ওর গভীর দুটো চোখে কাতর অনুনয় ফুটে উঠেছিল। পাশের বেঞ্চে বসা আর-একজন মাঝবয়েসি খদ্দের আমাদের দেখছিল। দ্বিতীয় ভড় চা হাতে নিয়ে আমি বললাম, বল, শুনব।
প্রথম ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় ভঁড়ে চুমুক দিল সুবল। বলল, প্রকৃতিতে কত সিমেট্রি আছে দেখেছিস? একটা গাছের কথাই ধরকাণ্ডের দুপাশে মোটামুটি সমতা বজায় রেখে বেড়ে ওঠে। এ ছাড়া পশু-পাখি, এমনকী মানুষও। তাদের চেহারার আদলে কি সিমেট্রি নেই? যেমন, আমাদের শরীরে যেসব জিনিস জোড়সংখ্যায় আছে, সেগুলো সমানভাব দুপাশে সাজানো। যেমন, হাত-পা, চোখ, আঙুল, মেয়েদের বুক। আর যেগুলো একটা করে রয়েছে, সেগুলো ঠিক দেহের মাঝবরাবর সাজানো। কপাল, নাক, মুখ, নাভি! তা হলে এবার তুই-ই বল, আমাদের শরীরটা একটা প্যালিড্রোম কি না?
সত্যি, এভাবে কখনও ভাবিনি। সুবলকে আমি কী বলব, পাগল, না দার্শনিক?
সুবল ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বলে যাচ্ছিল।
এ কমাসে আমি অনেক বইপত্তর পড়ে ফেলেছি। তুই ভাবিস না যে, দ্বিমুখী অবিকল কবিতা আমিই প্রথম লিখেছি। বাংলায় আমার আগে কেউ লেখেনি ঠিকই, তবে বহুকাল আগে সংস্কৃতে লেখা হয়েছে। সংস্কৃতে লেখা শিশুপাল বধ কবিতায় এরকম চরণ ছিল। পণ্ডিতরা এগুলোকে বলত সর্বোতোভদ্রঅর্থাৎ, সবদিক থেকেই নিখুঁত। দেখ, ঠিক এইরকম ব্যাপারটাই প্রকৃতির বহু জায়গায় রয়েছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গ্রহ, উপগ্রহ, তারা থেকে পরমাণুর ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, কোয়ার্ক–কোনওটাতেই এর অভাব নেই।
আমাদের চা খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওঠার মুখে সুবল বিড়বিড় করে বলল, শুধু শালা আমাদের জীবনটাতেই কোনও সিমেট্রি নেই।
ওর কথাগুলো আমি শুনতে পেয়েছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি, এই প্যালিড্রোম পাগল ছেলেটা সিমেট্রির জন্যে কতদূর যেতে পারে।
এর বছরদেড়েক পরে সুবল কনকলতা নামের একটি মেয়েকে বিয়ে করল। মেয়েটি রেলওয়েতে চাকরি করে। বিয়েটা শুনেছিলাম প্রেম করেই, কিন্তু সুবল নিজে আমাকে কখনও কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, ওর নামটাকে হেঁটে আমি কনক করে নিয়েছি। বুঝলাম, বিয়ের পরেও ওর মাথা থেকে প্যালিড্রোমের ভূত যায়নি।
এরপর সুবলের সঙ্গে খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। ও বাড়ি ছেড়েই বেরোত খুব কম। তবে রাস্তায় কনকলতার সঙ্গে দেখা হলে সুবলের খবর নিতাম। শুনতাম, ও নাকি দিনরাত্তির বই আর কাগজপত্রে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া ঘরের সব জিনিসই ও নতুন করে সাজিয়েছে– যাতে মোটামুটি একটা সিমেট্রি বজায় থাকে। আর খুঁটিনাটি যে-কোনও জিনিস কেনার সময়েও তাই। যেমন, সিলিং ফ্যান কিনেছে চার ব্লেডের। গোলমরিচ ঢালার ছোট্ট শৌখিন কৌটোয় বিজোড় সংখ্যার ফুটো ছিল বলে নিজে আর-একটা ফুটো করে নিয়েছে।
কনকলতার মুখে আমি যন্ত্রণার ছাপ দেখেছিলাম। সুবল যে চাকরি-বাকরি করে না, তা নিয়ে ওর কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু ও আর-একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠলে ভালো হত। অসহায় কনকলতাকে মেকি আশ্বাস ছাড়া আর কী-ই বা আমি দিতে পারতাম!
দিন চার-পাঁচ আগে একদিন দেখা পেলাম সুবলের।
রাত সাড়ে নটার সময়ে অরবিন্দ সেতুর রেলিঙে একা-একা বসে রয়েছে।
আমি মুদির দোকান থেকে বিস্কুট কিনে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎই একটা গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ওকে চিনতে পারলাম।
কাছে গিয়ে সুবলকে দেখে খুব কষ্ট হল। এ কী চেহারা হয়েছে ওর! চুল উশকোখুশকো, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চামড়ায় শুকনো ভাঁজ। শূন্য চোখে তাকিয়ে অরবিন্দ সেতুর ওপরে ছুটে চলা যানবাহনগুলো দেখছে।
সুবল।
আমার ডাকে ও চমকে উঠল। একটু দেরিতে চিনতে পারল আমাকে। তারপর ম্লান হেসে বলল, ও, তুই।
এত রাতে এখানে বসে কী করছিস?
ও স্বাভাবিক সুরে জবাব দিল, দেখছি, যে-গাড়িগুলো এই ব্রিজের ওপর দিয়ে যায়, সেগুলো আবার ফিরে আসে কি না। জানিস অতীন, নম্বর মিলিয়ে দেখেছি, বেশিরভাগ গাড়িই আবার ফিরে আসে। এটাকে নিশ্চয়ই তুই সিমেট্রি বলে মানবি?
আমি ওর হাত ধরে ওকে রেলিং থেকে নামালাম, বললাম, বাড়ি যা। তোর বউ একা রয়েছে। বাড়িতে।
সুবল কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর আপনমনে দু-বার ঘাড় নেড়ে রওনা হল বাড়ির দিকে। মনে হল, একটা জটিল অঙ্ক মেলাতে গিয়ে ও হিমসিম খাচ্ছে কিছুতেই সেটা মিলছে না।
ঠিক এর দুদিন পর, অর্থাৎ, গত বৃহস্পতিবার আত্মহত্যা করেছে সুবল।
পাড়ার বেশিরভাগ লোকই এই অমিশুকে ছেলেটাকে চিনত না। কিন্তু আত্মহত্যা করার ফলে ওকে চিনে ফেলল সবাই।
চার ব্লেডের পাখার সঙ্গে নাইলনের দড়ি বেঁধে ফাঁস তৈরি করেছিল সুবল। ফাঁসের দুপাশে দড়ি দিয়ে সমান মাপের দুটো ফুল তৈরি করা ঠিক বাচ্চা মেয়েদের বিনুনির মতো।
এ ছাড়া একটা সুইসাইড নোটও লিখে গেছেঃ
জীবন এইরকম সবচেয়ে ভালো
ভ্রূণ থেকে যৌবন, যৌবন থেকে ভ্রূণ,
ভালো সবচেয়ে, এইরকম জীবন।
জীবনের সিমেট্রির কথা মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও ভোলেনি বিকল্পকবি সুবল বসু।
বিড়াল
ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে ঠিক সাতটা বেজে সতেরো মিনিট। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ ঠিক তেরো মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠেছেন অতীশ সেন। অর্থাৎ, গত দু-বছর ধরে তিনি ঠিক সাতটা তিরিশ মিনিটে ঘুম থেকে উঠেছেন। এই তেরো মিনিটে তাকে কতকগুলো কাজ সারতে হবে–জরুরি কাজ।
