বিশ্রী শব্দে বাজ পড়ল কোথাও। মনে হল যেন বুকের ভিতরে। বৃষ্টি ভেজা বাতাবরণে শনশন শব্দে বাতাস ছুটল। বড় একটা গাছের ডাল মিটাস করে ভেঙে পড়ল কাছাকাছি।
ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন কৃপানাথ, আমার ওয়াইফ সহধর্মিণী! বিয়ের দু-বছরের মাথায় বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেছে। তবে বাচ্চাটা বেঁচে গিয়েছিল।
ছেলে? অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল আমার মুখ থেকে।
কৃপানাথ তেতো হাসলেন। ওঁর শান্ত চোখ এখন উন্মাদ, উদ্ভ্রান্ত। দু-পাশে ধীরে-ধীরে মাথা নেড়ে ভয়ংকর সুরে বললেন, হুঁ! ছেলেও নয়, মেয়েও নয়–বাচ্চা। তবে কীসের বাচ্চা কে জানে! সেটাকেই আমি মায়ের মমতায় আর বাপের স্নেহে আটাশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছি–ওই বাক্সের ভিতরে–ওই ইবলিশের বাচ্চাটাকে।
আমার বুকের ভিতরে ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজতে শুরু করল। এতক্ষণ ধরে ভিজে কাপড়ে থাকার জন্যেই বোধহয় শীত-শীত করতে লাগল আবার। কৃপানাথ মজুমদারের কালো ছায়ার খানিকটা বাক্সের গায়ে, খানিকটা দেওয়ালে কালো পরদার পাশে। পরদাটা জোলো বাতাসে অল্প-অল্প কাঁপছে। নাকে মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধ বেশ টের পাচ্ছি। আমার কেমন ঘুম পেতে লাগল।
কৃপানাথ ভাঙা গলায় বিকৃত স্বরে বলতে লাগলেন, ওই তো আমার বউ–আর এই তো আমি! বুকে হাত চাপড়ালেন তিনি? অথচ এই কিস্তৃত বাচ্চাটা যে কেমন করে জন্মাল ঈশ্বর জানেন! ওটার জন্মের সময় দুজন নার্স অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আর একজন ডাক্তার মারা যায়– কে যেন তার শরীরের সমস্ত রক্ত চুষে বের করে নিয়েছিল। হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠলেন কৃপানাথ। জড়ানো গলায় বললেন, পরে বুঝতে পেরেছি, কে ওই কাজ করেছে।
ছবির দিকে আঙুল তুলে অভিযোগের সুরে চেঁচাতে লাগলেন কৃপানাথ, তোমার বাচ্চা, সুরমা, তোমার বাচ্চা! এই আটাশটা বছর ধরে প্রতি মাসে একবার করে ওর খাবার জোগাড় করতে করতে আমি পাগল হয়ে গেলাম। মাসে একবার করে অচিনবাবুর মতো সোজাসাপটা ভালোমানুষ কোনও লোকের সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করে, ভুলিয়ে-ভালিয়ে, টাকার লোভ দেখিয়ে, কৌতূহল চাগিয়ে, আমাকে খুঁসলে নিয়ে আসতে হয় এই বাক্সের কাছে। তারপর সেই একই খেলা–মজার খেলা। বলুন, বাক্সের ভিতরে কী আছে! ওঁদের লোভ আর কৌতূহলই আমার ভরসা।
আচমকা হাসতে শুরু করলেন কৃপানাথ মজুমদার। কিন্তু এক অদ্ভুত হাহাকার লুকিয়ে ছিল সেই হাসিতে। এক ক্লান্ত পিতার সন্তান লালনপালনের কষ্ট আর একইসঙ্গে মমতার টান কী বিচিত্র টানাপোড়েনের মধ্যেই না ফেলেছে মানুষটাকে!
এক রিনরিনে হাসির আওয়াজ শুনলাম মনে হল। না কি বৃষ্টির শব্দে ভুল শুনেছি? সুরমার ছবিতে বেনারসি শাড়ির ঘোমটা সামান্য নড়ে গেল। না কি আমার দেখার ভুল? গোলাপি রঙের লিপস্টিকে রাঙানো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে লাল টুকটুকে জিভের ডগা সামান্য উঁকি মারল, আরও কটা দাঁত দেখা গেল।
আমার বুক কেঁপে উঠল ভয়ে। আর সঙ্গে-সঙ্গে এক ঝটকায় ছবির ওপরে পরদা টেনে দিলেন কৃপানাথ। দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এলেন আমার কাছে। খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন। ওঁর গায়ের জোর অনুভব করে তাজ্জব হয়ে গেলাম। কে বলবে কৃপানাথ বৃদ্ধ!
আসুন, অচিনবাবু–আপনি হেরে গেছেন। সুতরাং আপনার কাছ থেকে একটা মামুলি জিনিস চাইছি–আপনার সঙ্গেই সেটা আছে অনেক আছে।
আমি কোনও বাধা দিতে পারলাম না। মনে হল, বাড়তি কোনও শক্তি কৃপানাথ মজুমদারকে সাহায্য করছে। কারণ, অতি অনায়াসে বৃদ্ধ আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন বাক্সের কাছে। বাক্সের ভিতর থেকে তখন উত্তাল ঝটাপটির শব্দ ভেসে আসছে।
বাক্সের চৌখুপি জানলার কাছে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন কৃপানাথ। বললেন, শুধু-শুধু বাধা দেবেন না, অচিনবাবু। কারণ শঙ্করকে ডাকলে সে তো আসবেই–তা ছাড়া বাক্সের পেছনের দরজাটা যদি খুলে দিই তা হলে যার খিদে পেয়েছে সে নিজেই আপনাকে।
মাঝপাথে কথা থামিয়ে বিচিত্র সুরে শিস দিয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, আঃ, এবার একটু শান্ত হ দিকি। তারপর আমার দিকে ফিরে : খাবার জোগাড় করতে দেরি হলেই ও এমন অধৈর্য হয়ে পড়ে। খানিকটা মায়ের ধাত পেয়েছে।
হাঁসকল সরিয়ে জানলার পাল্লা খুলে দিলেন কৃপানাথ। আমার ডান হাতটা টেনে নিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন চৌখুপির ভিতরে। শেষ মুহূর্তে বোধহয় আমার ঘোর কেটে গিয়েছিল, কারণ আমি হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করেছিলাম।
কিন্তু ওই পর্যন্তই!
বাক্সের ভিতরে এক ভয়ংকর জাঁতিকল চোখের পলকে এঁটে বসল আমার কবজিতে। যন্ত্রণায় আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। যেন টুটি টিপে ধরেছে। কেউ। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। প্রবল বৃষ্টির ছাট জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে আমার চোখমুখ ভিজিয়ে দিল। হঠাৎই বিকট শব্দে বাজ পড়ল কোথাও। আর আমার আমার প্যান্ট ভিজে গেল।
স্পষ্ট বুঝলাম, অনুরাধা-বুবু-টুটুর কাছে আর কোনওদিনও আমি ফিরতে পারব না।
ঝাপসা চোখে দেখলাম, কৃপানাথ চেয়ারে গিয়ে বসেছেন। মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বলছেন, খা, খা, সব্রাহ্মণের রক্ত খা–। তোর সময়মতো খাবার জোগাড় করতে না পারলে আমি কি তোকে কম রক্ত দিয়েছি! ক্ষতচিহ্ন ভরা নিজের বাঁ-হাতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে চললেন কৃপানাথ, শুধু বাপ বলে প্রাণে রেহাই পেয়েছি। কী করে যে তুই আমাকে চিনিস কে জানে! যাক, আবার একটা মাস বিশ্রাম…।
