এক নম্বর, বালিশের তলা থেকে ০.২২ ক্যালিবারের রিভলভারটা বের করা–এবং তিনি তাই করলেন।
দু-নম্বর, রিভলভারের চেম্বার চেক করা…(এবং করলেন)।
এবার ললাডেড রিভলভারটা ডানহাতে নিয়ে বাঁ-হাতে একটা বালিশ টেনে নিলেন অতীশ। এগিয়ে গেলেন রুবির বিছানার দিকে। প্রায় একইসঙ্গে ঘটে গেল দুটো ঘটনা। প্রথম, বালিশ দিয়ে ঘুমন্ত রুবির মুখ চাপা দেওয়া এবং দ্বিতীয়, তৎক্ষণাৎ বালিশের ওপর গুলি করা। ঘড়ির দিকে তাকালেন অতীশ সাতটা বাইশ।
এমনভাবে তাঁকে কাজগুলো সারতে হবে, যাতে এক সেকেন্ডেরও হেরফের না হয়। রুবির মৃতদেহটা একপাশে ঠেলে দিয়ে ওর তোশকের নীচে হাত ঢোকালেন অতীশ। হ্যাঁ, ঠিক যা ভেবেছেন তাই–থরেথরে টাকা সাজানো ওর তোশকের নীচে।
রুবিকে বিয়ে করার পর গত দু-বছর ধরে অতীশ শুধু ভেবেছেন এই টাকাগুলোর কথা। নয়তো একথা কে বিশ্বাস করবে যে, শুধুমাত্র প্রেমতাড়িত হয়ে তিনি (অতীশ সেন সুপুরুষ) একটা মোটকা, পঞ্চাশ বছরের বুড়িকে বিয়ে করেছেন?
রুবি সেন খুবই অদ্ভুতভাবে বিয়ের দিনপনেরো পর থেকেই পক্ষাঘাতে কাহিল হয়ে পড়েছেন এবং নিজের বিছানা ছেড়ে আর নড়তেন না–অন্তত যতক্ষণ অতীশ বাড়িতে থাকতেন। প্রথম প্রথম অতীশ সন্দেহ করেননি, কিন্তু একদিন লক্ষ করলেন যে, রেফ্রিজারেটরে রাখা ডিমগুলো থেকে দুটো ডিম হঠাৎ অদৃশ্য হয়েছে। এ বিষয়ে রুবিকে প্রশ্ন করামাত্রই ওর মুখ পাণ্ডুর হয়ে গেছিল। তখনই অতীশ সন্দেহ করেছিলেন রুবি পক্ষাঘাতে মোটেই কাবু নয়।
তবে কেন এই অভিনয়?
এর উত্তর একটাই হতে পারে। তা হল, ওই বিছানার নীচেই রয়েছে রুবির সমস্ত টাকা– যে-টাকার খবর অতীশ কানাঘুষোয় শুনেছেন।
রুবি কোনওদিনই অতীশকে জানতে দেননি যে, তার টাকা আছে। এবং অতীশও কোনওদিন তাকে জানতে দেননি যে, তার টাকার কথা তিনি জানেন। রুবি সেন অতীশের নকল ভালোবাসার কথা বিয়ের কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাই সবসময় নিজের টাকাকে আগলে রেখেছেন– যখের মতো।
সাতটা সাতাশ।
আর তিন মিনিট। চট করে বাথরুমে গিয়ে শেভ করার সেফটি রেজার, সাবান, ব্রাশ, টুথব্রাশ নিয়ে এলেন অতীশ। একটা ব্রিফকেসে ভরে ফেললেন। তারপর ব্যাগটা বোঝাই করলেন টাকায়– রুবির টাকায়। একশো, দশ, পাঁচ, একটাকার নোটের মোটা-মোটা বান্ডিলগুলো (উত্তরাধিকার সূত্রে রুবি যার মালিক হয়েছে) দেখে অতীশ সন্তুষ্ট হলেন।
সাতটা উনতিরিশ মিনিট তিরিশ সেকেন্ড।
রিভলভারটা ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে ব্রিফকেস লক করে দিলেন তিনি। দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললেন বারান্দার দিকে। নীচু হয়ে খবরের কাগজটা তুলে নিলেন মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলেন। তারই ফাঁকে ঘড়ির দিকে তাকালেন সাতটা তিরিশ মিনিট এক সেকেন্ড। যাক, ঠিকই আছে সময়টা। সময়ের গণ্ডগোল হলেই বিপদ।
এই যে, মিস্টার সেন! সামনের খোলা বাগান থেকে নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
এই ডাকটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন অতীশ। কারণ গত দু-বছর ধরেই সাতটা তিরিশমিনিট পাঁচ সেকেন্ডের সময় তিনি বারান্দার কাগজ হাতে হাজির থাকেন। এবং পাশের বাড়ির বাগান থেকে মিসেস সরকার তাঁকে ঠিক এইভাবেই ডাকেন।
মিসেস সরকারের দিকে চেয়ে হাসলেন অতীশ। মিসেস সরকার বাগানে জল দিচ্ছিলেন, পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর বছরসাতেকের বাচ্চা ছেলেটা।
হয় আপনি আজ দু-মিনিট আগে উঠেছেন, নয়তো আমার ঘড়ি দুমিনিট স্লো আছে। হাসতে হাসতে বললেন মিসেস সরকার।
ভীষণভাবে চমকে উঠলেন অতীশ। খবরের কাগজটা আর-একটু হলেই হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। নাঃ, এই সময়ের ব্যাপারটায় আমাকে খুব সাবধান হতে হবে। কিন্তু দু মিনিট আগে এলাম কেমন করে? তা হলে কি আমার ঘড়ি ভুল?
না মিসেস সরকার, আপনার ঘড়িই স্লো আছে দু-মিনিট।
সে কি আর আমি জানি না! একগাল হাসলেন তিনি ও আপনাকে দেখেই তো আমার ঘড়ি মেলাই আমি।
হঠাৎই সুর পালটে প্রশ্ন করলেন ভদ্রমহিলা, একটু আগে কি আপনার বাড়িতে চেয়ার টেবিল উলটে পড়েছিল?
না তো! কেন?
না, কেমন যেন একটা শব্দ শুনলাম। তাই–।
মাই গড! আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছিল? ইশ, বালিশটা যদি রুবির মুখে না চেপে, রিভলভারের নলে চাপতাম।
ও, ওটা বাথরুমের দরজার শব্দ। দরজাটা কেমন যেন আটকে গেছিল। তাই জোরে খুলতে গিয়ে।
হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়ল অতীশেরসাতটা আটতিরিশ। খবরের কাগজ ভাঁজ করে ঘরে ফিরে এলেন তিনি। ঘরে ঢোকার সময় শুনলেন মিসেস সরকারের ছেলে বাচ্চু ওর মা কে বলছে, মা, এখন ঠিক সাতটা বেজে আটতিরিশ মিনিট।
মনে মনে খুশি হলেন অতীশ। ঠিক এইভাবেই তাকে চলতে হবে সাড়ে আটটা পর্যন্ত।
গত একবছর ধরেই অতীশ সন্দেহ করছেন যে, তার অনুপস্থিতিতে (সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধে সাড়ে ছটা পর্যন্ত) রুবি চলাফেরা করে বেড়াতেন। প্রায়ই দেখতেন, অফিসে যাওয়ার সময় যেটা যেরকম দেখে গেছেন, ফিরে আসার পর ঠিক সেইরকমটি আর নেই। একটু যেন অদলবদল হয়েছে। অথচ রুবি সেই একইভাবে বিছানার শুয়ে আছেন। বাড়িতে যখন আর কেউ নেই, তা হলে ওগুলো সরাল কে? নিশ্চয়ই রুবি। রুবির চিন্তাকে মগজ থেকে সরিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে গেলেন অতীশ।
সাতটা চল্লিশ।
তিনটে স্যান্ডউইচ বের করলেন ফ্রিজ থেকে। ওঃ, আবার সেই ভুল! মনে মনে নিজেকে প্রচণ্ড তিরস্কার করলেন অতীশ সেন। তাকে ভীষণ সাবধান হতে হবে। তাড়াতাড়ি একটা স্যান্ডউইচ ঢুকিয়ে রাখলেন ফ্রিজে। রোজ এই সময় তিনি দুটো স্যান্ডউইচই খান এবং তৃতীয় একটা নেন রুবির জন্য। গত দু-বছর ধরে তাই করেছেন। সুতরাং অভ্যাসবশে তিনটে স্যান্ডউইচ নিয়ে ফেলেছিলেন।
