণ্ঠস্বর যথেষ্ট মোলায়েম।
হ্যাঁ।
